Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩৩
ঘোষেটি বেগমের বন্দীশালা বিলীন
মাহবুব মমতাজী
ঘোষেটি বেগমের  বন্দীশালা বিলীন

বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালা ঘোষেটি বেগমের বন্দীশালাটি, যা ছিল প্রাচীন মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম স্থাপত্য। এটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করলেও তা এখনো অধিগ্রহণের আওতায় আসেনি।

কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাজারের হাউলিতে তা নওগোরা হিসেবে স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত। বর্তমানে সেখানে বন্দীশালার তিনটি চিহ্ন থাকলেও তা ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ির সীমানার ভিতর রয়েছে। বাড়ির ভিতর না গিয়ে আশপাশ থেকে কোনোভাবে বোঝার উপায় নেই যে সেখানে প্রাচীন স্থাপত্য ছিল। কারণ তা ধ্বংস করে দখলে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রাচীন নিদর্শন এলাকাটি ঘিরে পাঁচশর বেশি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। জানা যায়, ঐতিহাসিক পলাশী যুদ্ধের পর ঢাকার বড় কাটরা দুর্গের দক্ষিণ পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর তীরে মুঘল সুবাদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম খান প্রতিষ্ঠিত প্রমোদকেন্দ্রে (হাবেলি বা হাউলি প্রাসাদ) সিরাজউদ্দৌলার মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুত্ফা বেগম, কন্যা কুদসিয়া বেগম ওরফে উম্মে জোহরা ও খালা ঘষেটি বেগমকে কড়া পাহারায় বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এ সময় তাদের শিকল (জিঞ্জির) পরিয়ে রাখা হয়। জনশ্রুতি আছে, এই জিঞ্জির থেকেই পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের নাম হয় জিনজিরা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্বজনদের বন্দী করে রাখা জিনজিরার নওগোরার দালান এখন শুধু কাগজে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। মীর জাফর আলী খানের ছেলে মীর সাদেক আলী খান ওরফে মিরনের নির্দেশে ঘষেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে এ প্রাসাদ থেকে নৌকায় তুলে নিয়ে ধলেশ্বরী নদীতে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জিনজিরা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ফটকের সামনে দিয়ে হাতে ডানের গলি ধরে কিছুদূর হাঁটলেই বাঁয়ের গলি। এর শুরুতেই রয়েছে একটি সেলুন। এর সঙ্গে ঘেঁষা রয়েছে প্রাচীন একটি ফটকের চিহ্ন, যেগুলো ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল আবাসিক ভবন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ওই বাড়ি দুটির মালিক রেজাউল করিম পল ও শিপলু নামের দুজন ব্যবসায়ীর। সেখান থেকে হাউলি গার্লস স্কুল রোডের ২ নম্বর লেনের ১ নম্বর বাড়ির ভিতর পাওয়া যায় প্রাচীন প্রসাদের একটি মঠ। এটিকে ঘিরে নিয়ে তিনতলা বাড়ি বানিয়েছেন আজম নামের এক ব্যক্তি। জিনজিরা বাজারের স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ের সামনে দিয়ে ব্রাইট ফিউচার স্কুলের গলি ধরে কিছুদূর গেলে ১৫ নম্বর বাড়ির ভিতর দেখা যাবে প্রাসাদের দেয়ালের একটি খণ্ড। গার্লস স্কুল রোডের আবদুল জব্বার নামে ৬০ বছরের বেশি বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি যে এখানে নবাবের পরিবার ও ঘষেটি বেগমদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ব্রিটিশ আমল থেকে বিভিন্ন লোক এর আশপাশের জায়গা লিজ নিয়ে পর্যায়ক্রমে দখল করে নিয়েছে। ’

শহিদ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘এই প্রাসাদের জায়গাগুলো নিয়ে অসংখ্য বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন কেউ এলে এখানে প্রাচীন কিছু আছে বলে খুঁজে পাবে না। শুধু আজম ভাইয়ের বাড়ির ভিতর যেটি আছে, সেটি ছাড়া দেখার মতো আর কোনো চিহ্নই নেই। যা ছিল সব ভোগদখল করে যে যেভাবে পারছে বাড়ি করে ফেলেছে। ’

তবে মাঝেমধ্যে কিছু লোক গবেষণার খাতিরে এ স্থানটি পরিদর্শনে আসেন বলে সফিকুল নামের এক মুদিদোকানি জানান। তিনি বলেন, এ নিয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা কিছুদিন কাজ করেছিলেন। তিনিই এখনকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী লাজু মেম্বার, চান মিয়া ও কালা মিয়ারা এ জায়গায় বাড়ি তুলে দখলে নিয়েছেন। যোগাযোগ করা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি তার কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি ২০১৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পরই এটি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। এর সরকারি কোনো কাগজপত্র আমাদের হাতে নেই। পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে একটি আবেদন দেওয়া হয়। টানা তিন বছর কাজ করার পর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে একটি গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত জায়গাটি অধিগ্রহণ করা হয়নি। ’ তবে গেজেট প্রকাশের তথ্য দিয়ে ওই স্থানে শিগগিরই একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হবে বলেও জানান এই নির্বাহী কর্মকর্তা। এ বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম খান বলেন, সেখানে বিভিন্ন মানুষ নানাভাবে আছে। আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে প্রাসাদের সীমানা নির্ধারণ করা উচিত। এরপর আগে যা হয়েছে এখন পরিবর্তন বা পরিমার্জন বন্ধ করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow