Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২৩:১৮
এমপি হয়েই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ
লুত্ফুন নেছার হলফনামায় দেওয়া সম্পদের তালিকার সঙ্গে বাস্তবে মিল নেই
গোলাম রাব্বানী ও রুহুল আমিন রাসেল
এমপি হয়েই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ
লুত্ফুন নেছা----লতান মৃধা

অষ্টম শ্রেণি পাস লুত্ফুন নেছা, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তার স্বামী সুলতান আহমেদ মৃধা ও ছেলে-মেয়ের নামেও রয়েছে সম্পদের পাহাড়। বর্তমানে তারা নিজেদের ‘ধনাঢ্য পরিবার’ বলে দাবি করলেও নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। এসব সম্পদের তেমন কোনো তথ্য নির্বাচনী হলফনামায় দেননি এই এমপি। তিনি তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মাত্র ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৪ টাকা। নিজের ও স্বামীর নামে নগদ টাকা দেখানো হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই এমপির নামে জমা দেখানো হয় মাত্র ৩৮ হাজার টাকা। আর এমপি হওয়ার চার বছরের মাথায় পাল্টে গেছে সম্পদের চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, পটুয়াখালীর আলোচিত দখলবাজ হচ্ছেন সুলতান আহমেদ মৃধা। তিনি সংরক্ষিত এমপি লুত্ফুন নেছার স্বামী। সুলতান মৃধা তার স্ত্রী-পুত্র, কন্যা-জামাতা ও নিজের নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন পাহাড়সম সম্পদ।

আর এ সম্পদ তিনি করেছেন দখল করে—এমনটাই জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, সংখ্যালঘু পরিবার, সরকারি খাসজমি জবরদখল ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে জোর করে নিজেদের নামে লিখে নিয়েছেন তিনি অনেক জমি। তার এ লালসা থেকে রেহাই পায়নি নিজ বংশের লোকজনও।

হলফনামায় দেখানো সম্পদ : ইসিতে জমা দেওয়া হলফনামায় দেখা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি লুত্ফুন নেছা হলফনামায় নিজেকে অষ্টম শ্রেণি পাস দাবি করেছেন। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। কৃষি খাত ও ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৪ টাকা। নিজের ও স্বামীর নামে নগদ টাকা দেখানো হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই এমপির নামে জমা দেখানো হয় মাত্র ৩৮ হাজার টাকা। স্বামীর নামে জমা ১১ লাখ টাকা। নিজের নামে ২০ ভরি স্বর্ণ আর স্বামীর নামে ২ ভরি স্বর্ণ। স্থায়ী আমানত রয়েছে ৩০ লাখ টাকার। স্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন নিজের নামে দুই একর এবং স্বামীর নামে ৭ একর ৫০ শতক। অকৃষি জমি নিজের নামে তিন একর আর স্বামীর নামে সাত শতাংশ। স্বামীর নামে দালান রয়েছে একটি এবং এক লাখ টাকার বাড়ি একটি। অগ্রণী ব্যাংকের পটুয়াখালী শাখায় তার নামে ৪০ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে।

বর্তমানে সম্পদের পাহাড় : পটুয়াখালীর সম্পদ দখলের মহা কারিগর এখন সুলতান মৃধা। পটুয়াখালী শহরের পুরান বাজারের নিজ বাসার আশপাশসহ শহর ছাড়িয়ে সাগরকন্যা কুয়াকাটায় দখলের মহোত্সবে মেতেছেন তিনি। নিজ নামের পাশাপাশি স্ত্রী-মেয়ে ও জামাতার নামে অসংখ্য সাইনবোর্ড ঝুলছে পটুয়াখালীতে। এ ছাড়া একসঙ্গে ৩০০ একর জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, তাদের জমির পরিমাণ কত তা নিজেরাও জানেন না। সামান্য বিরোধ পেলেই সেখানে নিজের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন মৃধা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এক দাগেই রয়েছে তার ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ১৬ একর সম্পত্তি। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কম মূল্যে জমি কিনে পাশের জমিও দখলে নিয়েছেন তিনি। নিজ বাসার পাশে সংখ্যালঘু একাধিক পরিবারের সদস্যদের বাসাবাড়ি দখল করে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন সুলতান মৃধা। নিজ বাসার পাশে যুধিষ্টির সাহা, পুরান বাজারে চন্দন সাহা, মোশারেফ বিশ্বাসসহ অসংখ্য মানুষের জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন সুলতান, যার বাজারমূল্য শত  কোটি টাকা। আবার অসহায় মানুষের জমি দখল করে শহর-সংলগ্ন জৈনকাঠী এলাকায় অবৈধভাবে ইটভাটা নির্মাণ করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। স্ত্রী সংরক্ষিত নারী এমপি লুত্ফুন নেছা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার সুবাদে কলাপাড়া শহর-সংলগ্ন পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে একাধিক স্থানের সরকারি জমি দখল করে সাইনবোর্ড টানিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কার্যক্রম চালাচ্ছেন মৃধা। দখল প্রক্রিয়া থেকে বাদ যায়নি নিজ বংশের আত্মীয়স্বজনও। অভিযোগ রয়েছে, আত্মীয়স্বজনের জমিও অবৈধভাবে দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কুয়াকাটার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গাজী মো. ইউসুফ আলীর বাড়ির সামনে গাজী মো. ইউসুফ আলী, আলম মীর, শাহাজান বিশ্বাস, আরশেদ আলী ও মিজানুর রহমান গংয়ের ১৬ একর ১ শতক জমি সুলতান মৃধা, মেয়ে শামিমা নাসরিন এবং জামাতা আবুল হাসানাতের নামে লেখা রয়েছে, যার বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া গঙ্গামতির চরের ধোলাইখাল নামক এলাকায় সাত একর, পায়রা বন্দর লাগোয়া উত্তর পাশে ১০ একর, মহাসড়কের পাশে পলাশ ফিলিং স্টেশনসহ দুটি স্থানে সাত একর জমিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড রয়েছে। এ ছাড়া জৈনকাঠী এলাকায় ২৫ একর ফসলি জমির ওপর পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই ‘এম এল কোং’ নামে ইটভাটা তৈরি করে ব্যবসা চালাচ্ছেন সুলতান মৃধা। সেখানে ওয়ারিশদের প্রায় ১০ একর সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মৃধার ক্ষমতার দাপটে তারা টু শব্দটি করতে পারেন না। ওই ইটভাটা-সংলগ্ন বেড়িবাঁধের বাইরে নদীর তীর ভরাট করে প্রায় পাঁচ একর খাসজমি দখলে নিয়েছেন এমপি লুত্ফুন নেছা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শহরের ২ নম্বর বাঁধঘাট ডোনাভান সড়কের পাশে নদীর তীর ভরাট করে দখল করছেন এমপি লুত্ফুন নেছা। এখানেও প্রায় ১০ শতক জমি ভরাট করে গড়ে তুলেছেন চারতলা ভবন। নিচতলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালালেও অপর তলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের নামে-বেনামে রয়েছে একরে একরে জমি ও অর্থসম্পদ। এ ছাড়া রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে রয়েছে বহুতল ভবন (১৪ তলা)। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে অরুণিমা হাউজিং রিসোর্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য পটুয়াখালীর অন্তত অর্ধশত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অংশীদারিত্বের নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা তুলেছেন এমপি লুত্ফুন নেছার স্বামী ও মেয়ে। কিন্তু বাস্তবে এখনো ওই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে এমপি লুত্ফুন্নেছার স্বামী সুলতান আহমেদ মৃধা বলেন, বাস্তবে যা আছে হলফনামায় তাই দেখানো হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ মিথ্যা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow