Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:২৭
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে হাজারো সমস্যা
নেই আবাসিক হোটেল, মানি এক্সচেঞ্জ, ডে কোচ সার্ভিস ♦ দিন দিন আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের বাড়ছে জাতীয় রাজস্ব ♦ ভারত, ভুটান, নেপালের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও যোগসূত্রর সম্ভাবনা
মাহমুদ আজহার ও সরকার হায়দার, বাংলাবান্ধা (পঞ্চগড়) থেকে ফিরে
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে হাজারো সমস্যা

বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনার স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তের কোল ঘেঁষে এই বন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটন খাতে বিপুল রাজস্ব আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। রাজস্ব আয়ও বাড়ছে দিনকে দিন। তবে সিন্ডিকেটের কালো হাতের থাবা পড়েছে সম্ভাবনাময় এ স্থলবন্দরে। সম্প্রতি একটি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে শ্রমিক ও আমদানিকারকদের অসন্তোষের কারণে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এরপরও এই বন্দর থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয় করেছে সরকার। এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর বিরাট সম্ভাবনার বন্দর। ভৌগোলিকভাবে অন্যান্য স্থলবন্দর থেকে এই স্থলবন্দর সব ক্ষেত্রেই আলাদা। ভারত, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে চায়নার সঙ্গে এই বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই বন্দরের অবকাঠামো প্রয়োজন। বন্দরটিতে আরও অনেক কাজ বাকি আছে। এই বন্দর নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে।’

তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল করীম শাহীন বলেন, ‘পাঁচটি দেশের সংযোগে এ বন্দরের সম্ভাবনা অনেক। এ বন্দরে অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। তা ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা নয়নাভিরাম তেঁতুলিয়াকে পর্যটন নগরী হিসেবেও ঘোষণা দেওয়া উচিত।’ জানা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি এই তিন দেশে চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য এই ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ব্যবহার করছেন পর্যটকরা। সুযোগ এসেছে এই স্থলবন্দর ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্প্রসারণ ও সংস্কৃতি আদান প্রদানের। প্রয়োজন এখন বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের। জরুরি হয়ে পড়েছে সরকারের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের।  বন্দরের কাস্টমস সুপারিনটেনডেন্ট জাকির হোসেন তাহের (কাজল) বলেন, ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। তবে শ্রমিক অসন্তোষ আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে টানাপড়েনের কারণে পোর্ট বন্ধ না হলে এই রাজস্ব আরও বেড়ে যেত।’ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দেশের সর্ব উত্তরের এই স্থলবন্দরে এখনো নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক। ফলে সম্ভাবনাময় এই স্থলবন্দরটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে পড়তে হচ্ছে অসহনীয় ভোগান্তিতে। মোবাইল নেটওয়ার্ক না পাওয়ার জন্য অনেককেই প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে গিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এলসিও খুলতে পারছেন না। এ জন্য পঞ্চগড়ে থাকা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরাসরি বাংলাবান্ধা কিংবা তেঁতুলিয়ায় ডে কোচ সার্ভিস না থাকায় পর্যটকরাও এ বন্দর দিয়ে যাতায়াতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। পঞ্চগড় বাসমালিক সমিতির বাধার কারণে ডে কোচ সার্ভিস চালু হচ্ছে না বলে অভিযোগ তেঁতুলিয়াবাসীর। এ ছাড়া এই বন্দরের কাছাকাছি তেঁতুলিয়ায় বিমানবন্দর এবং ঢাকা থেকে সরাসরি বাংলাবান্ধা পর্যন্ত ট্রেন লাইন সংযোগেরও দাবি স্থানীয়দের। কয়েকজন পর্যটক অভিযোগ করেন, লাগেজ বহনের নেই কোনো ট্রলি। অসুস্থ রোগীদের জন্য নেই হুইল চেয়ার। আসা-যাওয়ার পথে নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। বৃষ্টি হলে ভিজেই যাতায়াত করতে হয়। ভালো মানের নেই আবাসিক হোটেল। খাবার রেস্টুরেন্ট নেই বললেই চলে। এ ব্যাপারে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এদিকে বাংলাবান্ধা বাজার থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক শ পাথর ক্র্যাশিং মেশিনের বিকট শব্দ এবং পাথুরে ধুলায় অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে এই বন্দর এলাকা। পর্যটকরা এই বন্দরে ঢুকেই একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। এই পাথুরে ধুলা নাক-মুখ দিয়ে শরীরের ভিতরে প্রবেশ করলে ভয়ানক সিলিকোসিস রোগ হতে পারে। তাই অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন বার বার ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছেন। এ ব্যাপারে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস বলেন, ‘পাথর ক্র্যাশিং ব্যবসায়ীদের মহাসড়ক এবং ক্র্যাশিং মেশিন এলাকায় পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দুই একদিন দেয় তারপর আর তারা দেয় না। সবচেয়ে ভালো হয় এই এলাকায় একটি ক্র্যাশিং মেশিন জোন করতে পারলে। সেই চেষ্টাও চলছে। দেশের অপার সম্ভাবনাময় এ বন্দরকে গতিশীল করতে সব ধরনের উদ্যোগই নেওয়া হবে।’ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু বলেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে সরকারের আরও বেশি সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত। এতে সরকার যেমন জাতীয় রাজস্ব পাবে, তেমনি এর সুফল ভোগ করবে পঞ্চগড়বাসী। সূত্র মতে, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে এখন সিন্ডিকেট চাঁদাবাজিও করছে। স্থানীয় কিছু চাঁদাবাজ ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি এ স্থলবন্দর। এ কারণে অনেক আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকেই অন্য বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চান সংশ্লিষ্টরা। স্থলবন্দর সূত্র জানায়, বাংলাবান্ধা থেকে ভারতের শিলিগুড়ির দূরত্ব ১০ কিলোমিটার, নেপালের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার ও ভুটানের দূরত্ব মাত্র ৬০ কিলোমিটার। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশনের পর ইতিমধ্যে চার দেশের মধ্যে যাতায়াতের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। বাংলাদেশ সরকারও রাজস্ব আয় করছে কোটি কোটি টাকা। এই স্থলবন্দর থেকে চীনের দূরত্ব মাত্র ২শ কিলোমিটার। ব্যবসায়ীদের আশা, অবকাঠামোর উন্নয়ন করে চীনের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন হলে উভয় দেশই লাভবান হবে। ১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপালের সঙ্গে এই স্থলবন্দর দিয়ে প্রথম বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ভুটানের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশা করছেন অচিরেই চীনের সঙ্গে এই বন্দর দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করবে সরকার।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow