Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩১
ঐতিহ্য হারাচ্ছে যৌথ পরিবার
জিন্নাতুন নূর
ঐতিহ্য হারাচ্ছে যৌথ পরিবার

রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহমেদ ও তার স্ত্রী গুলনাহার বেগম। স্বামীর মৃত্যুর এক বছর আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গুলনাহার।

পরে একা বাসায় ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু হয় কামাল আহমেদের। সাত সন্তানের গর্বিত পিতা-মাতা ছিলেন তারা। তারা সন্তানদের নিয়ে একটি সুখী যৌথ পরিবারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, মেয়েরা হয়তো বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যাবে, কিন্তু চার ছেলে নিয়ে এক ছাদের নিচেই থাকবেন তারা। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ছেলেরা উপার্জন শুরুর পর বিয়ে করে একে একে আলাদা সংসার শুরু করেন। কামাল আহমেদ তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে পেনশনের টাকায় ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া করে থাকতেন। সন্তানরা মন চাইলে বয়স্ক মা-বাবাকে কালেভদ্রে টাকা পাঠাতেন, কখনোবা দেখতে আসতেন। ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একটু গল্প করার জন্য মুখিয়ে থাকলেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকিত্বের দুঃখভার নিয়েই কামাল-গুলনাহার দম্পতি পৃথিবী ছাড়েন। বাবা-মার মৃত্যুর পরও তাদের ছেলে-মেয়েরা আলাদা থাকছেন। কেউ কারও সঙ্গে ঈদ বা পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়া তেমন যোগাযোগ রাখেন না।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বিশেষ করে আশির দশকের গোড়ায় আধুনিক জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে এবং জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে বসবাস করার ফলে একক পরিবার প্রথার প্রচলন শুরু হয়। ভাঙতে শুরু করে একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবার। পুরান ঢাকা ও গ্রামীণ জীবনব্যবস্থায় এখনো কিছু পরিবার যৌথভাবে বসবাস করলেও আধুনিক ঢাকা ও বড় শহরগুলোয় বেশির ভাগই একক পরিবার। ঢাকা ও তার বাইরের গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে ওঠার বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করা গেছে। এর মধ্যে আছে কাজের যোগসূত্র ও পারিবারিক মতভিন্নতা, কলহ, ব্যক্তিগত সুবিধাপ্রাপ্তি, সম্পদের ভাগাভাগি, বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব। আর এ কারণগুলোর জন্য শহর ও গ্রামের স্বামী-স্ত্রীরা এখন তাদের সন্তানদের নিয়ে একক পরিবারে থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এতে ছিন্ন হচ্ছে যৌথ পরিবারের বন্ধন। ঢাকায় বসবাসকারী বেশ কয়েকটি একক পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ, ভাবী-ভাশুরের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তারা আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া ভাইবোনদের সঙ্গে আর্থিক বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেও অনেকে আলাদা থাকছেন। এমনকি পুরো পরিবারের সদস্যদের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বদলে শুধু নিজ সন্তানদের জন্য অর্থ খরচে আগ্রহী হয়েও অনেকে একক পরিবার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। যৌথ পরিবার প্রথা রক্ষার বিষয়ে দেশের চট্টগ্রাম, উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং পুরান ঢাকাবাসীদের সুনাম আছে। এরপর আশির দশকের শুরুতে গ্রাম ছেড়ে কাজের তাগিদে পরিবারের বড় ছেলেরা শহরে এলেও স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে বাবা-মায়ের কাছেই রেখে আসতেন। কিন্তু উন্নত জীবনের আশায় গ্রামীণ সংস্কৃতিতে কৃষিকাজ থেকে সরে ধীরে ধীরে পরিবারের সন্তানরা দেশের বাইরে কাজ করার উদ্দেশ্যে যেতে শুরু করেন। এ ছাড়া পরিবারপ্রধানের মৃত্যুর পর সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হওয়া বিবাদে বহু যৌথ পরিবার ভেঙে যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা জানান, সমাজে এখনো যৌথ ও একক এ দুই ধরনের পরিবার দেখা গেলেও যৌথ পরিবারের অস্তিত্ব ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। আর একক পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা নিজেদের অনুভূতি কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করতে না পেরে হয়ে পড়ছে অসামাজিক। এই শিশুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিষণ্নতা। আর মা-বাবা দুজনই কর্মজীবী হলে সেসব একক পরিবারের সন্তানের বেড়ে ওঠা হয়ে পড়ে আরও করুণ। আবার শহরে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টগুলোয় একই ছাদের নিচে একসঙ্গে অনেক মানুষ বসবাস করলেও বিপদে-আপদে কেউ কারও খোঁজ রাখে না। এতে সামাজিক যোগাযোগবিহীন এক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।

মনোচিকিৎসক ড. মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যৌথ পরিবারের সদস্যরা শিশুদের বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাধারণত একটি বৃহৎ পরিবারের একাধিক সদস্য শিশুদের শিক্ষা প্রদান ও নৈতিকতা তৈরিতে সাহায্য করেন। কিন্তু একক পরিবারের এ অভ্যাস না থাকায় শিশুরা অসামাজিক হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে একক পরিবারের সদস্যদেরও যৌথ পরিবারে না থাকায় নানা যুক্তি আছে। বেসরকারি কর্মকর্তা ফারিয়া আহমেদ বলেন, ‘অফিসের কাজ শেষে আমাকে রাতে ৯টা থেকে ১০টায় বাড়ি ফিরতে হতো। বিষয়টি আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ভালোভাবে নিতে পারেননি। তারা আমাকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। কিন্তু আমার স্বামী চেয়েছিলেন আমি কাজ করি। শেষ পর্যন্ত শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে মনোমালিন্য এড়াতে আমরা আলাদা সংসার শুরুর সিদ্ধান্ত নিই। ’

পুরান ঢাকার চালের আড়তের এক ব্যবসায়ী সায়েদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের পরিবারে তিন প্রজন্ম এখনো একসঙ্গে আছি। আমার দাদি বেঁচে আছেন। বাবার সঙ্গে আমি এবং অন্য দুই ভাই ব্যবসা দেখি। বোনদের পুরান ঢাকাতেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায়ই তারা বাসায় যাতায়াত করে। আমাদের পরিবারপ্রধান দাদি মুন্নুজান বেগম। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনিই গ্রহণ করেন। আমার মা জেবুন্নেছা খানম সংসারের অভ্যন্তরীণ বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তাকে সাহায্য করেন আমার ও ভাইয়ের স্ত্রীরা। আমরা তিন ভাই সংসারের প্রয়োজনীয় বাজারসদাই ও কেনাকাটা করি। আর বাবা (আমজাদ হোসেন) সংসারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। ’ সায়েদ বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পরিবারের সমস্যা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে ছোটখাটো বাকবিতণ্ডা লাগতেই পারে কিন্তু কখনো আলাদা থাকার কথা আমাদের মনে আসেনি। ’ সমাজবিজ্ঞানীরা জানান, ঐতিহ্য অনুযায়ী ঈদ-পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উপহার ভাগাভাগি করাই যৌথ পরিবারের বৈশিষ্ট্য। শীতে একসঙ্গে পিঠা খাওয়ার ধুম এবং পরিবারের নারী সদস্যদের হাতে বানানো আচার ও সুস্বাদু খাবার খাওয়ার ঘটনাগুলোও যৌথ পরিবারের একটি উপভোগ্য বিষয়। এসব পরিবারে সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেন। শিশুর মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ তৈরি করার আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত যৌথ পরিবার। সংসারের বাজার ও কেনাকাটায় সদস্যদের মিলিত অংশগ্রহণ যৌথ পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাকেও করে শক্তিশালী। কিন্তু শৈশবে একসঙ্গে খালাতো-মামাতো-ফুফাতো ভাইবোনদের বেড়ে ওঠা এবং দাদা-দাদির কাছ থেকে গল্প শোনার সেই সুন্দর প্রথা এখন অতীত হতে বসেছে।

up-arrow