Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ২৩:১৫
কারিনার প্রেমে অজয় অক্ষয়
মোস্তফা কাজল
কারিনার প্রেমে অজয় অক্ষয়

কারিনা নামের ঘড়িয়ালের প্রেমে মাতোয়ারা অজয়, অক্ষয় ও নির্মল নামের তিন পুরুষ ঘড়িয়াল। কারিনা নামের এই স্ত্রী প্রজাতি ঘড়িযালের সঙ্গ পেতে নিজেদের রেষারেষি ও খুনসুটি লেগেই আছে।

এ চার ঘড়িয়াল রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানার বাসিন্দা। অতিবিপন্ন তালিকায় স্থান পাওয়া এসব ঘড়িয়ালের সময় কাটছে চিড়িয়াখানায় আনন্দঘন পরিবেশে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে মহাবিপন্ন হিসেবে এই সরীসৃপ প্রাণীটিকে গণ্য করা হচ্ছে। যদিও এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জলজ এ প্রাণীটির কালেভদ্রে দেখা মেলে। কিন্তু এত দিন জাতীয় চিড়িয়াখানায় পুরুষ ঘড়িয়ালের সংখ্যাই বেশি ছিল। ভারসাম্য রক্ষার জন্য রাজশাহী শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চিড়িয়াখানা ও কেন্দ্রীয় উদ্যান থেকে আনা হয়েছে একটি স্ত্রী ঘড়িয়াল। পরে সেটিকে একই জলাধারের প্রকোষ্ঠে অন্য তিন পুরুষ ঘড়িয়ালের সঙ্গে রাখা হয়। গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, চার ঘড়িয়ালের মধ্যে গভীর মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। স্ত্রী প্রজাতির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করছে তিন পুরুষ ঘড়িয়াল। জলজ প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরা শিকারিদের কাছে ঘড়িয়াল অত্যন্ত লোভনীয়। শিকার করতে পারলে চড়া দাম পাওয়া যায়। সাধারণত ঘড়িয়ালের চামড়া দিয়ে লেডিস ব্যাগ, মানিব্যাগ, জুতা তৈরি হয়। আর এদের তেল ও চর্বি ওষুধশিল্পে ব্যবহার করা হয়। ঘড়িয়াল দ্রুত বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে জেলেদের জালে ধরা পড়া। জেলেরা পেলেই ঘড়িয়ালদের পিটিয়ে হত্যা করে। ওদের ধারণা, এরা কুমির-জাতীয় প্রাণী ও মানুষখেকো। ঘড়িয়াল শুধু মাছ, সাপ, ব্যাঙ খায়। কালেভদ্রে জলজ পাখি খায়। ঘড়িয়াল হচ্ছে মত্স্যভুক প্রাণী। চৈত্র মাস ঘড়িয়ালের প্রজনন ঋতু। এ সময় স্ত্রী ঘড়িয়াল বালুতে ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার গর্ত করে একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ক্যাপসুল আকৃতির ধবধবে সাদা ডিমগুলো লম্বায় প্রায় ১২ সেন্টিমিটার হয়। ৬০ থেকে ৭৫ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চাগুলো লম্বায় ২৫-৩০ সেন্টিমিটার হয়। বাচ্চাদের প্রধান শত্রু বড় ঘড়িয়াল, কুমির, শিকারি পাখি, বোয়াল-জাতীয় রাক্ষুসে মাছ ইত্যাদি। বছর তিনেকের মধ্যেই প্রায় ১ দশমিক ৫৩ মিটার লম্বা হয়। চার-পাঁচ বছরে প্রজননক্ষম হয়। এরা ৫০-৬০ বছর বাঁচে। বর্তমানে ঢাকা চিড়িয়াখানায় চারটি, রাজশাহী চিড়িয়াখানায় তিনটি, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পুকুরে দুটি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক ও কক্সবাজারে একটি করে ঘড়িয়াল আছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৬ আগস্ট স্ত্রী ঘড়িয়ালটি রাজশাহী থেকে রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানায় আনা হয়। ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে একটি পুরুষ ঘড়িয়াল নেওয়া হয় রাজশাহীতে। সেখানেও দুটি স্ত্রী ঘড়িয়াল রয়েছে। জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চিড়িয়াখানা ও কেন্দ্রীয় উদ্যানের একটি স্ত্রী প্রজাতির ঘড়িয়ালকে ঢাকা চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়। ঘড়িয়ালটির বয়স প্রায় ২০ বছর। নিরীহ এক সরীসৃপ প্রাণী ঘড়িয়াল। একসময় দাপিয়ে বেড়াত পদ্মা-যমুনা অববাহিকার নদী-নালায়। মাঝে মাঝে জেলেদের জালে আটকা পড়ে। ২০০৭ সালে কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অব এনডেনজার্ড স্পেসিস (সিটস) ঘড়িয়ালকে বিশ্বের অতিবিপন্ন প্রাণী হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করে। ঘড়িয়াল নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চিড়িয়াখানাসূত্র জানান, কয়েক বছরে বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকটি ঘড়িয়াল উদ্ধার করা হয়। ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপকরা পদ্মার চরে একটি বাচ্চা ঘড়িয়ালের সন্ধান পান। পরে সেটিকে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে অবমুক্ত করা হয়। ২০০৯ সালে পদ্মায় জেলেদের জালে আটকা পড়ে আরও একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা। সেটিকে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রাখা হয়। পরে সেটি মারা যায়। ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পাচারকালে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় এক হাজার কচ্ছপের সঙ্গে একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চাও উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ৩১ অক্টোবর মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরুয়া ইউনিয়নসংলগ্ন পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে আটকা পড়ে একটি বাচ্চা ঘড়িয়াল। পরদিন ঘড়িয়ালটিকে আবার পদ্মাতেই অবমুক্ত করা হয়। ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীতে ধরা পড়ে একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের আম্বারিয়া চরের পদ্মা নদীতে ওরাকান্দা গ্রামের আমজাদ হোসেনের জালে আটকা পড়ে দুই বছর বয়সী একটি ঘড়িয়াল। ২০১৩ সালের ৩০ মে রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে উদ্ধার করা ঘড়িয়ালছানাটি আবার পদ্মায়ই অবমুক্ত করা হয়। এদিকে দেশে ঘড়িয়াল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই ঘড়িয়ালের ওপর অত্যাচার করে কিছু মানুষ। তারা নানাভাবে ঘড়িয়াল শিকার করে ডিম ছিনিয়ে নিয়ে ওদের বংশ বিস্তার রোধ করে দিয়েছে।

up-arrow