Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২১ মে, ২০১৮ ২২:২৯
আশপাশেই ভয়ঙ্কর চক্র
মির্জা মেহেদী তমাল
আশপাশেই ভয়ঙ্কর চক্র

খোকন সোনা চকলেট খাবে! ওই যে সামনে দোকান, চকলেট কিনে দেব, চল আমাদের সঙ্গে— এভাবে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে শিশু শহীদুল ইসলাম ইমনকে বাসার সামনে থেকে অপহরণ করেন দুই নারী সদস্য। পরে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেয়ে ওই রাতেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়। ওই অপহরণ চক্রের অন্যতম সদস্য শাকিল পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর এসব তথ্য দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায়। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মো. মিজানুর রহমান সায়ানের (১১) চাচার অফিসে বয় হিসেবে চাকরি করতেন মো. নাঈম হাওলাদার (২২)। সেই থেকেই সায়ান ও তার পরিবার সম্পর্কে জানত অপহরণকারীরা। এক দিন নাঈম অন্য তিন বন্ধুকে বলেন, সায়ানের বিদেশি কুকুরের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু কুকুর পালন তার পরিবারের অপছন্দ থাকায় সায়ান কুকুর পালতে পারত না। আর এ সুযোগে বিদেশি কুকুরের প্রলোভন দেখিয়ে সায়ানকে অপহরণ করে তারা। পরে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। সায়ানের পরিবার ১৯ লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে ফেরত পায়। ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ মার্চ। রাজধানীর পল্লবী থেকে অপহৃত হয় সায়ান।

এভাবেই নানা প্রলোভন দেখিয়ে দুর্বৃত্তরা অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে শিশুদের। শিশু অপহরণকারীরা মুক্তিপণের টাকা পেয়ে কখনো শিশুকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আবার মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে শিশুকে তারা নির্মমভাবে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অপহরণকারী টার্গেট করা শিশুদের বাসাবাড়ির আশপাশেই থাকে। ভয়ঙ্কর চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণের পর সুযোগ সুবিধা মতো তুলে নিয়ে যাছে কোমলমতি শিশুদের। অপহরণের শিকার অনেক শিশুর আর কোনো খোঁজও  মেলেনি। পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ছোট শিশুদের বেশির ভাগ সময়ই চকলেট বা বিভিন্ন জিনিসের প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করা হয়। এ ছাড়া অপহরণকারীরা নানা কৌশলে শিশু অপহরণ করে তাদের বাবার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। টাকা না পেয়ে শিশুকে হত্যা করে কোথাও ফেলে রাখছে। তবে শিশু ইমনের লাশ রাস্তায় ফেলে রাখেনি অপহরণকারীরা। চতুর অপহরণকারীরা ট্রাভেল ব্যাগের মধ্যে লাশ ঢুকিয়ে যাত্রীবেশে বাসের মধ্যে রেখে পালিয়ে যায়। রাজধানীর বনানী-কাকলী থেকে ওই বাসে ব্যাগের মধ্য থেকে লাশটি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। মূল হোতা শাকিল ছিল ইমনদের বাসার বাড়িওয়ালার ছেলে।

র‌্যাব অপহরণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ভয়ঙ্কর চক্রের সন্ধান পায়। এদের কাজ হলো বিভিন্ন বাসাবাড়ির সামনে আগে থেকে ওতপেতে থাকে এরা। সুযোগ বুঝে শিশুদের তুলে নিয়ে আসে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় আট বছরের শিশু বায়েজিদ অপহরণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সম্প্রতি শিশু পাচারকারী এক চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। নানা কৌশলে শিশুদের অপহরণের পর বিদেশে পাচার ও মুক্তিপণ আদায় করাই তাদের পেশা। এই চক্র ১৭টি শিশু অপহরণের কথা স্বীকার করে। এর মধ্যে সাতজনকে তারা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে, ছয় শিশুকে বিদেশে পাচার করেছে। বাকি চার শিশুর দুই শিশুকে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ করে হত্যা করেছে ও দুই শিশুকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে চক্রটি। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাচারকারী চক্রটি এসব তথ্য দিয়েছে বলে জানায় র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে ওই চক্রটি র‌্যাবকে জানায়, শিশু অপহরণের উদ্দেশে তারা যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নারায়ণগঞ্জ, চিটাগাং রোড এলাকার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং ঢাকা সদরঘাট এলাকায় ছদ্মবেশে মাইক্রোবাসে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। ফাঁকা কোনো এলাকায় কোনো শিশু পরিবার থেকে সামান্য বিচ্ছিন্ন হলেই তাকে মাইক্রোবাসে তুলে চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে অচেতন করে রাখে। পরে অপহৃত শিশুদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে তারা। র‌্যাব-১১ এর এক কর্মকর্তা জানান, অপহরণের পর কখনো কখনো মুক্তিপণ পেলেও অপহৃত শিশুদের ফেরত দিতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় শিশুদের হত্যা করত ওই চক্রটি। দুটি শিশুকে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দিয়েছে বলেও স্বীকার করে নিয়েছে চক্রটি। এই পাচারকারী চক্রটি কীভাবে শিশুদের অপহরণ, পাচার ও হত্যা করত, তার বিবরণ উঠে এসেছে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে।

আরও কয়েকটি ঘটনা : রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদির সবুজছাতা এলাকায় ৪ বছরের এক শিশুকে অপহরণের পর রাতে খুন করা হয়। গভীর রাতে একই এলাকায় পাইলিং করা মাটির গর্ত থেকে শিশু মুসকানের লাশ উদ্ধার করা হয়। অপহরণের চার দিন পর সিলেট নগরীর রায়নগর থেকে স্কুলছাত্র আবু সাঈদের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয় এক পুলিশ সদস্যের বাড়ি থেকে। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবু সাঈদ রায়নগর দর্জিবন্দের বাসায় ফেরার পথে অপহরণ হয়। অপহরণকারীরা মোবাইল ফোনে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। একপর্যায়ে টাকা কমিয়ে ২ লাখ বলা হয়। কিন্তু অপহরণকারীদের চিনে ফেলায় শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ কলাবাগান বস্তির বাসা থেকে নিখোঁজ হয় হাসান নামে ৫ বছরের শিশু। নিখোঁজের তিন দিন পর বাউনিয়া বাঁধ মহিলা মাদ্রাসা-সংলগ্ন বেড়িবাঁধের দক্ষিণ পাশের ডোবায় কচুরিপানার মধ্যে শিশুটির লাশ পাওয়া যায়। দুর্বৃত্তরা তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ডোবায় ফেলে রাখে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে অপহরণ হয় সাড়ে ৪ বছর বয়সী শিশু সুমন। পরের দিন একই এলাকা থেকে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। দুর্বৃত্তরা তার চোখও উপড়ে ফেলে। গত ১৪ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুর পূর্বপাড়ার শিশু মোস্তফা কামালকে অপহরণ করা হয়। মুক্তিপণ হিসেবে তার বাবার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দাবি করে অপহরণকারীরা। দাবিকৃত টাকা না পেয়ে অপহরণকারীরা তাকে খুন করে। ১৯ জানুয়ারি তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত চার বছরে ১২ হাজার ৮৫টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল ২১ হাজার ২২০টি। আর চলতি বছর ঘটেছে ১৬ হাজার ২২৭টি। চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যার একাধিক ঘটনার পর কয়েকটি মামলায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলেও থামছে না এসব ঘটনা। দেশের শিশু নির্যাতন ও হত্যা রোধে কঠোর আইন থাকা এবং দায়ীদের শাস্তি হওয়া সত্ত্বেও নির্যাতন হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজেদের শিশু সন্তানকে নিজেদের চোখের দৃষ্টির মধ্যেই রাখতে হবে। অন্যথায় এসব ঘটনা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow