Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩১
কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা কাগুজে পরিকল্পনাতেই বন্দী
অধিকাংশ প্রস্তাব শুরুই করা যায়নি, নেই উদ্যোগও
নিজামুল হক বিপুল

ঢাকা মহানগরী ও এর আশপাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার বিশাল এলাকা নিয়ে সরকার ২০ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা— এসটিপি গ্রহণ করেছে। ২০১৫ সাল থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হলেও সেটি বাস্তবায়নে নেই সরকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ।

এসটিপি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, এ পরিকল্পনা শুধুই কাগজপত্রে। বাস্তবে এটির কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ফলে সরকারের এমন একটি সুন্দর সময়োপযোগী পরিকল্পনা যেন আঁতুড়ঘরেই মারা যাওয়ার পথে। কারণ এই এসটিপিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি যেসব কার্যক্রম বা প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে, এর মধ্যে দুটি ব্যতীত আর কোনোটি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কাজই শুরু করা যায়নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, কাজ শুরু করতে গেলে প্রাথমিক যেসব কাজ জরুরি যেমন প্রাক-সমীক্ষা, চূড়ান্ত সমীক্ষা, সেগুলো শুরু করা যায়নি। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে এসটিপি প্রণয়নকারী সংস্থায় দক্ষ, যোগ্য ও প্রয়োজনীয় জনবল নেই। খোঁজখবর নিয়ে মিলেছে এসব তথ্য।   তবে সড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইতিমধ্যে আগে যে এসটিপি করা হয়েছিল তার প্রায় সব প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করা হয়ে গেছে। এখন রিভাইস এসটিপির বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৬, ৫ ও ১ এবং বিআরটি লাইন ৩ ও ৭ এর কাজ চলছে। বাকি প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রায় দুই কোটি মানুষের নগরী রাজধানী ঢাকা। এক প্রান্তে গাবতলী-আমিনবাজার, আরেকদিকে আবদুল্লাহপুর-টঙ্গী ব্রিজ এবং আরেক প্রান্তে শনিরআখড়া মুক্তি সরণি। প্রাথমিকভাবে এই হচ্ছে রাজধানীর চৌহদ্দি। এই শহরে প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ ঢুকছে নতুন ঠিকানা আর কাজের সন্ধানে। সেই তুলনায় শহরের প্রধান সমস্যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উন্নতি ঘটছে না। এ অবস্থায় ঢাকা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, মহানগরীর প্রবেশ ও নির্গমন, মহাসড়কের যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা এসটিপি প্রণয়ন করা হয়। যেটি তিন ধাপে অর্থাৎ প্রথম ধাপে ২০০৫ থেকে ২০০৯; দ্বিতীয় ধাপে ২০১০ থেকে ২০১৪ এবং তৃতীয় ধাপে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে গ্রহণ করা সেই এসটিপি অনুমোদন পায় ২০০৮ সালে। ফলে তিন বছরে দৃশ্যপট অনেক পাল্টে যায়। এ কারণে প্রথম ধাপের কাজই শুরু করা যায়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসটিপিতে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এসটিপির বাইরে আরও কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট এবং কুড়িল ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ প্রকল্প। এর মধ্যে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সূত্রে জানা গেছে, বিগত প্রায় সাত বছরে রাজধানীর পরিবহন সেক্টরে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আয়তন ও জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকার পাশে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সৃষ্টি হয়। দুই ভাগে বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিধি বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ঢাকার চারপাশে পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পের মতো নতুন নতুন উপশহর সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্গত কারণেই ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার চাহিদা এবং পরিধি দু-ই বেড়েছে। এ অবস্থায় এসটিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উন্নয়ন সহযোগী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার (জাইকা) সহযোগিতায় ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে রিভিশন অ্যান্ড আপডেটিং অব স্ট্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ২০০৫ সালের এসটিপি হালনাগাদ ও সংশোধন করে ২০১৫ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি একটি এসটিপি প্রণয়ন করা হয়। গত বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে এই এসটিপি অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ট্রিপ তৈরি হয়। সংশোধিত এসটিপি অনুযায়ী ২০২৫ সাল নাগাদ এই ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৪২ মিলিয়নে। আর ২০৩৫ সালে প্রতিদিন তৈরি হবে ৫২ মিলিয়ন ট্রিপ। রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকার জনসংখ্যার কথা বিবেচনা করে তাদের এই বিশাল পরিবহন চাহিদা মেটাতে প্রস্তাবিত এসটিপিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি), দুটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), তিনটি রিং রোড, আটটি রেডিয়াল সড়ক, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে, ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব বা বাস স্টেশন নির্মাণ এবং ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, ট্রাফিক সেফটি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এবং গণপরিবহন বা বাস পরিবহন সেক্টর পুনর্গঠন করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক তথ্য হচ্ছে, ডিটিসিএ জাইকার সহযোগিতায় এই এসটিপি প্রণয়ন করলেও তাতে জরুরি ভিত্তিতে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে সেগুলোর একটিরও কাজে এখন পর্যন্ত হাত দেওয়া যায়নি।

জনবল সংকটে ডিটিসিএ : কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করা হলেও ডিটিসিএ জনবল সংকটের কারণে কোনো কাজই সামনের দিকে আগাতে পারছে না। প্রাতিষ্ঠানিক এই দুর্বলতার কারণে তারা কোনো কাজ করতে পারছে না। ডিটিসিএর যেখানে প্রয়োজন চার শতাধিক লোকের, সেখানে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭০ জন জনবল। যার মধ্যে মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা। বাকি সবাই সাপোর্টেড স্টাফ। আবার ১১ জন কর্মকর্তার প্রায় সবাই ডেপুটেশনে ডিটিসিএ-তে কর্মরত। ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী এবং কার্যকর করতে বছর তিনেক আগে ডিটিসিএর পক্ষ থেকে একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি করে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয় ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। যাতে বিদ্যমান জনবলের সঙ্গে আরও ৩৯৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ সৃজন করে পোস্টিং দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব কাটাছেঁড়া করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত বছরের মার্চ মাসে মোট ১৫০ জন জনবলের অনুমোদন দেয়। সেই অনুমোদিত প্রস্তাব এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন।

খোঁজ নেই জরুরি প্রকল্পগুলোর : এসটিপি বাস্তবায়নে সবার আগে জরুরি ঢাকা-মাওয়া-ঢাকা-চট্টগ্রাম পদ্মা লিংক রোড। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চার লেনের ওই লিংক রোডটি নির্মাণের জন্য এসটিপির সুপারিশে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই কাজের কোনো খবর নেই এখন পর্যন্ত। সুপারিশে বলা হয়েছিল, পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকার ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। সেই চাপ সামাল দিতেই এই লিংক রোডটি জরুরি। একইভাবে ঢাকা মহানগরীর চারপাশে ছয়টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব এসটিপিতে করা হলেও এগুলোর বিষয়েও কোনো পদক্ষেপ নেই। এসটিপিতে ঝিলমিল এলাকায় একটি হাব ট্রান্সপোর্টেশন বা বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেটি পদ্মা সেতু চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চালু করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এ প্রস্তাবের বিষয়েও কোনো কাজ এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের আরেক প্রস্তাব ছিল পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকা ঘিরে রোড নেটওয়ার্ক তৈরি করার। কিন্তু এসটিপিতে অগ্রাধিকার দেওয়া এ প্রস্তাবের বিষয়েও কোনো পদক্ষেপ নেই। এরকম আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দফতরগুলোর।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow