Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৪০
পাল্টে যাবে মংলা বন্দর
চীনা বিনিয়োগ
সামছুজ্জামান শাহীন, মংলা থেকে ফিরে

নিকট অতীতে মংলা বন্দরকে বলা হতো নিঝুমপুরী। সেই নীরবতা ভেঙে ধীরগতিতে হলেও গত ১০ বছরে বন্দরটি সামনে এগিয়েছে।

বন্দরটির আধুনিকায়নের যে স্বপ্ন দক্ষিণাঞ্চলবাসী দেখে আসছে তা এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। চীন সরকারের সঙ্গে চুক্তির ফলে আমূল পাল্টে যাবে মংলা বন্দর। শিল্পায়নসহ হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে রাজস্বও বেড়ে যাবে অনেক গুণ। মংলা বন্দর সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতু চালু হলে আপনাআপনিই এ বন্দরের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু সেই চাপ সামাল দিতে যে পরিমাণ উন্নয়ন প্রয়োজন তা অর্থাভাবে সম্ভব হচ্ছিল না। চীন সরকারের উন্নয়ন বিনিয়োগ বন্দরের উন্নয়নে গতি ফেরাবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত ৩ হাজার কোটি টাকার আটটি কম্পোনেন্টের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভিশন ২০২১-এর মধ্যেই মংলা বন্দর তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল রিয়াজউদ্দীন আহমেদ গতকাল দুপুরে তার কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পদ্মা সেতুটি চালু হলে সড়কপথে রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে কাছাকাছি সমুদ্রবন্দর হবে মংলা। তখন এ বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি খরচ চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে অনেক গুণ কমে যাবে। সংগত কারণেই আমদানি-রপ্তানিকারকরা অর্থ সাশ্রয়ে মংলা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। একই সঙ্গে রেলপথ যুক্ত হলে পণ্য পরিবহনের খরচও অনেক কমে যাবে। তখনকার চাপ সামলানোর জন্যই নানামুখী প্রস্তুতি চলছে। জানা যায়, ‘ভিশন-২০২১’ সামনে রেখে মংলা বন্দরের উন্নয়নে চায়নার সিনোম্যাক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্পের এমইউ গত বছর স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ প্রকল্পে নতুন চারটি জেটি ও দুটি ইয়ার্ড নির্মাণ, বহুতলবিশিষ্ট গাড়ি রাখার মাল্টি স্টোরেজ কার পার্ক নির্মাণ, ১১টি সার্ভে ও টাগবোর্ড ক্রয়, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, চার লেনের সড়ক উন্নয়নসহ আটটি কম্পোনেন্ট রয়েছে। এ বৃহৎ প্রকল্পটি এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। চীন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এ মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। জানা যায়, বর্তমানে মংলা বন্দরের পাঁচটি জেটির কার্যক্ষমতার অর্ধেকটা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি অর্ধেক অব্যবহৃত থাকছে। আগামী দিনের চাপের কথা চিন্তা করে পাঁচটি জেটির সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড় ড্রাফটের (গভীরতা) জাহাজের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বন্দরের বহির্নোঙর থেকে জেটি পর্যন্ত ১৩১ কিলোমিটার পশুর চ্যানেলটির নাব্য (গভীরতা) বাড়াতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং চলছে। ইতিমধ্যে এ চ্যানেলর তিন ভাগের এক ভাগের ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় করা হয়েছে ১১২ কোটি টাকা। বাকি দুই ভাগের ড্রেজিংয়ের জন্য ৪৩১ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে চ্যানেলের প্রয়োজনীয় নাব্য ধরে রাখতে নিজস্ব দুটি মেইনটেন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণ) ড্রেজার মেশিন কেনা হয়েছে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ইতিমধ্যে কেনা হয়েছে ২২টি আধুনিক যন্ত্রপাতি; যা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বন্দরের হ্যান্ডলিংয়ের কাজে যুক্ত হবে। বিদেশি জাহাজের জ্বালানি তেল সহজলভ্য করতে বন্দরেই নির্মিত হচ্ছে বৃহৎ আকারের ডিপো। বন্দরেই শুল্কায়ন ইউনিট স্থাপনের কাজও চলছে। ইতিমধ্যে ইপিজেডে কাস্টমস তাদের শুল্কায়নের কাজ শুরু করেছে। জানা যায়, মংলা থেকে ঢাকা পর্যন্ত উন্নত সড়কব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শুধু দীর্ঘ সময় ও অনিয়মিত ফেরি পারাপারব্যবস্থার কারণে মংলা বন্দর রাজধানী থেকে অনেক দূরে রয়ে গেছে। যে কারণে দেশের বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরের শিল্প ও বাণিজ্য সেক্টর তথা ট্রেডগুলো মংলা বন্দরের ওপর নির্ভর করতে পারেনি। তারা সবসময়ই চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায়ই জাহাজজট হয়। বহির্নোঙরে ২৫ দিন অপেক্ষার মতো উদাহরণও আছে অনেক। এর পরও আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিপিং কোম্পানিগুলো মংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহ দেখায়নি। কিন্তু পদ্মা সেতু চালু ও রেলপথ বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবেই। কারণ, বর্তমানে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ২৬৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকার সঙ্গে মংলা বন্দরের দূরত্ব হবে সড়কপথে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার। অর্থাৎ ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে মংলা বন্দরের যাতায়াতপথ চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটিরই সাশ্রয় হবে। আর রেলপথে পণ্য পরিবহনের খরচ তো কম আছেই। খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, পদ্মা সেতু ও রেলপথ চালু হলে মংলা বন্দর গতিশীল হবেই। আর মংলা বন্দর গতিশীল হলে দক্ষিণের ২১ জেলায় নতুন করে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলায় দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করবে। মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান বলেন, চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন হলে অবকাঠামো উন্নয়নে মংলা বন্দর হিউজ লাভবান হবে। এতে বন্দরের ক্যাপাসিটি (সক্ষমতা) বহুগুণে বেড়ে যাবে। পাশাপাশি বন্দরে আমদানি-রপ্তানি, কার্গো-শিপ হ্যান্ডলিং বাড়লে এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, মংলায় ইতিমধ্যে অসংখ্য এলপিজি প্লান্ট, ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের ভিশন-২০২১ সামনে রেখে দক্ষতার সঙ্গে হ্যান্ডলিং করতে পারবে।

up-arrow