Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৫
ভালো নেই নারী
জিন্নাতুন নূর
ভালো নেই নারী

শহর কিংবা গ্রামে সব জায়গায়ই পথ চলতে গিয়ে প্রতিনিয়তই বখাটেদের বেপরোয়া উৎপাতের শিকার হতে হচ্ছে নারীকে। বাড়ি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে গমনাগমনের পথে দুর্বৃত্তদের নির্লজ্জ আচরণের কারণে তাদের হতে হচ্ছে বিব্রত। লজ্জায় অনেকে পরিবারের কাছে ঘটনা লুকিয়ে রাখছে অথবা মানসিক যন্ত্রণায় স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। কেউ কেউ করছে আত্মহত্যা। আবার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কেউ হচ্ছে ধর্ষণের শিকার। কেউবা দুর্বৃত্তের পৈশাচিক হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে। বখাটের ছুড়ে দেওয়া এসিডে ঝলসে যাচ্ছে কারও দেহ। অর্থাৎ প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দিলে কিংবা প্রেমময় সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর্যায়ে বনিবনা না হলেই নির্মম পরিণতি ভোগ করছে আমাদের যুবতী ও কিশোরীরা। বিবাহিত নারীদের অনেকেই স্বামীর নির্যাতনের ফলে সম্পর্ক ছেদ করে আলাদা বসবাস শুরু করেও রেহাই পাচ্ছেন না। প্রাক্তন স্বামী প্রতিশোধ নিতে তার ওপর হামলা চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা  বলছেন, নতুন প্রজন্মকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের করে না আনলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বার বার ঘটতেই থাকবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বখাটে ও দুর্বৃত্তদের উত্ত্যক্ততা ও যৌন হয়রানির কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ২৯টি প্রাণ ঝরে পড়েছে। এ ছাড়া গত আগস্টে ২৬৫ নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ১২২ জন গণধর্ষণের শিকার হয়। আর এ কারণে মৃত্যু হয় ২৩ জনের। ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে ৬ নারী। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সিলেট ছাত্রলীগের এক নেতার চাপাতির আঘাতে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। টানা কয়েক দিন অজ্ঞান থাকার পর জ্ঞান ফিরেছে মেয়েটির। এখন ঢাকার একটি হাসপাতালে খাদিজা নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন। গত ৩ অক্টোবর বিকালে এমসি কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পথে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম প্রকাশ্যে খাদিজার ওপর পৈশাচিক হামলা চালান। একইভাবে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ১৮ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় নিতু মণ্ডল নামের ১৫ বছরের এক কিশোরীকে একই গ্রামের মিলন মণ্ডল নামে বখাটে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে নিতুকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছিল মিলন। অন্যদিকে বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর মাগুরা সদর উপজেলার সাংদা লক্ষ্মীপুর গ্রামের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী হ্যাপী (১২) গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে। এর আগে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ওবায়দুল খান নামের আরেক বখাটে। রিশাকে দীর্ঘদিন ধরে মোবাইলে ও স্কুলে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করে আসছিল সে। তার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় অবশেষে ২৪ আগস্ট পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে স্কুলের সামনেই রিশাকে ছুরিকাঘাত করে ওবায়দুল। এর আগে ২৭ মে কনিকা ঘোষ (১৫) নামের দশম শ্রেণির আরেক ছাত্রী আবদুল মালেক নামেক এক বখাটের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। কনিকা শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফেরার পথে এ নির্মম ঘটনা ঘটে। তবে এ ঘটনায় কনিকার সঙ্গে তার আরও তিন সহপাঠী গুরুতর আহত হয়। এ ছাড়া সর্বশেষ গত বুধবার পুরান ঢাকার আজিমপুর সাফির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী এক বখাটের হামলায় আহত হন। কলেজে আসা-যাওয়ার পথে ইমন আলী নামের বখাটে সেই কলেজছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। সাড়া না দেওয়ায় মেয়েটিকে মারধর করে ইমন তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা এখন আর স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন আমাদের ভবিষ্যৎ গ্রাস না করে। আমরা সম্প্রতি নিতু, তনু, রিশা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং বিচারের রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’ তার মতে, ‘নতুন প্রজন্মকে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের করে না আনলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বার বার ঘটতে থাকবে।’ একসময় প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেই নারী ও কিশোরীদের ওপর এসিড হামলার ঘটনা দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। মাঝে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ এসিড হামলায় দগ্ধের সংখ্যা ১০০-এর নিচে থাকলেও এসিডসন্ত্রাস বন্ধ করা যায়নি। এসিড সারভাইবারস ফাউন্ডেশনের হিসাবে আগস্টে ৪২ জন এসিডদগ্ধ হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও কিশোরী বৈবাহিক সম্পর্কে বনিবনা না হওয়া এবং প্রেমের সম্পর্কে রাজি না হওয়ায় তাদের স্বামী ও বখাটেদের এসিড হামলার শিকার হন। ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে চট্টগ্রামের পোলোগ্রাউন্ড এলাকায় ঘুমন্ত এক নারীর ওপর তার প্রাক্তন স্বামী অটোরিকশাচালক জানে আলম জাহাঙ্গীর এসিড ছোড়েন। এতে সেই নারীর সঙ্গে তার মা হোসনে আরা বেগমও দগ্ধ হন। ৫ আগস্ট পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় দুর্বৃত্তরা ঘুমন্ত এক কিশোরীর ওপর এসিড ছোড়ে। ২৩ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের গ্রামে পূর্বশত্রুতার জেরে নিয়াশা আক্তার ও মনোয়ারা বেগম নামের দুই নারীর ওপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়। এর আগে স্বামীর ভাড়াটে লোকজনের হাতে মিরপুরে এসিড হামলার শিকার হন একই পরিবারের চারজন। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘ঢাকা ও তার বাইরে দেশের নারী ও কিশোরীরা কোথাও নিরাপদে নেই। অথচ নারীদের কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের প্রদত্ত দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে অভিযোগ কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি এখনো আমলে নিচ্ছে না।’

 

up-arrow