Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩১
ধ্বংস হচ্ছে সিলেটের সাদা সোনা
উৎপাদন আশঙ্কাজনক কমেছে নেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
জিন্নাতুন নূর, শ্রীমঙ্গল থেকে ফিরে
ধ্বংস হচ্ছে সিলেটের সাদা সোনা

বাংলাদেশে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে রাবার প্রয়োজন হয়। আর এই হিসাবে দেশে রাবারের যথেষ্ট চাহিদা থাকার কথা।

আশির দশকে রাবারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করেই একে ‘সাদা সোনা’ নামে অভিহিত করা হয়। এমনকি রাবারের চাহিদা ও জোগানের সমতা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কারণে রাবার চাষ বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। অথচ রাবারশিল্প নিয়ে সরকারের উদাসীনতা, পুরনো চাষ পদ্ধতি এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের কারণে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো সিলেটের রাবারশিল্পও ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রাবার রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রাবার রপ্তানি করা হচ্ছে। অথচ সিলেটের চারটি বাগানে এখন যেসব রাবার গাছ আছে তার অধিকাংশেরই আয়ুষ্কাল ফুরিয়েছে। সরকার বিদেশ থেকে উন্নত প্রজাতির রাবার গাছ আমদানিতে যেমন অনাগ্রহী, তেমনি বন বিভাগও নতুন রাবারবাগানের জন্য জমি দিতে রাজি নয়। গুরুত্বপূর্ণ এ খাত নিয়ে নেই আলাদা গবেষণা প্রতিষ্ঠানও। এ অবস্থায় দেশের ‘সাদা সোনা’র ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাবার বিভাগের কর্মকর্তা ও বেসরকারি রাবারবাগানের মালিকরা। চট্টগ্রাম, সিলেট ও টাঙ্গাইলে মোট ১৭টি রাবারবাগান আছে। এর মধ্যে সিলেটে ৮ হাজার ৪৪২.২২ একর জমিতে মোট ৪টি রাবারবাগান আছে। এগুলো হলো ভাটেরা, সাতগাঁও, শাহজী বাজার ও রূপাইছড়া রাবারবাগান। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও রাবারবাগানে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া গাছগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে অল্প কিছু গাছ থেকে রাবার সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের রাবার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাতগাঁও বাগানের শুরুতে মোট ১ লাখ ৫২ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। এক যুগ আগেই এ গাছগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়। এখন এই বাগানের মাত্র ৩২ হাজার গাছ থেকে রাবার উৎপাদন হচ্ছে। আবার উৎপাদনে থাকা গাছগুলোর মধ্যে কিছু গাছ থেকে বিকল্প পদ্ধতিতে রাবার উৎপাদন করা হচ্ছে। যদিও এই সময়ের মধ্যে নার্সারি থেকে নতুন গাছ উৎপাদন করেছেন সাতগাঁও রাবারবাগানের শ্রমিকরা। কিন্তু এর মান আগের গাছগুলোর মতো হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। উৎপাদনে থাকা গাছ থেকে এখন মোট ২ হাজার ৮০৫ কেজি রাবার পাওয়া যাচ্ছে; যার বাজারমূল্য ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। জানা যায়, বন বিভাগের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে প্রথম সাতগাঁও রাবারবাগানে রাবার গাছ লাগানো হয়। পরে তা বাংলাদেশ

বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আশির দশকে এডিবির ঋণে মালয়েশিয়া থেকে রাবার গাছের চারা এনে লাগানো হয়। সাধারণত এসব গাছের মেয়াদ ৭ থেকে ২৫ বছর। তবে গাছগুলো থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত রাবার উৎপাদন সম্ভব হয়। মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ যে রাবার চারা আমদানি করে তা ছিল আরআরআইএস-৬০০ প্রজাতির। অথচ বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আরও উন্নত আরআরআইএস-৩৪০০ প্রজাতির চারা লাগানো হচ্ছে। আর বাংলাদেশে লাগানো এই প্রজাতির গাছগুলো থেকে অন্তত সাত গুণ বেশি রাবার উৎপাদন সম্ভব। সরকার চাইলে বাংলাদেশেও উন্নত প্রজাতির গাছ আমদানি করে আরও বেশি রাবার উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যয়বহুল হওয়ায় এ ব্যাপারে সরকারের তেমন আগ্রহ নেই। সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আলাদা রাবার গবেষণা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা হয়নি। এ ছাড়া নতুন বাগান করার ব্যাপারেও বন বিভাগ কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। নতুন বাগানের জন্য বন বিভাগের কাছে জমি চাইলেও রাবার বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে বন বিভাগ এ ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। অথচ দেশে উৎপন্ন রাবার দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরেও রপ্তানি করা সম্ভব। বর্তমানে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে পাশের দেশ ভারতে রাবার রপ্তানি করা হচ্ছে। আর এর মাধ্যমে বছরে কয়েক লাখ মার্কিন ডলার আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এমনকি চাহিদার কারণে ভারতে রাবার পাচার হচ্ছে আর এর বিনিময়ে বাংলাদেশে আসছে ফেনসিডিল। উল্লেখ্য, রাবার দিয়ে গাড়ির টায়ার, টিউব, জুতার সোল, ফোম, রেক্সিন, হোসপাইপ, গাম, খেলনা এবং কারখানার পণ্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে।

এমনকি সরকারি এই বিভাগে আছে জনবলস্বল্পতাও। সাতগাঁও রাবারবাগানটিতে ২০৭ জন কর্মকর্ত-কর্মচারীর প্রয়োজন হলেও বর্তমানে এখানে আছেন মাত্র ১০৮ জন। এ ছাড়া শ্রমিকদের বেতনের ২০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। দীর্ঘদিন কাজ করে এই বাগানের মোট ১৭০ জন শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৪০ জন নিবন্ধিত বা চাকরিতে নিয়মিত হয়েছেন। বাকিরা এখনো চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করছেন। এ বাগানের শ্রমিক অজিৎ ব্যানার্জি বলেন, ‘১৩-১৪ বছর ধরে আমি এ বাগানে অনিশ্চয়তা নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু কবে নিয়মিত হব তা জানি না। ’ সাতগাঁও রাবার শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আরজদ আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শ্রমিকরা মহার্ঘ্য ভাতা ঘোষণার পর থেকেই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এর ফলে তারা নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ’ তবে সম্ভবনার এ খাতকে নতুন করে সাজাতে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিলেট রাবার বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মো. জামিল আক্তার বাকল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আয়ুষ্কাল হারানো গাছগুলোর কাঠ আহরণের জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে রাবার কাট প্রেসার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বানানো হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে আগামী মার্চ-এপ্রিলেই এটি চালু হবে। এ ছাড়া জীবনচক্র হারানো গাছগুলোয় রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগে এর ভঙ্গুরতা বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। আগে এ গাছগুলো থেকে যে কাঠ পাওয়া যেত তা জ্বালানি হিসেবে ৩০ টাকা সিএফটিএতে বিক্রি করা হতো। কিন্তু ভঙ্গুরতা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ায় এ গাছগুলোর কাঠ এখন ১২০০ থেকে ১৬০০ সিএফটিএতে বিক্রি করা যাবে। ’ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন সূত্র বলছে, দেশে রাবারশিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। বর্তমানে দেশে রাবারের চাহিদা আছে ২৫ হাজার টন। আর দেশে উৎপাদন হয় ২০ হাজর টনের বেশি। দেশ থেকে রপ্তানি হচ্ছে ৯ হাজার ৫০০ টন রাবার। আর প্রতি বছর এ চাহিদা বাড়ে ৩ শতাংশ হারে। দেশে উৎপাদিত রাবারের ৬০ শতাংশ দেশি উদ্যোক্তারা কিনছেন, বাকি ৪০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে সরকারি রাবারবাগানের তুলনায় সিলেটের ব্যক্তিমালিকানাধীন রাবারবাগানগুলোর অবস্থা আরও করুণ। টানা কয়েক বছর লাভের মুখ না দেখায় ব্যক্তিমালিকানাধীন রাবারবাগানগুলা একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিল্পপণ্য হিসেবে রাবারের জন্য বাজারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। আর আমদানিকৃত রাবারের তুলনায় দেশি রাবারের করহার বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারাও কম দামে বিদেশি রাবার কিনতে আগ্রহী। পাঁচ বছর আগেও বেসরকারি বাগান মালিকরা যেখানে প্রতি কেজি রাবার ২৮০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি করতেন বর্তমানে তা ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর রাবার উৎপাদনের পর তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রির উপযোগী করতে খরচ হয় প্রায় ১৬০ টাকা। সব মিলিয়ে লোকসান সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বেসরকারি বাগানের মালিকরা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow