মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা
দুটি ক্যাম্প পরিদর্শন

মিয়ানমার তদন্ত দলের কাছে রোহিঙ্গাদের ছয় দফা দাবি

টেকনাফ ও উখিয়া প্রতিনিধি

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে আসা মিয়ানমার সরকারের গঠিত তদন্ত দলটি গতকাল কক্সবাজারের উখিয়া বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও টেকনাফের লেদা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছে। এ সময় রোহিঙ্গারা তাদের কাছে ছয় দফা দাবি পেশ করেছে।

এই পরিদর্শনে অংশ নেন তদন্ত কমিশনের সদস্যসচিব জ্য মিন প্য, সদস্য ড. অং থুন তেথসহ ১০ সদস্যের প্রতিনিধি। সঙ্গে থাকেন টেকনাফ মডেল থানার অপারেশন ওসি মো. শফিউল আজম, এসআই জয়নালসহ নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওম) লোকজন। তারা সকালে বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং দুপুরে টেকনাফের লেদা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ দুই ক্যাম্পে মিয়ানমারের তদন্ত প্রতিনিধিরা অর্ধশতাধিক নির্যাতিত নারী ও পুরুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এই ক্যাম্পে গেলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মংডুসহ বিভিন্ন এলাকায় সে দেশের সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়া, ঘরবাড়ি হারানোসহ দমন-পীড়নের নানা ঘটনা বর্ণনা করেন। তারা তদন্ত কমিশনের কাছে ছয় দফা দাবিও পেশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ১. সেনা ও রাখাইন উগ্রবাদীদের হাতে ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল, জায়গা-জমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ২. নির্যাতনের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া। ৩. নির্যাতনের শিকার হয়ে যেসব রোহিঙ্গা দেশে-বিদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়া। ৪. রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্য দূর করা। সবাইকে সমান সুযোগ-সুবিধা ও নাগরিকত্ব সনদ প্রদান। ৫. সৃষ্ট ঘটনায় যেসব লোক মিয়ানমারের জেলে বন্দী আছেন তাদের নিঃশর্ত মুক্তি। ৬. শিক্ষিত রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া। এ সময় তদন্ত কমিশনের সামনে সেনাবাহিনীর গুলিতে ডান পা হারানো মংডু থানার গৌজুবিল এলাকার মৃত সেকান্দর আলীর ছেলে রোহিঙ্গা যুবক মুসলিম (৩০), আরেক পা হারানো একই থানার হাতিপাড়ার এজাহার মিয়ার ছেলে নছিম (৪৫), হাতে গুলিবিদ্ধ ওই থানার ছালিপাড়ার মৃত মকবুল আহমদের ছেলে আমির হোসেন (৫৫), সেনা ও রাখাইন যুবকের হাতে ধর্ষিত মংডু ছডাইনপাড়ার নুর হোসেনের স্ত্রী হাবিবা খাতুন (৩৫), তার অবিবাহিত মেয়ে হাছিনা বেগম (১৬), বোরা সিকদারপাড়া এলাকার শেখ রহমত উল্লাহর স্ত্রী লায়লা বেগম (২৫), একই থানার নাইছাপ্রু এলাকার আবুল কাশিমের অবিবাহিত মেয়ে নুর কায়দা (১৮)সহ অন্তত ২০ জন নারী-পুরুষ তাদের আত্মীয়স্বজনের খুন, গুম, ধর্ষণ হওয়া এবং শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, বিপুল সহায়সম্পদ লুট করার নানা বর্ণনা তুলে ধরেন।

অন্যদিকে তদন্ত কমিশনের সদস্যরা এসব ঘটনা শুনে মিডিয়ার সামনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা দুপুর ১২টার দিকে বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ৯ অক্টোবর থেকে অপারেশন ক্লিয়ারেন্স নামে চার মাসব্যাপী রাখাইন প্রদেশের মংডু, বুচিডং, আকিয়াবসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পাড়া, গ্রামে তাণ্ডব চালায়। এ অবস্থায় সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় ৯০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তবে মিয়ানমার সরকার বার বার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। এ ব্যাপারে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং ঘি লি ও আরাকানের জন্য গঠিত আরাকান কমিশন তথা জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশন দমন-পীড়নের ঘটনাসংবলিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে মিয়ানমারের তদন্ত কমিশন বাংলাদেশে এসেছে।

 

সর্বশেষ খবর