Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৬ মে, ২০১৮ ২৩:০৭
মামলা যখন ভয়ঙ্কর
মির্জা মেহেদী তমাল
মামলা যখন ভয়ঙ্কর

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকার নিজাম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নাদিরা আকতার নামে এক নারী যৌতুকের মামলা করেন আদালতে। বাদীর ঠিকানা উল্লেখ করা হয় খাগরিয়া চন্দনাইশ থানা। পরবর্তী সময়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চন্দনাইশে খাগরিয়া নামের কোনো গ্রামই নেই!

এইচএসসি পাসের পর শান্তাকে (ছদ্মনাম) মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান প্রেমিকের সঙ্গে। পুলিশের সহায়তায় শান্তা বাবার বাসায় ফিরলেও কোনোভাবেই শ্বশুরবাড়ি পাঠানো যায়নি তাকে। মাস তিনেক পর পরিস্থিতি বুঝে শান্তার স্বামী তালাকনামা পাঠালে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এবার শান্তার পরিবার জামাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে বসে। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে এমন অসংখ্য মামলাই রয়েছে। নারী এবং শিশুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণীত হলেও বর্তমানে এটি প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। খোদ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং বিভিন্ন মামলায় আদালতের দেওয়া পর্যবেক্ষণ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে নারী নির্যাতন মামলা। জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, বিনা কারণে তালাকের পর দেনমোহর আদায়, পরকীয়াজনিত কারণ, প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া মেয়েকে উদ্ধার, এমন নানা ঝামেলায় এ আইনে মামলা করে হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে দমাতে কথায় কথায় ঠুকে দেওয়া হচ্ছে নারী নির্যাতন মামলা। ফলে বিনা অপরাধে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী। পুলিশ সদর দফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, নারী নির্যাতন আইনে জটিলতা আছে যা সংশোধন করা প্রয়োজন। বিধান অনুযায়ী, অভিযোগকারী থানায় অভিযোগ করলে মামলা নিতে হয়। যার অধিকাংশই সঠিক থাকে না। বলা চলে, আইনটির অপব্যবহার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নারী নির্যাতন মামলায় আসামি তিন মাস আগে জামিন পান না। ফলে সমাজের কিছু দুষ্টু প্রকৃতির লোক স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি পুলিশের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রতিপক্ষকে দমাতে বড় অস্ত্র হিসেবে আইনটি ব্যবহার করছে। বাদী থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর মামলা গ্রহণের আগে তদন্তের নিয়ম থাকলেও অনেক সময় তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। এমনকি এ আইনে মামলা নিতে পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অনেক সময় হস্তক্ষেপ করেন। অন্যদিকে আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মিথ্যা মামলা করে পার পেয়ে যাচ্ছেন বাদী। আর ভুক্তভোগী হন তথাকথিত ‘আসামিরা’। যদিও নারী নির্যাতন মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান আছে। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে গেলে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। তবে ভুক্তভোগীরা নানা ধরনের হয়রানির কারণে বাদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের থেকে বিরত থাকেন। অনুসন্ধানে এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের জন্য ঢাকার পাঁচটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলার পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে, বিশেষ করে স্বামীকে বশে রাখা, বিনা কারণে তালাকের পর দেনমোহর আদায়, পরকীয়াজনিত কারণ, রাগী শ্বশুর-শাশুড়িকে শায়েস্তা, প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া মেয়েকে উদ্ধার, এমনকি জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলাতেও এ আইনে মামলা করে প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা করা হয়। এর সঙ্গে সামান্য পরিমাণ যৌতুককে মেশানো গেলে তো কথাই নেই। প্রতিপক্ষকে দমাতে কথায় কথায় ঠুকে দেওয়া হচ্ছে নারী নির্যাতন মামলা। কারণ এ মামলায় আসামি জামিন পান না। অন্যদিকে আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মিথ্যা মামলা করে পার পেয়ে যাচ্ছেন বাদী। ফলে বিনা অপরাধে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী। বাদী থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর মামলা গ্রহণের আগে তদন্তের নিয়ম থাকলেও অনেক সময় তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। এমনকি এ আইনে মামলা নিতে পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অনেক সময় হস্তক্ষেপ করেন। আইনজীবীরা বলছেন, প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ, তারপর মুক্তিপণ আদায় বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা থেকে প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা বেশি হচ্ছে। এর সঙ্গে সামান্য পরিমাণ যৌতুককে মেশানো গেলে তো কথাই নেই। নারী-শিশু নির্যাতন মামলা বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো, বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ একাধিক মামলা করে। দোষ থাকলেও করে না থাকলেও করে এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবীরাই এসব মামলা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেসব মানবাধিকার সংগঠনে এসব মামলা পরিচালনার জন্য প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা হাজির হন তারা বলছেন, নারীদের জন্য আইনি সহায়তা কেন্দ্র থাকলেও পুরুষরা সহায়তা নিতে পারছেন কম। নারীদের সহায়তা কেন্দ্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দাম্পত্য সম্পর্কে প্রতারণা মামলার পাটাতন হিসেবে যে কারণগুলো সামনে আসছে তা হলো, স্বামীকে বাগে রাখা, দেনমোহর আদায়, পরকীয়া প্রকাশ পাওয়ায় পর সংসার টিকিয়ে রাখার কৌশল, শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের শায়েস্তা করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা বেশি আকারে শুরু হয়েছে ২০১১ সালের দিক থেকে।

up-arrow