Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩৩
গাড়িতে আত্মঘাতী বোমা!
সাখাওয়াত কাওসার
গাড়িতে আত্মঘাতী বোমা!

গত বছরের ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামের খুলশীতে খুলশী সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে একটি প্রাইভেটকারে গ্যাস নেওয়া হচ্ছিল। হঠাৎ করেই বিকট শব্দে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়।

চোখের পলকেই উড়ে যায় গাড়ির বেশির ভাগ অংশ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারীসহ তিনজন। একই বছরের ১৪ এপ্রিল আশুলিয়ার ডেল্টা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে একটি প্রাইভেটকারে সিএনজি গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে গাড়ির মালিকসহ দুইজন নিহত হন। এ তো গেল মাত্র দুটি ঘটনা। মাঝেমধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা। পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন—পবার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিনশ’র বেশি সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে মারা গেছে দুইশ’র বেশি মানুষ।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিজিএল) তথ্যমতে, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত যানবাহনের সংখ্যা তিন লাখের বেশি। অথচ সিলিন্ডার রি-টেস্ট করা হয়েছে মাত্র ৭০ হাজার গাড়ির।

এ তথ্য গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা গাড়িতে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে সাধারণ মানুষ। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডারকে চলন্ত বোমার চেয়েও ভয়ংকর বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩২০০ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় এক একটি গাড়ি চলন্ত বোমা হয়ে ওঠে। এ জন্য এর সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। জ্বালানি হিসেবে তেল ছেড়ে পরিবেশবান্ধব সিএনজিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ধোঁয়া থেকে মুক্তি মিললেও দেড় যুগ পেরিয়ে এখন তদারকির অভাব আর পরিবহন মালিকদের উদাসীনতায় সেই সিএনজিচালিত গাড়ি রীতিমতো ‘বোমায়’ রূপান্তরিত হচ্ছে। কালক্ষেপণ না করে সিলিন্ডার রিটেস্ট ও নিম্নমানের সিলিন্ডার পরিবর্তনের পরামর্শ তাদের। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশে যেসব গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে, পাঁচ বছরেরও বেশি সময় সেগুলোর মান পরীক্ষা হয়নি। এর পরও দেশে প্রায় আড়াই লাখ গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নেই, যদিও সেগুলোর অধিকাংশেরই মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম বলছেন, রিটেস্ট সহজীকরণ ও উৎসাহিত করার জন্য তারা বেসরকারি ২৬টি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৭টি কোম্পানি বর্তমানে সেবা দিচ্ছে। তিনি বলেন, ১৮৮৪ সালের বিস্ফোরক আইন অনুযায়ী ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারকে বোমা হিসেবে বিবেচনা করেন তারা। তাই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর পর সিলিন্ডারগুলো পরীক্ষণের নির্দেশ রয়েছে। আরপিজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (সিএনজি) মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার সময় সিএনজিচালিত গাড়ির সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিআরটিএকে বলা হয়েছিল। কিছুদিন তা কঠোরভাবে অনুসরণ করায় সিএনজি রিটেস্টের হারও বেড়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে আমরা আবারও এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। ’ তিনি বলেন, তিন হাজার পিএসআই চাপ সহ্য করার সক্ষমতা সিলিন্ডারের আছে কি না সে বিষয়টি পাঁচ বছর পর পর পরীক্ষার নিয়ম রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। কিন্তু পরিবহন মালিকরা এ ক্ষেত্রে উদাসীন। গাড়িতে সিলিন্ডার বসানোর পর ৮-১০ বছর ধরে পুনঃপরীক্ষণ করা হয়নি এমন বহু গাড়ি রাস্তায় চলছে। এসব গাড়ি মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে বাংলাদেশে যানবাহনে সিএনজির ব্যবহার শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। পেট্রল ও ডিজেলচালিত ইঞ্জিনগুলোকে সিএনজিতে চালানোর উপযোগী করতে বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয় আরপিজিসিএল। যথাসময়ে সিলিন্ডার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য সারা দেশে আরপিজিসিএলের দুটি পরীক্ষাগারসহ মোট ১১টি পরীক্ষাগার রয়েছে। কিন্তু সিলিন্ডার পরীক্ষার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় গাড়ির মালিকদের তেমন মাথাব্যথা দেখা যায় না।

সিলিন্ডারে জোড়াতালি : দেশের একাধিক স্থানে সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে বেশ কয়েকজন হতাহতের পর সিলিন্ডারের নিরাপত্তা ও এতে কারসাজি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সারা দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় তিনশ’ কেন্দ্রে পেট্রল ও ডিজেল ইঞ্জিনকে সিএনজিতে রূপান্তর করার অনুমোদন রয়েছে আরপিজিসিএলের। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে কিছু অসাধু লোক মাত্র ৪০-৫০ হাজার টাকায় যানবাহনকে সিএনজিতে রূপান্তর করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অক্সিজেন সিলিন্ডার বদলে নিয়ে বা কম দামি সিলিন্ডার, এমনকি জোড়াতালি দেওয়া সিলিন্ডারও গাড়িতে বসানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে অভিযোগ করেছেন। আরপিজিসিএলের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা সিলিন্ডারগুলো উচ্চ তাপমাত্রা ও হাইড্রোলিক চাপ সহনীয় করে তৈরি করা হয়। সেখানে জোড়া থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্ঘটনার শিকার সিলিন্ডারে জোড়া দেওয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। সিলিন্ডার কেনার সময় ক্রেতাদের এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া উচিত। আরপিজিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪-১৫ সালে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে ৫৮টি। এর আগের বছর বিস্ফোরণ হয়েছে ৫০টি সিলিন্ডার। সোয়া দুই বছরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন অসংখ্য। সবচেয়ে উদ্বেগ-আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক ডিজেলচালিত বাস-ট্রাক সিএনজিতে কনভার্ট করা হয়েছে। এসব বাস-ট্রাকে দুই থেকে ছয়টি পর্যন্ত সিলিন্ডার সংযোজিত হয়েছে। একাধিক সিলিন্ডারের কারণে এসব গাড়ির নিরাপত্তাঝুঁকিও বেশি।

 

up-arrow