Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩৪
গেস্টহাউসের জমি কিনতে জালিয়াতি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষোভ, দলিলে সাড়ে ৩ কোটি অনুমোদন ১১ কোটি, আইন উপদেষ্টার মতামত উপেক্ষা
কাজী শাহেদ, রাজশাহী

ঢাকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নিজস্ব গেস্টহাউসের জায়গা কিনতে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। আইন উপদেষ্টার পরামর্শ উপেক্ষা করে এমন জালিয়াতি করার পর তা সিন্ডিকেটে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। জমিটি কিনতে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও সিন্ডিকেটে মূল্য দেখানো হয়েছে ১১ কোটি। আগে থেকে সেখানে ছয় তলা ভবন থাকলেও নতুন করে ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা জালিয়াতির তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওই জমির রেজিস্ট্রিতেও আছে নানা অসংগতি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মকর্তাদের থাকার সুবিধার্থে ঢাকায় একটি গেস্টহাউস নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সে অনুযায়ী জমি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকার ধানমন্ডির সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের আওতায় ১৩৩১ নম্বর দলিলে সাড়ে ৩ কাঠা জমি কেনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। খালিদ মাহমুদ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কেনা হয় জমিটি। গত বছর ২০ অক্টোবর রেজিস্ট্রি হওয়া দলিল অনুযায়ী জমিটির মূল্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছর ২৬ নভেম্বর খালিদ মাহমুদের সঙ্গে করা চুক্তি ও ২৯ নভেম্বরের সিন্ডিকেট সভায় জমি এবং সেখানে ভবন নির্মাণ বাবদ মূল্য দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে সিন্ডিকেটে অনুমোদন, এরপর বায়নানামা করে জমিটি রেজিস্ট্রি করার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে করা হয়েছে উল্টো। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব থেকে ইতিমধ্যে খালিদ মাহমুদকে ১০ কোটি টাকা পরিশোধও করেছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় যে জমিটি কিনেছে সেটি নিয়েও আছে জটিলতা। ১৯ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রফিকুল হাসানের দেওয়া মতামত থেকে জানা যায়, ২০০০ সালের ১ জুন ২০৭৯ নম্বর বিক্রি দলিলের গ্রহীতা নাসরিন আখতার ও দাতা মীর মাইদুল হকসহ অন্য ১২ ব্যক্তির স্বাক্ষর করা দলিলস্বত্বের ধারাবাহিক বর্ণনার মিল নেই। ১৯১৭ সালের দলিলে ক্রেতা-বিক্রেতা হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ আছে, ২০৭৯ নম্বর দলিলের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। ২০০০ সালের ৫ জুন দলিল সম্পাদন হয়েছে উল্লেখ করা হলেও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে উত্থাপন করা হয়েছে ১ জুন। আবার ওই দিনই সেটি রেজিস্ট্রি দেখানো হয়েছে, যা সংগতিপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করেন আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রফিকুল হাসান। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সায়েন উদ্দিন আহমেদকে আহ্বায়ক ও প্রধান প্রকৌশলী সিরাজুম মুনীরকে সদস্যসচিব করে গঠিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি একাধিক বৈঠক শেষে সর্বসম্মতিক্রমে ‘মেট্রো হোমস’-এর দরপত্র প্রস্তাব বিবেচনা না করার এবং ‘এলডোর্যাডো প্রপার্টিজ’-এর দরপত্র শর্তসাপেক্ষে গ্রহণের জন্য ‘জমিসহ ইমারত ক্রয় কমিটি’র কাছে সুপারিশ করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহানকে আহ্বায়ক এবং উপ-উপাচার্যের সচিব আবু মো. জহিরুল আলমকে সদস্যসচিব করে গঠিত ‘জমিসহ ইমারত ক্রয় কমিটি’র গত বছর ৩১ আগস্টের সভায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশকৃত এলডোর‍্যাডো প্রপার্টিজের দরপত্র বাতিল এবং জমির মালিক খালিদ মাহমুদের ঢাকার হাতিরপুল পুকুরপাড় এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট লেনের ৩৭৩/১২ হোল্ডিংয়ের সাড়ে ৩ কাঠা জমি ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় (গত বছর ২০ অক্টোবর ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদিত সাফ-কবলা দলিলের [নম্বর ১৩৩১/১৬] মাধ্যমে) কেনে। ক্রয় কমিটির সিদ্ধান্তে ওই দলিলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সায়েন উদ্দিন আহমেদ ও রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এন্তাজুল হক স্বাক্ষর করেছেন। তবে এ বিষয়ে অধ্যাপক সায়েন উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঢাকায় গেস্টহাউস তৈরির বিষয় নিয়ে যে অপপ্রচার চলছে তা ভিত্তিহীন। জমি ক্রয়-সংক্রান্ত সব বিষয় সিন্ডিকেট সদস্যদের অনুমোদনে পাস হয়েছে। এখানে অস্বচ্ছতার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান প্রশাসনের সুনাম নষ্ট করার জন্য কুচক্রী এক মহল এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। ’ জমি কেনার নথিপত্রে দেখা যায়, ক্রয় কমিটির সিদ্ধান্তের রেজুলেশনে ওই জমির মূল্য ১১ কোটি এবং জমিতে ভবন নির্মাণ ব্যয় ২ কোটি ২৫ লাখ— এই মোট খরচ ১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। জমির সাফ-কবলা রেজিস্ট্রি দলিল সম্পাদনের ৩৬ দিন পর গত বছরের ২৬ নভেম্বর ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জমির বিক্রেতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সায়েন উদ্দিন আহমেদ ও রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এন্তাজুল হক ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় ও ভবন নির্মাণ চুক্তিপত্র’ সম্পাদন করেছেন, যা একই তারিখে নোটারি পাবলিক অ্যাডভোকেট মো. আবদুর রাজ্জাকের মাধ্যমে নিবন্ধনও (রেজি. নম্বর-০০০০০৮৪৩, তারিখ-২৬.১১.২০১৬) করা হয়েছে। ওই চুক্তিপত্রেও ‘জমিসহ ইমারত ক্রয় কমিটি’র চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের রেজুলেশনের অনুরূপ সাড়ে ৩ কাঠা জমির প্রকৃত মূল্য ১১ কোটি এবং ভবন নির্মাণের ব্যয় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ‘টেবিল এজেন্ডা’ (তাত্ক্ষণিক উপস্থাপিত) হিসেবে জমির মালিকের সঙ্গে সম্পাদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারের ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় ও ভবন নির্মাণ চুক্তিপত্র’ কৌশলে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিন ক্যাটাগরি থেকে নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক এম আখতার ফারুক জানান, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্টহাউসের জন্য জমি ও ভবন কেনার চুক্তিপত্রটি সিন্ডিকেটের সভায় টেবিল এজেন্ডা হিসেবে উপস্থাপন ও পাস করিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আগে থেকে তাদের (সিন্ডিকেট সদস্য) জানানো হয়নি। এমনকি সিন্ডিকেটের ওই দিনের সভায়ও ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় ওই জমি কেনার সাফ-কবলা দলিল সম্পাদনের বিষয়টি তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, ‘সিন্ডিকেটে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হলে তা আমাদের এক সপ্তাহ আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকায় গেস্টহাউস তৈরির জন্য জমি ক্রয়-সংক্রান্ত যে চুক্তির বিষয়টি ওই সিন্ডিকেটে পাস হয়, তা তাত্ক্ষণিকভাবে উত্থাপন করা হয়েছিল। জমির বিক্রয়দাতা ও ক্রয়কারীর মধ্যে আগেই সেই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। পরে সিন্ডিকেটে এটি পাস করানো হয়। এ নিয়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল। ’ সূত্র মতে, ওই জমিতে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন নির্মাণের সত্যতা ধরে নেওয়া হলেও দলিলে উল্লিখিত মূল্য ৩ কোটি ৫০ লাখ এবং জমিসহ ইমারত ক্রয় কমিটির সিদ্ধান্ত ও মালিকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে উল্লিখিত মূল্য ১১ কোটির মধ্যে পার্থক্যের অবশিষ্ট সাড়ে ৭ কোটি টাকা কৌশলে আত্মসাত্ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় নীতিমালার শর্তানুযায়ী আবারও দরপত্র আহ্বানের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু ক্রয় কমিটি তা উপেক্ষা করেছে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন কিস্তিতে (প্রথমে ২ কোটি, দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ৫ কোটি এবং তৃতীয় দফায় আড়াই কোটি) ১০ কোটি টাকা জমির মালিককে পরিশোধও করেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রফিকুল হাসানের লিখিত মতামতও উপেক্ষিত হয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী এবং জমিসহ ইমারত ক্রয় কমিটির সদস্য ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব মো. সিরাজুম মুনীর কোনো কথা বলতে অপারগতা জানান। জানতে চাইলে ‘জমিসহ ইমারত ক্রয় কমিটি’র আহ্বায়ক ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান বিনা দরপত্রে জমি ও স্থাপনা কেনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দুবার দরপত্র আহ্বান করেও নিজস্ব জমিতে গেস্টহাউস করার উদ্যোগ সফল হচ্ছিল না। এ ছাড়া ফ্ল্যাট কিনলে সমিতির নিয়মকানুন মেনে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা থাকতে পারবেন না। এ অবস্থায় ঢাকা শহরের মতো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমিতে গেস্টহাউস করার স্বার্থে সিন্ডিকেটের অনুমোদন নিয়ে জমি কেনা ও ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে আইনগত কোনো বাধা নেই। ’ এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন সাবেক পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), মহাহিসাবনিরীক্ষকের কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপপরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তারা সবাই নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অধ্যাপক সায়েন উদ্দিন আহমেদ এ ক্ষেত্রে সঠিক বলেননি। সঠিক তথ্য হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনে এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড সরকারের আইনেই পরিচালিত হয়। এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮-এর সুস্পষ্ট ও সরাসরি লঙ্ঘন হয়েছে। আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট ক্রয় কমিটি ও সিন্ডিকেট এর দায় এড়াতে পারে না।

 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow