Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৯
ঝুঁকি নিয়েই চলছে শপিং মল-মার্কেট
ঝুঁকিতে সিটি করপোরেশনের ৩৯ মার্কেট, মানা হচ্ছে না বিল্ডিং কোড, যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা
জিন্নাতুন নূর

রাজধানীর বেশির ভাগ শপিং মল ও মার্কেট অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই চলছে। এ তালিকায় যেমন সিটি করপোরেশনের মার্কেট রয়েছে, তেমন রয়েছে বেসরকারি মার্কেট।

ঢাকা উত্তর সিটি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ অবশ্য এরই মধ্যে ৩৯টি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের তালিকা তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তালিকা করা মার্কেটগুলোর মধ্যে উত্তরের ৭টি এবং দক্ষিণের ১০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব মার্কেট ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ মার্কেটের সামনে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ সাইনবোর্ড টাঙালেও মার্কেটের ব্যবসায়ীরা সেই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে নগরীর শপিং মল ও মার্কেট সম্পূর্ণ অনিরাপদ অবস্থায় থাকায় যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে অগ্নি ঝুঁকিতে থাকা নগরীর মার্কেটগুলোর হালনাগাদ তালিকা তৈরির কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। যদিও দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যবসায়ীদের আগে থেকেই যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। তবে এখনো তারা এ বিষয়ে আগের মতোই উদাসীন। এমনকি  ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের সংরক্ষণ বা পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন হলেও ব্যবসায়ীরা এতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সূত্রমতে, অগ্নি ঝুঁকি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও অগ্নি আইন (২০০৩) অনুযায়ী ৩০টির বেশি নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করার কথা।

এ বিষয়ে খোঁজ নিতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর মার্কেটগুলোর অধিকাংশই নিয়ম মেনে ভবন তৈরি করেনি। অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে মার্কেটগুলোতে নেই অক্সিজেন সিলিন্ডার, পানির রিজার্ভ ট্যাংক, বালুভর্তি বালতি ও রেসকিউ সিঁড়িসহ অন্যান্য অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রী। বিশেষ করে পুরনো মার্কেটগুলোর বেশির ভাগেই নেই অগ্নিনির্বাপণে কোনোরকম ব্যবস্থা। আর নতুন মার্কেটগুলোর অনেকগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখা গেলেও পানির রিজার্ভ ট্যাংক বা আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দেখা যায়নি।

রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলোর মধ্যে গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, ঢাকা ট্রেড সেন্টার, সুন্দরবন স্কয়ার, বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেট, ফুলবাড়িয়া মার্কেট, মৌচাক মার্কেট, নিউ সুপার মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনীচক মার্কেট, ইস্টার্ন মল্লিকা, ইস্টার্ন প্লাজা, প্রিয়প্রাঙ্গণ শপিং সেন্টার, মোহাম্মদপুর টাউন হল, চন্দ্রিমা মার্কেট, বনলতা মার্কেট, খিলগাঁও সুপার মার্কেট, কারওয়ান বাজার চিকেন মার্কেট, সদরঘাট হকার্স মার্কেটসহ মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি মার্কেট। ফায়ার সার্ভিস, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল, সিটি করপোরেশন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে এ মার্কেটগুলোর তালিকা তৈরি করেছে।

আইন অনুযায়ী দুর্ঘটনা রোধে মার্কেটের অবস্থান, ব্যবহূত ফ্লোরের আয়তন, সাধারণ সিঁড়ির প্রশস্ততা, অগ্নিনির্বাপণ কাজে সিঁড়ির ব্যবস্থা, জরুরি প্রস্থানের সিঁড়ির সংখ্যা, প্রতি তলায় সেফটি লবির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা। এ ছাড়া ছাদে ওঠার সিঁড়ির সংখ্যা বেশি থাকা, ছাদের দরজা খোলা রাখা, বহির্গমন দরজার সংখ্যা বেশি রাখা, আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংক মজুদ (৫০ হাজার গ্যালন) রাখা, ১০ হাজার গ্যালনের ওভার হ্যাড ওয়াটার ট্যাংক থাকা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারে কনসিল ওয়্যারিং থাকা, বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ বক্স ও ডিমান্ড বক্সের নিরাপদ অবস্থানে থাকা এবং প্রতি পয়েন্টে ৫ কেজি পরিমাণের সিওটু ফায়ার এক্সটিংগুইসার সংরক্ষণ করা, স্মোক ও হিট ডিটেক্টর রাখা এবং মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মীদের নিয়মিত অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ করানোর কথা। কিন্তু এসব নিয়ম কেউ মানছেন না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকরা এই প্রতিবেদককে জানান, রাজধানীর শপিং মল ও মার্কেট ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি না করায় বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া আধুনিক ভবনগুলোতে উন্নত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি যেমন-স্মোক ডিটেক্টর, অটোমেটিক ফায়ার ডিটেক্টর ইত্যাদি ব্যবহার করার ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও সবাই তা মানছেন না। এমনকি এই ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যে যন্ত্র রয়েছে- সেগুলোও মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি করার কথা থাকলেও তারা তা করছেন না। আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিয়ম মেনে রাসায়নিক পদার্থ সংরক্ষণ করার বিষয়টি ব্যবসায়ীরা অগ্রাহ্য করে চলছেন। ফলে শপিং মল ও মার্কেটগুলোতে যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়ে গেছে। নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের শপিং মলগুলোতে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি শপিং মলের দোকানে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কিনা- তা যাচাই করে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া উচিত। কিন্তু এটি মানা হচ্ছে না। তিনি বলেন, বড় শপিং সেন্টারগুলোতে হাইড্রেন্টের (আগুন নেভাতে ব্যবহূত পানির কল) ব্যবস্থা থাকতে হবে। আগুন নেভাতে শপিং সেন্টারগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের মার্কেটের দোকানগুলোতে সেই ব্যবস্থা নেই। মাসে অন্তত একবার আগুন লাগলে করণীয় কী হবে- সে বিষয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের ড্রিল করানোর নিয়ম হলেও তা পালন করা হয় না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow