Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৪০
নাজিমুদ্দিন রোডে এখন ‘গলা কাটা’ বাণিজ্য বন্ধ
জেলখানা কেরানীগঞ্জে
মাহবুব মমতাজী

পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের পরই অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের ‘গলা কাটা’ সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে। তারা বন্দীদের স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিসের দাম নিতেন তিন গুণ।

দেখা করার সময় ব্যাগ ও মোবাইল ফোন সেট রাখা বাবদও নিতেন টাকা। কোনো কোনো সময় ব্যাগ ও মোবাইল ফোন সেট গায়েব করে দেওয়া হতো। এমন অসংখ্য ঘটনার এখন সাক্ষী হয়ে থাকবে ওই স্থানটি।

সুনসান পরিবেশ ফিরে এসেছে ওই এলাকাটিতে। বাসিন্দারা বলছেন, ‘আমরা এখন অনেকটা শান্তিতে আছি। নেই কোনো কোলাহল আর যানজট। ধীরে ধীরে আমরা এক নিরিবিলি বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরে পাব। ’ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার গত বছর ২৯ জুলাই কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে নিয়ে যাওয়ায় হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, চানখাঁর পুল থেকে মৌলভীবাজার এবং চকবাজারের রাস্তাটিতে রিকশা-ভ্যান চলাচল করলেও নেই আগের সেই জট।

অনেকটা শীতল আশপাশের পরিবেশ। আগের মতোই আছে কারাগারের ফটকটি। ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ স্লোগানের একটু নিচে ডিজিটাল ঘড়িটি তার সময় গণনা করেই চলেছে। পরিত্যক্ত হয়ে আছে অনুসন্ধান কক্ষ। বন্দী স্বজনদের নাম ধরে ডাকার সেই মাইকটি আছে ঠিক আগের জায়গাই। বন্ধ হয়ে আছে কারা বেকারিটি। ফটকের ভিতর থেকে তালা দিয়ে প্রতিদিন একজন করে কারারক্ষী পাহারার কাজে থাকেন। সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ আপাতত নিষেধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাঁধন নামের এক কারারক্ষী। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, নতুন কারাগারে ৮০০ জন নানাভাবে নিয়োজিত আছেন। আর এখানে আছেন ৩০০ জন। এরা আইজি প্রিজন, অতিরিক্ত আইজি ও ডিআইজিদের বাঙলোর বিভিন্ন কাজ করে দেন। এ ছাড়া অসুস্থ বন্দীদের মধ্যে যারা ঢাকা মেডিকেল, পঙ্গু ও মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি থাকেন তাদের পাহারার জন্য এখান থেকেই কারারক্ষীদের নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আপাতত পুরাতন এ কারাগারটি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে রেখেছে। যখন জাদুঘর করে চালু করা হবে, তখন সবার জন্য ঘোষণা দিয়েই উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। যখন এখানে বন্দীরা ছিল তখনকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কারা ফটকের বিপরীতে থাকা হোসাইন নামের এক দোকানদার জানান, ‘তিনি দুই বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছেন। সে সময়ের পরিবেশ খুব খারাপ আর করুণ ছিল। আর এখন আমরা অনেক শান্তিতে আছি। কারাগারটি কেরানীগঞ্জে চলে যাওয়ার পরদিনই এর আশাপাশে গজিয়ে ওঠা দোকানপাটও উঠে গেছে। কিন্তু মার্কেটের দোকানগুলোতে আগের মতোই ব্যবসা চলছে। উঠে যাওয়া দোকানগুলোতে এক কাপ চায়ের দাম বন্দীদের স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হতো ১০-১৫ টাকা। অন্যান্য জিনিসের বেলায় তো কথাই বলা যেত না। প্রতিটি দোকানে সাক্ষাতে আসা লোকজনদের ব্যাগ-মোবাইল ফোন রাখা বাবদ ৩০-৪০ টাকা করে নেওয়া হতো। কেউ কেউ আবার সেগুলো হজম করে ফেলতেন। যাদের খোয়া যেত তাদেরও বলার কিছু থাকত না, কারণ তারা তো এমনিতেই অসহায় অবস্থায় থাকতেন। ’ সুলেমান নামের আরেক দোকানি বলেন, ‘এখন কত সুন্দর ছিমছাম। সে সময় যে কোনো সুস্থ মানুষ কারা ফটকে এলে অসুস্থ হয়ে যেতেন। কষ্টের আর বেদনার অসংখ্য চিত্র আমাদের সামনে পড়েছে। বন্দী আত্মীয়স্বজনের পর অনেকেরই আহাজারি চলেছে নাজিমুদ্দিনের তিন রাস্তার মোড়ে। যখন কাউকে ফাঁসি দেওয়ার তারিখ ঘোষণা হতো, তিন দিন ধরে আমরা দোকানপাট খুলতাম না। কারণ ওই সময় এক ধরনের ভয় মনের মধ্যে কাজ করত। আবার আইনশৃঙ্খলা এবং গোয়েন্দা বাহিনীর নানা প্রশ্নের ঝামেলায় পড়তে হতো। আর ফাঁসির দিনের পরিবেশ থাকত বেশ থমথমে। ’ ওই এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া নামে এক স্কুলছাত্রী জানায়, ‘এখানকার কারাগার যখন চালু ছিল তখন আমাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করত। মনে হতো কখন জানি আমাদের কাউকে ভিতরে নিয়ে নেয়। আর ভিতরে নেওয়া মানে আর কখনো বের হতে পারব না, এমন মনে হতো। দিনের বেলায় চলাফেরায় অনেক বিরক্ত লাগত। আর এখনকার অনুভূতি অন্যরকম, যা বলে বোঝানো যাবে না। ’ পুরান কারাগার সম্পর্কে অতিরিক্ত আইজি প্রিজন ইকবাল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জাদুঘর হিসেবে কখন খুলে দেওয়া হবে তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আমাদের নেই। তবে জাদুঘর গড়ার কাজ চলছে। ’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow