Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৫৫
লেবাননের শ্রমবাজারে দালালদের দৌরাত্ম্য
তিন লাখ টাকার ভিসা বিক্রি হচ্ছে আট লাখে
শিমুল মাহমুদ, বৈরুত (লেবানন) থেকে ফিরে

মধ্যরাতে দুবাই এয়ারপোর্টে দুজন অচেনা লোককে পেছন পেছন ঘুরতে দেখা গেল দীর্ঘক্ষণ। একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করা হলো।

একজন উত্তর দিলেন, ‘আমরাও লেবানন যামু। শুনলাম আপনারাও যাইতেছেন। এজন্য লগে আসতেছি। ’ গাজীপুরের ইমাম হোসেন (৩৮) পৌনে চার লাখ টাকা খরচ করে লেবানন যাচ্ছেন। স্কুলের দফতরির চাকরি। বেতন ২৭ হাজার টাকা। জানালেন, তার মামা তপন থাকেন লেবাননে। নইলে আরও বেশি টাকা খরচ হতো। দুবাই এয়ারপোর্টে বৈরুতগামী বিমানে ওঠার আগে প্রায় প্রতিদিনই এমন বাংলাদেশির দেখা মেলে। পশ্চিম এশিয়ার এই আরব দেশ হচ্ছে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মিলনস্থল। পাহাড় ও সাগর পরিবেষ্টিত লেবাননে বহিরাগতরাই দেশের চালিকাশক্তি। এক সময়ের ফরাসি উপনিবেশ লেবাননকে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বা প্যারিস। সেই লেবাননে কাজ করতে এসে ভাগ্য বদলের পাশাপাশি নানা অপকর্মেও জড়িয়ে পড়েছেন বাংলাদেশিরা।

লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে হাতে গোনা কিছু বাংলাদেশির কারণে বিপদে পড়ছেন। দালালদের অপতৎপরতায় তিন লাখ টাকা খরচের ভিসা এখন আট লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে লেবাননে শ্রমিক হিসেবে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অন্য বাংলাদেশিদের বিপদে ফেলছেন তারা। প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিনিধি দলের লেবানন সফরকালে এসব অভিযোগ জানান প্রবাসীরা। বৈরুত দূতাবাসে আয়োজিত কমিউনিটি সমাবেশে মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূইয়ার নেতত্বে ডা. দীপু মনি, কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীসহ এমপিরা প্রবাসীদের বক্তব্য শোনেন। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের দেশ লেবাননে দেড় লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় কাজ করছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নারী অভিবাসীর সংখ্যা লক্ষাধিক। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন। লেবাননের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধভাবে এখানে এলেও পরে প্রতারকের পাল্লায় পড়ে তারা অবৈধ হয়ে পড়েন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভিসা বন্ধ থাকায় এখন অনেকেই লেবাননে যাচ্ছেন। এই সুযোগে সাত-আট লাখ টাকা হাতিয়ে দালালরা প্রবাসীদের গ্যাস স্টেশন, সুপারস্টোরে কাজ দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যান। কিন্তু পরে কাজ করতে হয় বাসাবাড়িতে। সবচেয়ে বড় সমস্যা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই লেবাননে যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। কাজে নেমেই স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে তাদের। লেবানিজদের পরিবারে ভাত খাওয়ার সুযোগ কম। ফলে যে গৃহকর্মীটি ভাগ্য বদলের আশায় লেবাননে যাচ্ছেন তাকে মাসের পর মাস ভাত না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। পরে তিনি ফিরে যেতে চান। পালিয়ে যান। তাদের দেশে পাঠানো কঠিন। জানা গেছে, দালালরা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাগজপত্র চূড়ান্ত না করেই ভিসা নিচ্ছেন। সেখানে যাওয়ার পর সেই দালালের খোঁজ পান না শ্রমিকরা। দেশে ফিরে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ কোম্পানি থেকে পালিয়ে বাইরে কাজ করেন। কিন্তু তাতে অবৈধ কাগজপত্রের কারণে জেলে যাওয়ার পরিস্থিতি হয়। এসব পরিস্থিতি এড়াতে বেশির ভাগ শ্রমিককেই কম বেতনে বেশি কাজ করতে হয়। বৈরুত দূতাবাসে কমিউনিটির সমাবেশে এসব বাংলাদেশি দালালদের শাস্তি চাইলেন প্রবাসীরা।

প্রয়োজন কালচারাল মোটিভেশন : লেবাননের অনেক সম্ভাবনার শ্রমবাজার নষ্ট করছেন বাংলাদেশি দালালরাই। সেখানে কাজের জন্য যেতে সর্বোচ্চ তিন হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। কিন্তু এক শ্রেণির রাজনৈতিক দালাল ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বিক্রি করছেন। অথচ কাজটা হচ্ছে মাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩০০ ডলারের। এজন্য যারা লেবানন যাচ্ছেন ভালো করে খোঁজ নিয়ে যেতে হবে। কত টাকা খরচ করে কত টাকা বেতনের কাজের জন্য যাচ্ছেন সে হিসাব রাখাটা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা বিদেশে কাজে যাওয়ার আগে কালচারাল মোটিভেশন দরকার। কী পরিবেশে কাজ করতে হবে সেটা জেনে যেতে হবে।

লাশ পাঠানো বড় সমস্যা : বিদেশ থেকে দেশে লাশ পাঠানো সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রথমত, আইনি জটিলতা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ এয়ারলাইনস মৃতদেহ বহন করতে চায় না। লেবাননে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার জানান, ২০১৬ সালে লেবাননে ৫৯ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তার মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ জন। বেশির ভাগই ছেলে, পারিবারিক কারণে মারা গেছেন। তবে বাংলাদেশিদের লাশ দেশে পাঠানোয় জটিলতা কমেছে। লেবাননে বাংলাদেশের দূতাবাস হয়েছে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার বলেন, লেবাননে বড় সমস্যা দালালদের দৌরাত্ম্য। তাদের কারণে প্রবাসীরা সংকটে পড়ছেন। তিনি জানান, লেবাননে প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি থাকলেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ানদের। প্রায় ৮০ হাজার। ফিলিপাইনের আছে ২৭ হাজার। ভারতের ছয় হাজার, পাকিস্তানের ১১ হাজার ও সুদানের ৮ হাজার শ্রমিক। বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের কাছে শিশুসন্তান ও বয়স্কদের নিশ্চিন্তে বাইরে রেখে যান লেবানিজরা। রাষ্ট্রদূত বলেন, শুধু জনশক্তি রপ্তানি নয়, বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য বিনিয়োগের এক আকর্ষিত ক্ষেত্র হচ্ছে লেবানন।

up-arrow