Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:০৯
সেই নর্থব্রুক হল
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য-১২
মাহবুব মমতাজী
সেই নর্থব্রুক হল

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের নর্থব্রুক হল (লালকুঠি)। মুঘল স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ইউরোপীয় কারুকাজের মিশ্রণে গড়া ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত একটি স্থাপনা। অযত্ন-অবহেলায় প্রাচীন স্থাপত্য নর্থব্রুক হল এখন ধ্বংসের পথে। শ্রীহীন ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও হলের সেই জৌলুস আর নেই। ভবনের লাল রংও মলিন হয়ে গেছে। ভিতরে-বাইরে পলেস্তারা-আস্তর খসে পড়েছে। হলের ভিতরে অবস্থিত লাইব্রেরির আলমারি ও প্রাচীন আমলের মহামূল্যবান বইপত্র প্রায় নষ্ট। ১৪০ বছরের পুরনো এই স্থাপত্য রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ ধ্বংসের পথে। দেখার কেউ নেই। রাজধানী ঢাকার এই স্থাপত্য নিদর্শনটি ফরাশগঞ্জে অবস্থিত। নর্থব্রুক হলের দুটি ভবন। মাঝখানের প্রধান ভবনটিই ছিল ঢাকার প্রথম অডিটরিয়াম। পরবর্তীতে সেটিতে লাইব্রেরি করা হয়। রানী ভিক্টোরিয়ার চিঠি থেকে শুরু করে বিলাতের ইতিহাস, সিপাহি বিপ্লবের নানা দলিল, প্রতাপশালী ব্রিটিশ শাসকদের জীবনী, ভারতবর্ষের সীমানা নির্ধারণ কমিটির প্রতিবেদনসহ ইংরেজি সাহিত্যের নানা বই, দুই শতাধিক বাংলা বইসহ ১৫ হাজারের মতো দুর্লভ বই দিয়ে এ লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করা হয়েছিল। বহু দুর্লভ দলিলে ঠাসা এ লাইব্রেরির এখন করুণ দশা। ভবনটিও সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ। নষ্ট হতে হতে এখন আছে ৪০০-৪৫০ দুর্লভ বই। যেগুলো পড়ারও উপযোগী নয়। বছরের পর বছর ধরে আলমারিগুলো তালাবদ্ধ আছে। জানা যায়, ১৮৭৪ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নওয়াব আবদুল গনি তার নামে একটি টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৮৮০ সালের ২৫ মে গভর্নর জেনারেল নর্থব্রুক স্বয়ং হলের উদ্বোধন করেন। ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভার পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। শুরু থেকেই নর্থব্রুক হলের ভবনটি লাল রঙে রাঙানো ছিল। যে কারণে পরবর্তীতে নর্থব্রুক হলটি লালকুঠি নামে পরিচিতি লাভ করে। এ ভবন সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত সড়কটি নর্থব্রুক হল রোড নামে পরিচিত। ৩৬৫টি আসনের হলরুম নাটক ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক সভা উপলক্ষেও এ হল ব্যবহার করত।  সরেজমিন দেখা যায়, হল প্রাঙ্গণের ভিতরেই উত্তরদিকে গড়ে উঠেছে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের কার্যালয়, দক্ষিণে ডায়াবেটিক সমিতি এবং সিটি করপোরেশনের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়। মূল নর্থব্রুক হলের ভিতরে আছে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার একটি বিবর্ণ সাইনবোর্ড। গেটটি তালাবদ্ধ। ভিতরে আবর্জনা ফেলার কয়েকটি পাত্র। তবে হলটির চূড়া এবং দেয়ালের কারুকাজ এখনো মুগ্ধ করবে সবাইকে। প্রধান ফটকের আস্তর খসে পড়ে ইট বেরিয়ে গেছে। চারপাশের বিভিন্ন দরজা-জানালা ভাঙাচোরা, ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। কোথাও আবার পাখি বাসা বেঁধেছে। ভবনের ভিতরের অবস্থা আরও করুণ। ঢুকতেই মাকড়সার জালে জড়িয়ে যায় মাথা। ভবনের কেয়ারটেকার বাতি জ্বালাতেই বিভিন্ন স্থানে ঝুলে থাকা ঘন জাল বেয়ে ছোটাছুটি করে বড় বড় মাকড়সা। ধুলাবালিতে জরাজীর্ণ হয়ে আছে চারপাশ। ইঁদুর ও ছুঁচোর অভয়াশ্রম। নাট্যমঞ্চটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। মঞ্চটি এবড়োখেবড়ো। কোথাও পাটাতনের কাঠ ভেঙে ফাঁকা পড়ে আছে। মঞ্চের পেছনের কিছু অংশ ভাঙা। মঞ্চের পর্দা নেই কতদিন ধরে তা কেউ বলতে পারছে না। ছাদের কিছু অংশে ফাটল দৃশ্যমান। বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়তে পড়তে কয়েক স্থানে সিলিং ধসে পড়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো সিলিংয়ের কাঠগুলো খসে পড়ছে। মঞ্চের বাম দিকে কার্পেটগুলো বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাশের বিভিন্ন স্থানের কার্পেটগুলোর অবস্থা একই ধরনের। একটি ছাড়া অন্য বাতিগুলো নষ্ট। ব্যবহার না থাকায় নষ্ট হয়ে অচল হয়ে আছে বেশির ভাগ ফ্যান। নেই কোনো সাউন্ড সিস্টেম। দুটি পোশাক পরিবর্তনের কক্ষের একটিও ভালো নেই। হলরুমে ৬টি এসির সবকটিই নষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে লালকুঠি। দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় নষ্ট হচ্ছে এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম। স্থানীয় কাউন্সিলর (ওয়ার্ড-৪৩, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) আরিফ হোসেন ছোটন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লালকুঠি হলটি সংস্কারের অভাবে দুই বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। লাইব্রেরিতে থাকা কিছু দুর্লভ বই আমরা পাশের নতুন বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় রাখার ব্যবস্থা করেছি। যেহেতু নর্থব্রুক হলটাকে হ্যারিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সে অনুযায়ী তার কাঠামো ঠিক রেখে সংস্কারের একটা উদ্যোগ নিয়েছি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow