Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৪২
অভিযোগ বিশ্বব্যাংক মিশন প্রধানের বিরুদ্ধে
রুহুল আমিন রাসেল
অভিযোগ বিশ্বব্যাংক মিশন প্রধানের বিরুদ্ধে

আমদানি করা ১৬টি গাড়িতে শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার করায় ঢাকাস্থ বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি বা মিশনপ্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

এই সংস্থা বিশ্বব্যাংক মিশনপ্রধানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছে, বিশ্বব্যাংক সুশাসনের কথা বললেও তাদের কর্মকর্তারা আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।

বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা গাড়ি স্থানীয় লোকদের কাছে বিক্রি করেছেন। তার প্রমাণও আছে।

এ প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহারের অপরাধও দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। এর দায়দায়িত্ব বিশ্বব্যাংকের মিশনপ্রধান হিসেবে সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি বা কান্ট্রি ডিরেক্টরের ওপর পড়ে। এজন্য শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার করায় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের ১৬ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নামে বিভিন্ন সময়ে বরাদ্দ হওয়া ১৬টি গাড়িসহ পাসবুক তলব করে। এ গাড়িগুলো কোথায় আছে তা বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধির কাছে জানতে চেয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি পত্র দেয় শুল্ক গোয়েন্দা। ২০ ফেব্রুয়ারি দুটি এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি গাড়ি শুল্ক গোয়েন্দার কাছে হস্তান্তর করে বিশ্বব্যাংক। বাকি ১৩টি গাড়ি এখনো বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের কাছে আছে বলে জানা গেছে।

ওই ১৬টি গাড়ি ব্যবহারকারী বিশ্বব্যাংকের ১৬ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেন পারমিতা দাশগুপ্ত, শুকুন্তলা আকমিজানা, কাথুয়নেল খু, ভিনায়া সওরোপ, ওউসমানে সেকল, জোসি এডগাডো লোডজকামোডস, মিরাভ তুলিয়া, ডায়িড, ঘরিনা ইগোরকিনা, মৃদুলা সিংহ, তাহসেন সৈয়দ খান, মায়ুমি ইসোঘান, তানিয়া মানা ডি মিরাচেনকো, কেরেন ওজার, ফাবিও পিটালুগা ও হেলেন জয় ক্রাইগ। বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধিকে ১৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া পত্রে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ বলেছে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিরা ও দাতা সংস্থাগুলো শুল্কমুক্ত গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শুল্ক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একটি পাসবুক নিতে হয়। এই সুবিধার আলোকে বিশ্বব্যাংকের ১৬টি গাড়ি চার থেকে পাঁচ বছর বা আরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশে আসে। এগুলো ব্যবহূত হয়েছে। কিন্তু এই গাড়িগুলো কোথায় আছে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য বিশ্বব্যাংক দেয়নি। গাড়িগুলো আনার বিষয়ে এন্ট্রি আছে। তবে হস্তান্তরের বিষয়ে তথ্য নেই। এটি শুল্ক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

ওই পত্রে আরও বলা হয় : এই ১৬টি গাড়ি সম্পর্কে জানাতে একটি নোটিস দিয়ে জানা গেছে, যারা গাড়িগুলো ব্যবহার করেছেন তারা দেশে নেই। ব্যবহারকারীরা কবে দেশে এসেছিলেন এবং কবে দেশ ত্যাগ করেছেন, এসব তথ্যও চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবহারকারীরা তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে গাড়ি বিক্রি করে চলে গেছেন। এটা হয়ে থাকলে বিশ্বব্যাংক মিশনপ্রধানের এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। ব্যবহারকারীরা বিক্রি করে সুবিধা নিলে তাদের বিরুদ্ধে শুল্ক আইন, ১৯৬৯ ও মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চীনা নাগরিক কিমিও ফান। তিনি ২০১৬ সালের ৬ মার্চ থেকে মিশনপ্রধানের দায়িত্বে আছেন। তার আগে ২০১৩ সালের ৮ মার্চ থেকে মিশনপ্রধান ছিলেন ডাচ্ নাগরিক ইফোহানেস। তার আগে ঢাকায় মিশনপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন অ্যালেন গোল্পস্টাইন। তাদের সময়ই আমদানি করা ১৬ গাড়িতে শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দার তথ্যমতে, শুল্ক গোয়েন্দার কাছে তিনটি গাড়ি হস্তান্তরকারী তিন কর্মকর্তা হলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তা নিহাল ফার্নান্দো। তিনি সিনিয়র রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত ব্যবহারের উদ্দেশ্যে গাড়িটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় কেনেন। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরেই স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন নিহাল। তার (কাস্টমস পাসবুক নম্বর ৫০/০৮) ব্যবহূত গাড়ি ২০০৬ সালের টয়োটা এলিয়ন মডেলের। বাংলাদেশ ত্যাগের আগে আইনানুযায়ী কাস্টমস পাসবুক ও গাড়িটি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে যাননি নিহাল। এতে শুল্ক আইন ভঙ্গ হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া গাড়ি দুটির ব্যবহারকারী ছিলেন ফিনল্যান্ডের নাগরিক মিরাভ তুলিয়া ও ভারতীয় মৃদুলা সিং। তারা গাড়ি দুটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় কেনেন। তুলিয়া ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত কমিউনিকেশন্স স্পেশালিস্ট এবং মৃদুলা ২০১৩ সালের মার্চ থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট ছিলেন। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা গাড়ি আইনের আওতায় নিষ্পন্ন না করার দায়ে বিশ্বব্যাংকের সমর্পণ করা ওই তিনটি গাড়ির বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড—এনবিআরে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় : এসব গাড়ি সমর্পণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা ব্যবহূত গাড়ি তিনটিতে প্রাথমিকভাবে শুল্ক আইনে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আইন অনুসারে অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করার সাত দিন আগে ব্যবহার করা গাড়ি নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার গাড়ি স্থানীয় লোকের কাছে বিক্রি করার প্রমাণ আছে এবং এজন্য শুল্ক আইন অনুসারে এই অপরাধ নিষ্পত্তি হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধার এই অপব্যবহারের কারণে সরকারের অর্থ জড়িত রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুসারে এই অপরাধও দুর্নীতির আওতায় পড়ে। যে প্রতিষ্ঠান সুশাসনের পক্ষে কথা বলে, তাদের কর্মকর্তারা এ ধরনের আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। শুল্ক আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা গাড়ি আইনানুগ নিষ্পত্তিতে সংস্থাপ্রধান দায়ী থাকবেন। গাড়ি ব্যবহারকারীরা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও গাড়িগুলো আইনানুগ নিষ্পত্তি না করায় এই দায়দায়িত্ব সংস্থাপ্রধানের (বিশ্বব্যাংকের মিশনপ্রধান) ওপর বর্তায়। এ ক্ষেত্রে গাড়ি ব্যবহারকারী, গাড়ির ক্রেতা ও মিশনপ্রধানের ব্যাখ্যা গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয় : শুল্ক গোয়েন্দাকে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ১৬টি গাড়ি নিয়ে ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কতিপয় কর্মকর্তার কাস্টমস পাসবুক ও গাড়ি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বিশ্বব্যাংক। অনেক গাড়ির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই। বিশ্বব্যাংক শুল্ক গোয়েন্দাকে আরও জানিয়েছে, তাদের দখলে থাকা যেসব গাড়ির ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া যাবে তা শুল্ক গোয়েন্দার কাছে হস্তান্তর করা হবে।

up-arrow