Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৪৮
খালেদা শহীদদের সঙ্গে বেইমানি করেছেন
একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
খালেদা শহীদদের সঙ্গে বেইমানি করেছেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। কিছুদিন আগে তারা একটি বই প্রকাশ করে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করেছে।

আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। বাঙালি জাতির বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মহান অর্জনগুলো ভবিষ্যতে কেউ যেন নস্যাৎ করতে না পারে সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। গতকাল সকালে একুশে পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের একুশে পদক বিজয়ী ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে পদক তুলে দেন। ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা (সংগীত, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, নাটক ও নৃত্য), সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজসেবা, ভাষা ও সাহিত্যে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে একটি সনদপত্র, স্বর্ণপদক এবং দুই লাখ টাকার চেক প্রত্যেকের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে পাকিস্তানের জনৈক জুনায়েদ আহমেদের বই প্রকাশ এবং সেই বই বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানোর ধৃষ্টতার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন আগে একটি বই বের করে তাতে উল্লেখ করেছে, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা শুরু করেছিল যাতে এদেশীয় আলবদর, আল শামস, রাজাকাররা যোগ দিয়েছিল সেসব গণহত্যার ছবিতে মিথ্যা ক্যাপশন এঁটে দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে এসব হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি বাহিনীর নয়, মুক্তিযোদ্ধারা সংঘটন করেছে বলে তারা তা প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আমরা স্বাধীন দেশ। অর্থনৈতিকভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ এখন একটি উন্নয়নের রোল মডেল। সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এখন যে অপপ্রচার তারা (পাকিস্তানি গোষ্ঠী) করে যাচ্ছে তা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই ২৫ মার্চকে আমাদের গণহত্যা দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এর স্বীকৃতির জন্য আমাদের প্রচার চালাতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা, আমি নাম ধরেই বলতে চাই- বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কিছুদিন আগে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়নি। তার এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে পাকিস্তানের এ ধরনের অপপ্রচারের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা আমাদের খুঁজে দেখতে হবে। তারা উভয়েই একই সুরে কথা বলেছেন। এ যেন শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি এবং শহীদদের অবমাননা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। ’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাঙালি জাতির যখন যা কিছু অর্জন তা অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে, সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের অর্জন করতে হয়েছে। কাজেই সেই অর্জনকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। ’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেন খান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম পদক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের সাইটেশন পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, বিচারপতিবৃন্দ সংসদ সদস্যবৃন্দ, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ, পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী একুশে পদক বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, যে মহান ভাষা শহীদরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে একুশের সংগ্রামী ইতিহাস রচনা করেছেন, তাদের ত্যাগের দিকে লক্ষ্য রেখে আপনাদের মেধাকে দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও সার্বিক বিকাশের কাজে লাগানোর বিনীত আহ্বান জানাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা, মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা। একুশ মানে বাংলা, বাঙালি এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও নিরন্তর ভালোবাসা। ’ বিজয়ী জাতি হিসেবে কারও কাছে মাথা নত করে চলব না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামী ইতিহাসে অমর একুশে এক উজ্জ্বল এবং মহান সংযোজন। একুশের পথ বেয়েই আমরা পৌঁছেছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মোহনায়। প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর তার সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রদানের বৃত্তান্তও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাঙালির একুশ আজ পরিণত হয় সারা পৃথিবী মানুষের মাতৃভাষা দিবসে। দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার সুরক্ষা বিধানে ভূমিকা রাখার দায়িত্বও এখন আমাদের ওপর অর্পিত। সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা পৃথিবীর সব ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে গবেষণা এবং সংরক্ষণ এবং চর্চার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। ’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে নিয়ে এই ইনস্টিটিউট নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও ২০০১ সাল-পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচির মতো এরও নির্মাণ বন্ধ করে দিয়েছিল। বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা ঘোষণার জন্য তার সরকারের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদান করে বিশ্ব দরবারে এ ভাষার গৌরব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সরকার প্রধানের দায়িত্ব লাভ করে আমি নিজেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিয়মিত বাংলায় ভাষণ দিয়ে আসছি। ’

একুশে পদক পেলেন যারা : ভাষাসৈনিক অধ্যাপক ড. শরিফা খাতুন, ভাষা ও সাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়া ও কবি ওমর আলী (মরণোত্তর)। শিল্পকলায় (সংগীত) সুষমা দাস, জুলহাস উদ্দিন আহমেদ, ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম ও রহমতউল্লাহ আল মাহমুদ সেলিম। শিল্পকলায় (চলচ্চিত্র) তানভীর মোকাম্মেল, শিল্পকলায় (ভাস্কর্য) সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, শিল্পকলায় (নাটক) সারা যাকের, শিল্পকলায় (নৃত্য) শামীম আরা নীপা। সাংবাদিকতায় আবুল মোমেন ও স্বদেশ রায়, গবেষণায় সৈয়দ আকরম হোসেন, শিক্ষায় প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সমাজসেবায় অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালের একুশে পদকের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করে। পদক বিজয়ী প্রত্যেকে পেয়েছেন ১৮ ক্যারেট মানের ৩৫ গ্রাম সোনার একটি পদক এবং দুই লাখ টাকা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow