Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:১৭
বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন চলছেই
মাহমুদ আজহার ও সরকার হায়দার, পঞ্চগড় থেকে
বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন চলছেই

জেলা আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় প্রতি মাসেই বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে আলোচনা হয়। প্রতিটি সভাতেই সিদ্ধান্ত হয়, যে কোনো মূল্যে বোমা মেশিন বন্ধ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। জেলা-উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি ও পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযানও চালানো হয়। জব্দ করা হয় বোমা মেশিন, মামলাও হয়। এর পরও বন্ধ হয় না বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন। গুটিকয় ব্যক্তি রাতারাতি বড়লোক হলেও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তি বিরাজ করছে। অবিলম্বে নদ-নদী ও ফসলি জমি থেকে বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবি সাধারণ মানুষের। জানা যায়, হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এসব অবৈধ বোমা মেশিনের মাধ্যমে পাথর উত্তোলনের ফলে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পঞ্চগড়। লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন প্রভাবশালীরা। এর সঙ্গে যুক্ত কিছু যুবক, পুলিশ প্রশাসন ও রাজনীতিবিদও। এদের পকেট ভারী হলেও হুমকির মুখে পড়েছে পঞ্চগড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। করতোয়া নদী ও ডাহুক নদ এখন মৃতপ্রায়। মেশিনের সাহায্যে পাথর উত্তোলনের ফলে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে মাটির নিচে। ফলে সাধারণ ভূমিকম্পেও যে কোনো সময় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে যেতে পারে এই এলাকার আবাদি জমি, বসতবাড়িসহ নানা স্থাপনা। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, পঞ্চগড় জেলার মাত্র ৬১ কিলোমিটার দূরে নেপাল। এ ছাড়া ভারতের দার্জিলিং ও সিকিমের পার্বত্য অঞ্চলগুলোও খুব কাছে। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে নেপালে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ওই ভূমিকম্পে প্রাণ যায় ৯ হাজার মানুষের, আহত হয় প্রায় ২২ হাজার মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ২৮ লাখ মানুষ। নেপালে ভূমিকম্প বার বার হয়েছে। নেপালের খুব কাছে হওয়ায় পঞ্চগড়ও চরম হুমকিতে রয়েছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় ওইসব এলাকা ভূমিকম্পে ভূমিধস ও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু ড্রেজার মালিকরা নিজেদের স্বার্থে পঞ্চগড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করেই চলেছেন। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বোমা মেশিন বন্ধের ব্যাপারে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। অচিরেই এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পঞ্চগড় পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল বারি বাবু বলেন, ‘বোমা মেশিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর একজন আসামির শাস্তি হলে বোমা মেশিন এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। বোমা মেশিন বন্ধের জন্য সামাজিকভাবে অর্ধশতাধিক বার মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা ও নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। এসবের ফলে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার তা শুরু হয়ে যায়।’ জানা যায়, বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের হোতা চার-পাঁচ জন। তাদের শাস্তি দেওয়া গেলেই বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন বন্ধ হবে। এর মধ্যে অন্যতম তেঁতুলিয়া উপজেলার পেদিয়াগজ গ্রামের কালাচানের ছেলে শেখ ফরিদ। এলাকায় তার নাম ‘ড্রেজার ডন’। প্রায় এক যুগ থেকে অবৈধ ড্রেজার (বোমা) মেশিনের সঙ্গে জড়িত। এই ডনের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে। প্রায় সব মামলাই ড্রেজার মেশিন-সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি জামিন-অযোগ্য। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলাগুলো ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নিয়ম থাকলেও রহস্যজনক কারণে তাও ফাইলবন্দী। সূত্র জানায়, বিপুল অঙ্কের টাকা আর প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ড্রেজার ডন। রাতভর তার নেতৃত্বে মাঝিপাড়ায় ডাহুক নদে শতাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হয়। প্রতি মেশিন থেকে প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদের নামে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। প্রতি রাতে তার আয় ধরা হয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। এলাকাবাসী জানান, একসময় পাথরের সাইটে শ্রমিক সর্দার হিসেবে কাজ করতেন শেখ ফরিদ। ড্রেজার মেশিনের সঙ্গে জড়িয়ে এখন তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস সম্প্রতি শেখ ফরিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। প্রতিবেদনে ১৪টি মামলার বিবরণ উল্লেখ করে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একাধিক মামলার বাদী তিনি নিজেও। জানা যায়, শুধু শেখ ফরিদ নন, বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনে জড়িত অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ীর নামে শতাধিক মামলা চলছে। কিন্তু এ অপরাধে আজও পর্যন্ত কোনো আসামিরই শাস্তি হয়নি। এ প্রসঙ্গে তেঁতুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্সে। অনেক মেশিন জব্দও করেছি। কোনো কোনো সময় আমাদের অভিযানের বিষয়টি ভূমি বিধ্বংসকারীদের জানিয়ে দেওয়া হয়। এর পরও আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

up-arrow