Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:২৯
হাত বাড়ালেই ইয়াবা সিলেটে
গোটা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ১৫ জন, জড়িত পুলিশ প্রশাসনও
জিন্নাতুন নূর, সিলেট থেকে ফিরে
হাত বাড়ালেই ইয়াবা সিলেটে
সম্প্রতি এক মাদক ব্যবসায়ীর বাসায় অভিযান চালিয়ে রহস্যময় আস্তানা খুঁজে পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আরেক ব্যবসায়ীর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা (ইনসেটে)

গোটা সিলেট এখন ভয়াবহ মাদক ইয়াবায় ভাসছে। সিলেট ও এর আশপাশের জেলা-উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়েছে।

চাইলেই হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা। মূলত প্রবাসীদের ছেলেমেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরাই এখানে ইয়াবার মূল ক্রেতা। বাসায় হোম ডেলিভারির পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে হোটেলেও ডেলিভারি করা হচ্ছে ইয়াবা। সিলেটে মাঠপর্যায়ে ইয়াবা নিয়ে কাজ করছেন এমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সিলেটে এখন ১৪ থেকে ১৫ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী গোটা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই ডিলাররা পাইকারি হারে ইয়াবা বিক্রি করেন। টেকনাফ থেকে প্রথমে চট্টগ্রামে, তারপর চট্টগ্রাম হয়ে সিলেটে ইয়াবার চালান আসে। ডিলাররা দিনে কমপক্ষে ২০ হাজারের বেশি পিস ইয়াবা বিক্রি করছেন, যার আর্থিক মূল্য এক কোটি টাকার বেশি। আর সপ্তাহে একেকজন ইয়াবা ব্যবসায়ী ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ইয়াবা আনছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইয়াবার গডফাদাররা একটি চালানে ১৫ থেকে ২০ হাজার পিস ইয়াবা আনছেন।

সিলেট শহরের বাইরে, আশপাশে ও সীমান্তবর্তী এলাকায়—যেমন কোম্পানিগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারেও ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তৎপর। আর সিলেট শহরে কাষ্টগড় ও দক্ষিণ সুরমা এলাকাকে কেন্দ্র করে চলছে ইয়াবার মূল ব্যবসা।

শুধু পুুরুষ নয়, নারী ব্যবসায়ীরাও সিলেটে সমান তালে ইয়াবা বিক্রি করছেন। এদের কেউ কেউ স্বামীর ব্যবসা দেখভাল করেন। আবার কোনো ব্যবসায়ীর শ্বশুরবাড়ির লোকজনও এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আগে যারা সিলেটে হেরোইনের ব্যবসা করতেন তারাই এখন চাহিদা থাকায় ইয়াবার ব্যবসা করছেন। জানা যায়, সোর্স থেকে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ তালিকায় এসআই, ওসি, ডিবির ইন্সপেক্টর ও পুলিশফাঁড়ির ইনচার্জ পর্যায়ের লোকও আছেন। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তা এবং সিলেটের মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোর কিছু লোকও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। সূত্র জানায়, সিলেটে জেলখানার মধ্যেও ইয়াবা সরবরাহ করা হচ্ছে। আর কারাগারের কিছু কর্মচারী কারাগারে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তারা আসামি ও মাদকাসক্তদের কাছে এগুলো বিক্রি করেন। একজন পাইকার একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে এলেও খুচরা ব্যবসায়ীরা ডিলারদের কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে এখন ঘরে ঘরে হোম ডেলিভারি সার্ভিস দিচ্ছেন। এমনকি মোবাইলে যোগাযোগ করে হোটেলেও ইয়াবার ডেলিভারি সার্ভিস চালু করেছেন তারা। সাধারণত চট্টগ্রাম থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিলেটে ইয়াবার চালান আনা হয়। এ ছাড়া মহিলাদের গর্ভবতী সাজিয়ে পেটে করেও ইয়াবা আনা হয়। ছোট বাচ্চাদের দামি খেলনা, মিষ্টির বাক্স, প্রাইভেট গাড়ির নিচে গোপন বাক্স তৈরি করে ইয়াবা আনা হচ্ছে সিলেটে। বড় মাইক্রো ভাড়া করেও ইয়াবার চালান আসছে এখানে। সিলেটের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ এ মাদক বিক্রি করে সবাই এখন কোটিপতি। তাদের আছে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি। আছে দুইয়ের অধিক বিলাসবহুল গাড়িও। এই ব্যবসায়ীরা টাকার জোরে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ম্যানেজ করে চলছেন। ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে। এর ফলে সুযোগমতো এক ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসায়ীকে পুলিশের কাছে ধরিয়েও দিচ্ছেন। সিলেটে যারা ইয়াবা ব্যবসা করে বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন তারা হলেন আহমেদপুরের শহীদ, শহীদের স্ত্রী বুলু, শহীদ ও বুলুর ম্যানেজার মোবারক, ধরাধরপুরের রুহেল, ভার্তকলা এলাকার শাহীন, দক্ষিণ সুরমার সাবিহা, একই এলাকার নাছিমা, রেবা, রহিম, চান্দের বাড়ির রাবিয়া, শিববাড়ীর আশিক, বদিকোনার আলম ড্রাইভার, বলদি গ্রামের এনাম এবং শহীদের সেকেন্ড ইন কমান্ড আনোয়ার। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে শহীদ ও বুলু সিলেট শহরের পুরান রেলস্টেশনের ভিতরে ব্যবসা করেন। এ এলাকায় বিকাল থেকেই জমে ওঠে ইয়াবা বিক্রি। ইয়াবা ব্যবসায়ীরা নিজেদের আস্তানায় টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে যান। আর তাদের আস্তানা ঘিরে বেড়ে যায় ইয়াবাসেবীদের আনাগোনা। শহীদের শ্বশুর আকাশ। টাঙ্গাইলের বাসিন্দা হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ইয়াবা বিক্রির অপরাধে বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। বড়ইকান্দি এলাকায় আকাশের তিনতলা বিলাসবহুল বাড়ি আছে। তার জামাতা শহীদেরও আহমেদপুরে আছে বিলাসবহুল বাড়ি। শাহীনের বিলাসবহুল বাড়ি আছে ভার্তকলায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় যাতে পালিয়ে যাওয়া যায় এ জন্য শাহীন তার বাড়ির আধা কিলোমিটার দূরে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছেন। সম্প্রতি শাহীনের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালালে তিনি সিসি ক্যামেরায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশ শাহীনের বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে নগদ টাকা ও কয়েকশ ইয়াবা উদ্ধার করে। শাহীন তার বিলাসবহুল বাড়ি সব সময় বিয়েবাড়ির মতো রঙিন বাতি দিয়ে সাজিয়ে রাখেন। স্থানীয়রা জানান, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতেই শাহীন এমনটা করেন। এ ছাড়া জিন্দাবাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন আশিক ও রমজান। আর শাহেদ ওরফে সোর্স শাহেদ, আলী ওরফে চোরা আলী শেহঘাট ঘাসিটোলা এলাকায় ইয়াবার ব্যবসা চালাচ্ছেন। সিলেটের ছাতকের ফকিরটিলার আরেক ইয়াবা ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম মিন্টু। পেশায় আগে সাপুড়ে হলেও এখন তিনি ইয়াবা ব্যবসা করেন। আরেক ইয়াবা ব্যবসায়ী লায়েক। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার নামে বেশ কয়েকটি ছিনতাই মামলাও আছে। ধরাধরপুরের রুহেলের ব্যবসা শাহী ঈদগাহ, মেজরটিলা, মদিনা মার্কেটে। এ ছাড়া মাসুক মার্কেট, সুরমা মার্কেট, হজরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাধাঘাট ইত্যাদি এলাকাতেও তার ব্যবসা আছে।

জড়িত পুলিশ প্রশাসনও : সিলেট ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কোতোয়ালি থানাধীন বন্দর ফাঁড়ির এসআই ফয়েজ কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন সিলেট এলাকায়। ফলে তার যথেষ্ট প্রভাব এখানে। তিনি হাত মিলিয়েছেন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। এ ছাড়া লামাবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নজরুল ও দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি শাহ হারুনুর রশিদও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের ব্যবসায় সাহায্য করছেন বলে অভিযোগ আছে। এসআই ফয়েজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তারা আমার সম্পর্কে জানেনই না। ইয়াবা নিয়ে কাজ করার জন্য কিছু মানুষের ক্ষতি হওয়ায় তারা শত্রুতাবশত আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনছেন। ’ সিলেটের পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সিলেটে পুলিশের কোনো সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কি না তা বলতে পারছি না। তবে এ ব্যাপারে পুলিশের সদস্যদের আমি জিরো টলারেন্স নীতি অনুশীলন করতে বলেছি। কোনো পুলিশ সদস্য যদি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির এক ইন্সপেক্টর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, পুলিশের বেশ কিছু কর্মকর্তা একজন ইয়াবা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়মিত চাঁদা নিচ্ছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মোবাইল ট্র্যাক করলেই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।

up-arrow