Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৮
অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা
ঢামেকে চার মৃত্যুতে তদন্ত কমিটি
নিজস্ব প্রতিবেদক
অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা
অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে গতকাল ঢাকা মেডিকেল থেকে এভাবেই রোগীদের অন্যত্র নিয়ে যান স্বজনরা — রোহেত রাজীব

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটকে অ্যাম্বুলেন্সের চাপায় চারজন নিহতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। গতকাল হাসপাতালের সভাকক্ষে এক বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিটি তদন্ত কমিটিই তিন সদস্যবিশিষ্ট। হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমানকে প্রধান করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদন্ত কমিটি এবং উপপরিচালক ডা. আবদুল গণিকে প্রধান করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ বের করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢামেক হাসপাতাল প্রশাসন। অন্যদিকে ঢামেকের সিটি স্ক্যান দীর্ঘদিন নষ্ট থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা। এমআরআই পরীক্ষার জন্যও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। আর সেই ভোগান্তি চরমে রূপ নিয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে। গত শনিবার হাসপাতাল ফটকে অ্যাম্বুলেন্সের চাপায় চারজনের মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে দেখা দিয়েছে এই সংকট। অনেকটা অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ সেবা প্রার্থীরা। তাদের বাধার কারণে বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারছে না এবং হাসপাতাল থেকে কোনো রোগী নিয়েও যেতে পারছে না। ঢামেক সূত্র জানায়, রোগী ও তাদের স্বজনরা দীর্ঘদিন ধরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। এক অনাগত এবং চারজনের মৃত্যুর পর টনকনড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই হাসপাতালের আশপাশ থেকে অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ডের কারণে বিভিন্ন সমস্যার বিষয়টি সবাই কিছু না কিছু অনুভব করেছে। তাই সেটি সরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন সাপেক্ষে ফোন নম্বর (১৬২৬৩) দেওয়া আছে। সেখানে কল করলে স্বাস্থ্য অধিদফতর কিংবা স্থানীয় এনজিওর অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়া যাবে। গতকাল কথা হয় ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে। তার নাম সামাদ। তার কাছে জানা যায় হাসপাতালের দুর্ভোগের কথা। তিনি জানান, সজীব নামে তার এক স্বজন নরসিংদীতে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে এসেছেন। মাথায় আঘাত পাওয়ায় ডাক্তার রোগীর সিটি স্ক্যান করতে বলেছেন। কোথায় সিটি স্ক্যান করাবেন জানতে চাইলে ডাক্তার তাকে বাইরে থেকে করানোর কথা বলেন। এর জন্য রোগীকে নিয়ে অন্যত্র স্ক্যান করাতে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তীব্র রোদ আর গরমে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ভাড়া করেন একটি ট্যাক্সিক্যাব। আর সেই ট্যাক্সিক্যাবে করেই তারা বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে। শুধু সজীবই নয়। আলতাফ, লতিফুল ও ইজাজসহ বেশিরভাগ রোগীই চিকিৎসা নিতে এসে এ ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন। হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলোকেও খালি ফেরত যেতে হচ্ছে। তাদেরকে রোগী বা লাশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। সিন্ডিকেটের চোখ রাঙানিতে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স চালকরা রোগী বা লাশ নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের লোকজন সার্বক্ষণিক জরুরি বিভাগের সামনে আনাগোনা করছে। বাইরের যে কোনো অ্যাম্বুলেন্স এলেই তাকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করছে তারা। গতকাল হাসপাতালের নতুন ভবনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সিরাজগঞ্জের এক রোগী। তার স্বজনরা লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য বাইরের একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। লাশ অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার পরও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের লোকেরা তা প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রাখে এবং বাইরের অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে লাশ পরিবহন করতে দেবে না বলে তর্কে জড়ান। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় সিন্ডিকেটের দালাল তানভীর ও আবীর নামে দুজনকে আটক করে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। তিনি বলেন, গত শনিবারের পর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করেন। যার কারণে তারা বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেও দেয় না এবং এখান থেকে কাউকে নিয়ে যেতেও দেয় না। পরে আমরা অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দিয়েছি। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের নেতা দিনা বলেন, আমরা কোনো অবরোধ বা ধর্মঘট ডাকিনি। আমরা রোগী আনা-নেওয়া করতে চাই। কিন্তু পুলিশ আমাদের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দাঁড়াতেই দিচ্ছে না।

নিজ সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, রেগুলেশন বডি হলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর মাধ্যমে ভাড়াও নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। এ ছাড়া চালকরা রোগীদের কথা মতো যে কোনো জায়গায় যেতে বাধ্য থাকবে। রোগীদের ভোগান্তি সম্পর্কে উপপরিচালক ডা. খাজা আবদুল গফুর বলেন, সিটি স্ক্যান মেশিনের যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। সেটি জাপান থেকে আনতে হয়। সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই মেশিন মেরামতের প্রসেস চলছে। সরকারি হাসপাতালের জিনিসপত্র মেরামতের জন্য সরকারি নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে করতে হয়। এতে দীর্ঘসূত্রিতাও রয়েছে। ঢামেক সূত্র জানায়, শনিবার জরুরি বিভাগের ফটকে ‘মানব সেবা’ নামে একটি অ্যাম্বুলেন্সের চাপায় মর্মান্তিকভাবে চারজনের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় মারা যায় এক অনাগত ছয় মাসের শিশু। আহত হয় আরও পাঁচজন। আহতদের মধ্যে রমজান আলীর অবস্থা সংকটাপন্ন। বর্তমানে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

up-arrow