Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:২৪
প্রবাসীদের সুখ-দুঃখ ১
মালয়েশিয়ায় কর্মী হয়রানি
পাসপোর্ট রিনিউ, ট্রাভেল পাস, ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও দিতে হয় ঘুষ, বিভিন্ন কারাগারে ১০ হাজার শ্রমিক আটকের অভিযোগ
মাহমুদ আজহার, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে
মালয়েশিয়ায় কর্মী হয়রানি

নয় বছর ধরে মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন যশোরের জসিম উদ্দিন বিশ্বাস। দুই বছর হলো তিনি অবৈধ হয়েছেন।

বৈধ করার কথা বলে মালয়েশিয়ান আলট্রা উইন (ইপো) কোম্পানি ১৭০০ রিংগিত কেটে নিয়েছে। কিন্তু বৈধ হতে পারেননি তিনি। এখন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশন অফিসে দৌড়ঝাঁপ করছেন। কিন্তু সেখানেও ভোগান্তি। শুধু তিনি একই নন, তার মতো ওই কোম্পানির ৩৯ জনের একই অবস্থা। পুলিশি হয়রানি এড়াতে এখন তারা কাজ বাদ দিয়ে বৈধ হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কুয়ালালামপুরে জালান সিলাং রোডের কোতায়ারায় রাজধানী রেস্টুরেন্টের মালিক বাংলাদেশি সালাউদ্দিন আহমেদ। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরেই তিনি বাংলা মার্কেটে এ ব্যবসা করছেন। সব কাগজপত্র বৈধ থাকার পরও বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ তাকে ধরে নিয়ে যায় মালয়েশিয়া পুলিশ।

মালয়েশিয়ায় তরুণ উদ্যোক্তা ওমর ফারুক। রবিবার রাতে নিজের গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে আটকায় পুলিশ। ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ সব বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ১০০ রিংগিত দিয়ে হয়রানি থেকে রেহাই মেলে তার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় বৈধ-অবৈধ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কেউই ভালো নেই। ভোগান্তির শেষ নেই বাংলাদেশিদের। দেশের এজেন্ট থেকেই শুরু হয় হয়রানি। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ও মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে পদে পদে শ্রমিকদের ওপর নেমে আসে দুর্ভোগ আর নির্যাতন। কোনো কারণে শ্রমিক আটক হলে তাদের মধ্যস্থতাকারীদের কেউই এগিয়ে আসেন না। খোঁজ নেয় না হাইকমিশনও। এদিকে মালয়েশিয়া জুড়ে এখন প্রতিদিনই চলছে পুলিশি নির্যাতন ও ধরপাকড়। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও আটক করা হচ্ছে শ্রমিকদের। অবৈধদের তো কথাই নেই। অবশ্য অনেক সময় টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে অকথ্য নির্যাতনও করা হয় বলে প্রবাসী শ্রমিকরা জানান। জানা যায়, হয়রানির শিকার শুধুই বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশিরা যেসব এলাকায় বাস করেন, ওই সব এলাকায় পুলিশ হানা দিচ্ছে। পুলিশ দেখেশুনে শুধু বাংলাদেশিদেরই হয়রানি করছে বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। মালয় কিংবা ইংরেজি ভাষা না জানা প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপরই নানা নির্যাতনের খড়গ। শুধু পুলিশি হয়রানিই নয়, মালয়েশিয়ার ক্যারিকম (ট্রাভেল পাস দেওয়া হয় এখান থেকে) ও বাংলাদেশের হাইকমিশন অফিসেও হয়রানির শিকার হন শ্রমিকরা। অবৈধ শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসার জন্য সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুনতে হয় শ্রমিকদের। সেখানে ধাতু শ্রী আমিন নামে বাংলাদেশি এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সখ্য থাকায় কেউই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোনো পাত্তা পান না বলে শ্রমিকরা জানান। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কতজন শ্রমিক কাজ করছেন বা কতজন স্টুডেন্ট ভিসায় পড়াশোনা করছেন, এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে। দূতাবাসের সংশ্লিষ্টদের কাছে গিয়েও এ নিয়ে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এর পরও শ্রমিকসহ বিভিন্ন এজেন্ট সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বৈধ-অবৈধ মিলে অন্ততপক্ষে ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন মালয়েশিয়ায়। এ ছাড়া ছাত্র-ব্যবসায়ী মিলে আরও অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি বাস করছেন মালয়েশিয়ায়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই অবৈধ। তাদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। মালয়েশিয়ান ই-গভর্নমেন্ট সার্ভিসের মাধ্যমে বৈধ হওয়ার সুযোগ থাকলেও সেখানেও বিশাল একটি অংশ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেকে আটকও হচ্ছেন।

শ্রমিক এজেন্ট সূত্রমতে, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। তাদের অনেকের ওপর অমানবিক নির্যাতনও করা হচ্ছে। অনেকে দেশে ফেরার জন্যও চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু ফিরতে গিয়ে পুলিশি হয়রানির ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে কেউই তাদের সহযোগিতা করছে না। দূতাবাসও সে অর্থে কোনো খোঁজ রাখছে না বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। কুয়ালালামপুরের জালান পাহাংয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিসে সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে শ্রমিকদের নানা ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। হাইকমিশন অফিসেও পদে পদে ঘুষ দেওয়ার কথা জানান শ্রমিকরা। পাসপোর্ট নবায়নে ব্যাংক ড্রাফট, ফরম পূরণ থেকে শুরু করে প্রতিটি কাজের জন্যই দিতে হয় ঘুষ। দুতলায় হাইকমিশন অফিসের সঙ্গে যুক্ত প্রবাসী এক রাজনৈতিক নেতার হোটেল ব্যবসা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রবাসী নেতা-কর্মীদেরও ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় সেখানে। ওই অফিসের দশম তলায় চীনা মৃতদেহ পোড়ানো হয় বলেও প্রবাসী শ্রমিকদের অভিযোগ। অবিলম্বে এ স্থান থেকে দূতাবাস সরিয়ে নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।

মালয়েশিয়া যুবলীগের সভাপতি তাজকীর আহমেদ। সেকেন্ড হোম হিসেবে দেশটিকে বেছে নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়া দূতাবাস অফিসে ভোগান্তি কম-বেশি হচ্ছে। কিন্তু আগের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো। ব্যাংক ড্রাফট করাতে দালালরা অতিরিক্ত কিছু টাকা নিচ্ছে। তবে সবচেয়ে ভোগান্তি হয় ক্যারিকম থেকে ট্রাভেল পাস আদায়ে। সেখানে সরকারি ফি ৪৬৫ টাকা। কিন্তু নেওয়া হচ্ছে ১১০০-১২০০ টাকা। প্রবাসী বাংলাদেশি ধাতু শ্রী আমিন এ অনৈতিক কাজটি করছেন। এর সঙ্গে জড়িত একটি চক্র রয়েছে। আমরা এ নিয়ে আন্দোলনও করেছি। কিন্তু প্রভাবশালী হওয়ায় আমিনের এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যায়নি। ’

মালয়েশিয়ার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,  বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকার আশায় নিজের  শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দালালের হাত ধরে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন তারা। স্বপ্নের দেশে গিয়ে অনেকেই জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। প্রতিদিনই তাড়া করছে পুলিশ। বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকায় শ্রমিকদের বড় একটি অংশই রাত কাটাচ্ছে জঙ্গলে। অনেকে চাকরি করলেও পাচ্ছেন না ন্যায্য মজুরি। রাজধানী কুয়ালালামপুর ছাড়াও  কোতাবারু,  পেনাং, জহুরবারু, ক্যামেরুন হাইল্যান্ড, ইপো, পেটালিং জায়া, শাহালমে কর্মরত রয়েছেন লাখ লাখ শ্রমিক। নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক শ্রমিক জানান, অবৈধ বলে নিয়োগকর্তাদের সব জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে তাদের। কথা বললে পুলিশের ভয় দেখিয়ে তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। বৈধ পথে মালয়েশিয়া গিয়ে ভিসার মেয়াদ না বাড়ানোয় অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক। তারা বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হয়ে বন্দী রয়েছেন মালয়েশিয়ার জেলে। এমনই একজন কুমিল্লা জেলার রিয়াদ প্রধান (পাসপোর্ট নম্বর এএফ১০৮১০৫৪)। তিন বছর তিনি কুয়ালালামপুর ও মালাক্কায় নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ভিসা নবায়ন করতে না পারায় ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে মালাক্কা থেকে গ্রেফতার করে মালয় ইমিগ্র্যান্ট পুলিশ। সরকারি ব্যবস্থায় তাকে  দেশে ফিরিয়ে আনতে ১২ ফেব্রুয়ারি ওয়েজ আরনার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেছেন রিয়াদের বড় ভাই মো. আসাদুজ্জামান। ইমিগ্রেশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যারা পুনর্নিবন্ধনে অংশ নিচ্ছেন না এবং যে কোম্পানির মালিক অবৈধ শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার ১৯৫৯/৬৩ অনুচ্ছেদের ৫৫(বি) ধারা মোতাবেক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ শ্রমিক পাওয়া গেলে মালিকপক্ষ ও কর্মচারীকে ৫০ হাজার রিংগিত জরিমানাসহ এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। অন্য আরেকটি আইনে বলা হয়েছে, কোনো মালিকপক্ষ যদি পাঁচজনের বেশি অবৈধ শ্রমিক রাখে, তাহলে পাঁচ বছরের জেল কার্যকর হবে।

মালয়েশিয়ায় চলমান ‘অবৈধ’ বিদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণ (রি-হায়ারিং) প্রকল্পে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে হয়রানির ভয়ে এখনো বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধ শ্রমিক বৈধতার জন্য আবেদন করেননি।

বাংলাদেশিরাই বাংলাদেশিদের শত্রু : একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করেন, ব্যক্তিস্বার্থ ও রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় মালয়েশিয়ার বাংলাদেশিরাই বাংলাদেশিদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। একজন আরেকজনকে অবৈধ বলে পুলিশকে ধরিয়ে দিচ্ছে। নানাভাবে হয়রানি করছে। কে অবৈধ সে তথ্য পুলিশকে ফোনে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলা মার্কেট থেকে গ্রেফতার সালাউদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে বলে তার হোটেলের শ্রমিকরা জানান।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow