Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ মার্চ, ২০১৮ ২৩:২৭
‘ব্রেনওয়াশ’ চক্র চারদিকে
মির্জা মেহেদী তমাল
‘ব্রেনওয়াশ’ চক্র চারদিকে
bd-pratidin

বাসায় বসে থাকতে আর ভালো লাগে না অমির। ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু নেই। কারও সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করে না। কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে সবসময়। অথচ দেশের স্বনামধন্য একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সে মেধাবী ছাত্র। মেধাবী বলেই শিক্ষকরা অমিকে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু স্কুলে যার সঙ্গেই তার ঘনিষ্ঠতা হয়, সে-ই অমিকে তার বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে। বলে, তোর বাবা-মা কোথায়? দেখলাম না কখনো। তোকে দিয়েও যায় না স্কুলে। তোর কি বাবা-মা নেই? এমন হাজারো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় তাকে। সে জন্য অমি কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না। সে একা একাই চলে বাধ্য হয়ে। এক সময় এই একাকিত্বকেই অবলম্বন করে সবসময়ের জন্য। অমি যখন ছোট তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। তার আগে তাদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগেই থাকত। এসব অমির ভালো লাগত না। কলহ-বিবাদ ক্ষ্যান্ত দেওয়ার জন্য সে কখনো কখনো বাবা-মাকে বুঝিয়েছেও। কিন্তু তাতে কোনো ফলোদয় হয়নি। বিচ্ছেদ তাদের করতেই হয়েছে। এতে করে অমি মায়ের স্নেহবঞ্চিত সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা সেনা কর্মকর্তা। তাই তার বদলির চাকরি নানা জায়গায়। এ কারণে বাবার আদর থেকেও ছিল বঞ্চিত। সত্মায়ের কাছেই সে বড় হয়েছে। একটা সময় অমি কম্পিউটার নিয়েই সারা দিন কাটিয়ে দেয়।

অমির পুরো নাম আহমেদ আসওয়াদ ইমতিয়াজ ওরফে অমি। ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। সানবীমে ইংলিশ মিডিয়ামে এ-লেভেলের ছাত্র তখন। হঠাৎ সে নিখোঁজ। গুলশানের বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর তার খোঁজ মিলছে না। কোথাও নেই। গুলশান থানায় এ ব্যাপারে একটি জিডি হয়। বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক এক বছরের মাথায় এই অমিকে পাওয়া যায় ভয়ঙ্কর এক মানুষ রূপে। গত বছর মার্চে পুলিশ কুমিল্লায় বাসে তল্লাশি চালালে বাস থেকে দুই তরুণ নেমে যায়। তাদের একজনের হাতে থাকা গ্রেনেড ছুড়ে মারে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। গ্রেনেড হামলাকারী গুলিবিদ্ধ হয়। আর এই গ্রেনেড হামলাকারী হলো অমি। অমিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হলি আর্টিজানে হামলার প্রধান সমন্বয়কারী জেএমবির তামিম আহমেদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ছিল কুমিল্লার চান্দিনায় পুলিশের ওপর হামলাকারী জঙ্গি অমি। তামিম নিহত হওয়ার আগে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া জঙ্গি আস্তানায় একসঙ্গে ছিল অমি। চট্টগ্রাম থেকে গ্রেনেড ও বোমা পরিবহন করে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে একটি গ্রুপের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল তার কাজ। সেই গ্রেনেড ও বোমা বহন করতে গিয়েই অমি ও হাসান পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। সুস্থ হওয়ার পর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে অমি তার অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বর্ণনা করে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, জঙ্গিবাদে জড়ানো তরুণদের বড় অংশের সঙ্গে তাদের বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদের বন্ধুসুলভ সম্পর্ক ছিল না। পারিবারিক বন্ধনে শৈথিল্য, সঠিক নির্দেশনার অভাব এবং বাবা-মার উদাসীনতার সুযোগে একশ্রেণির কিশোর-তরুণ পা বাড়াচ্ছে জঙ্গিবাদের অভিশপ্ত পথে। বাবা বিদেশে থাকা বা সন্তানের প্রতি বেখেয়ালিপনার কারণেও কেউ কেউ পথভ্রষ্ট হচ্ছে। সন্তানের চলাফেরা কাজকর্ম সন্দেহজনক বুঝেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা সামাজিকভাবে হেয় হবেন— এই দুশ্চিন্তায় কিংবা ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান না। এভাবে তারা সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাকায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০ বছরের কম বয়সী চার তরুণের বাবা সৌদি আরব প্রবাসী। সন্তানরা ছোট থেকেই মায়ের কাছে মানুষ। একা হাতে মা সংসার সামলাতে ব্যস্ত। এর মধ্যেই তার আদরের সন্তান বাবার দেওয়া ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনের সহযোগিতায় ফেসবুকের মাধ্যমে কখন যে জঙ্গিবাদের বিষে নীল হয়ে গেছে, তা বুঝতে পারেননি। আর যখন বুঝতে পারলেন, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাদের আদরের সন্তানেরা তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিবাদে জড়ানো তরুণদের বড় অংশের সঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের দূরত্ব ছিল। তারা প্রয়োজনে বাবা-মাকে কাছে পায়নি। আবার বাবা-মা সন্তানদের মধ্যে পরিবর্তন দেখেও সময়মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কিছু বলেননি। যে কারণে এ পথে দলে দলে তরুণরা ছুটেছে। এতে করে তারা নিজেরা যেমন বিপদে পড়ছে, তেমনি দেশকে বিপদে ফেলছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস তরুণ এক চিকিৎসকের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা যে জেনারেশনের মা-বাবা সে জেনারেশন ভূমিকম্পের মতো একটা চেঞ্জের মধ্যে পড়ে গেছি। এমবিবিএস সেকেন্ড ইয়ার শেষ করার পর ছেলের মধ্যে একটু চেঞ্জ দেখলাম। জঙ্গিবাদের ভুল পথে যাওয়া বুঝতে পারা ও বর্তমানে জামিনে থাকা এই তরুণের মা বলেন, ওরা ভুল লেকচার শুনে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কি আলেম কম রয়েছে? তাদের লেকচার কেন বেশি বেশি প্রচার করা হয় না? বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় অংশ নেওয়া রোহান ইমতিয়াজের বাবা ইমতিয়াজ খান বাবুল বলেন, ‘আমার স্ত্রী শিক্ষক। আমি নিজেও শিক্ষক ছিলাম। আমরা মানুষ গড়ার কারিগর। আমার ছেলে কখন ভুল পথে চলে গেছে, বুঝতেই পারিনি। এটা আমার চরম ব্যর্থতা। বাবা হিসেবে যেগুলো আমার খেয়াল করার কথা ছিল, সেগুলো খেয়াল করতে পারিনি।’

গুলশান হামলায় নিহত নিবরাস ইসলামের বাবা নজরুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেটার বিষয়ে যদি আগে বুঝতাম, আমি তাকে সারাজীবন সঙ্গে সঙ্গে রাখতাম।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন কিছু করতে হবে, যেন আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি না হয়। আর কোনো বাবা-মাকে যেন এমন হাহাকার করতে না হয়। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করলে অবশ্যই সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারব। আমাদের দেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ কারও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ করার আহ্বান জানান নিবরাসের মা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ করা হলে আমরা হয়তো গুলশানের ঘটনা এড়াতে পারতাম।’ বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের কাছে তরুণ যোদ্ধা পাঠানোর অভিযোগ ছিল যার বিরুদ্ধে, সেই আমিনুল ইসলাম বেগও তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সহায়তা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বেশ কয়েক মাস থাকার পর জামিনে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা এমন যে, পরিবারের বন্ধন কম। তরুণরা কাছে পায় বন্ধুদের। তরুণরা প্রথম জঙ্গিবাদের দাওয়াত পায় বন্ধুদের কাছ থেকেই।’

সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে পরিবার থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী বা সোসাইটির একটি দায়িত্ব রয়েছে। কেউ খারাপ ছেলে না। কিন্তু এদের ভুল বোঝানো হয়েছে। মিসগাইড করানো হয়েছে। সেই বিষয়টা মাথায় রেখে পরিবার ও সোসাইটিকে কাজ করতে হবে।’ তিনি বলেন, মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা সচেতন হলে কিশোর-তরুণদের জঙ্গিবাদসহ অপরাধ থেকে ফিরিয়ে রাখা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে মা-বাবার উদাসীনতা রয়েছে বলা যেতে পারে। তার সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, সে ব্যাপারে সঠিকভাবে খোঁজখবর রাখছেন না।

 

মনোচিকিৎসক ড. মোহিত কামাল বলেন, কিশোরদের তথা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণদের মন হয় ‘কাঁচা মাটি’র মতো। তাদের ‘রিজনিং পাওয়ার’ খুব কম থাকে। তাদের অনুভূতিও অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। এই বয়সে তাদের যেভাবে বোঝানো হবে তারা ঠিক সেভাবেই বুঝবে। এমনকি তাদের সহজেই ‘মোটিভেট’ও করা যায়। আর এ সুযোগেই অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই তরুণদের ব্যবহার করে। অথচ যারা এর শিকার হচ্ছে অর্থাৎ সেই কিশোর-তরুণ জানেই না যে তারা কী করছে!

ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেন, ভুল বুঝে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে তার কোনো ভয় নেই। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, এমন বিপথগামীদের সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন সিটি ইউনিটের দক্ষ গোয়েন্দা সদস্যরা। সামাজিক এবং নিরাপত্তার কারণে তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়। আহ্বানে সাড়া দিয়ে কিছু মা-বাবা তার সন্তানদের জন্য পুলিশের সহায়তা নিচ্ছেন।

up-arrow