Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:১৮
লোভের লাগাম টেনেই সুখের শিখরে ভুটান
শিমুল মাহমুদ, ভুটান থেকে ফিরে
লোভের লাগাম টেনেই সুখের শিখরে ভুটান
bd-pratidin

সম্পদ ও প্রাচুর্যে পিছিয়ে থাকলেও লোভের লাগাম টেনেই সুখের শিখরে অবস্থান নিয়েছে ভুটান। ভুটানের প্রায় ৮ লাখ মানুষের মধ্যে জাতিগতভাবে কোনো হতাশা, হাহাকার নেই। নেই কোনো অপ্রাপ্তির ক্ষোভ। যে যার মতো করেই সুখী। হয়তো এজন্যই দেশটিতে সন্ত্রাস, রাহাজানিসহ অপরাধের পরিমাণ কম। নাগরিকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা খুব বেশি। অন্যায় সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা নেই কারোর মধ্যেই। এজন্যই বিশ্বের বিত্ত-বৈভবের সব দেশকে পেছনে ফেলে সুখী মানুষের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ভুটান। ভুটানের রাজধানী থিম্পুসহ চারটি শহর ঘুরে কোথাও ভিক্ষুকের দেখা মিলল না। কাউকে দেখা যায়নি মন খারাপ অবস্থায়। হোটেল, রেস্তোরাঁয়, রাস্তার শপিং মলে কিংবা উপাসনালয়ে যেখানেই যার সঙ্গে চোখের দেখা (আই কন্টাক্ট) হয়েছে তাকেই দেখেছি হাসিমুখে ‘হ্যালো স্যার’ বলতে। প্রয়োজনে যাদের সঙ্গেই কথা বলেছি, উত্তর পেয়েছি খুবই নিচু স্বরে। ভুটানিদের কথার স্বর এত নিচু যে পরস্পর ছাড়া সেটা অন্য কারও কানে পৌঁছায় না। পুরো দেশে এক অদ্ভুত নীরবতা। কোথাও কোনো হৈহুল্লোড়, চেঁচামেচি নেই। কারও বিরুদ্ধে কারও কোনো অভিযোগ নেই। যত জনবহুল জায়গাই হোক, সবখানেই নীরবতা, শান্তি শান্তি ভাব। এক সপ্তাহের ভুটান ভ্রমণে কোথাও ধুলাবালি কিংবা ময়লা আবর্জনা জমে থাকতে দেখিনি। ভুটানের মতো ছোট ও স্বল্পবিত্তের একটি দেশ এত পরিচ্ছন্ন, হয়তো না দেখলে এই বিস্ময়ের ঘোর কাটত না। অবশ্য এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে দেশটির কঠোর আইন। কোথাও ময়লা আবর্জনা রাস্তায় ফেললে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ভুটানের রাজধানী থিম্পু, পুরনো রাজধানী পুনাখা, পারো ও ফুয়েন্টশোলিং ঘুরে কোথাও ময়লা আবর্জনার দেখা পাওয়া গেল না। প্রথম দিন ফুয়েটশোলিং শহরে খুব ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে দেখা যায়, সড়কজুড়ে শত শত ট্রাকের টহল। কিছু ট্রাক ত্রিপল দিয়ে ঢাকা, কিছু ট্রাক খোলা। খোলা ট্রাকে করে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খালি সিলিন্ডার ট্রাকে তোলা হচ্ছে। গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাসায়, দোকানে। ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ট্রাক আবর্জনা নিয়ে যার যার গন্তব্যে যাচ্ছে। সিলিন্ডারবাহী ট্রাকগুলো খোলা থাকলেও আবর্জনাবাহী ট্রাকগুলো পুরোপুরি ঢেকে ময়লা অপসারণ করছে। এই কাজটি তারা করছে মানুষজন কাজের উদ্দেশ্যে রাস্তায় বেরোনোর আগেই। সকালের মধ্যেই শহরের সব ময়লা অপসারণ হয়ে যাচ্ছে। অসাধারণ দক্ষতায় সরকারি সংস্থা ময়লা অপসারণের কাজটি করছে। ময়লা আবর্জনা যে লুকিয়ে রাখার বিষয়, লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার বিষয় পুরো ভুটানেই যেন তার প্রদর্শনী দেখা গেল। অথচ আমাদের ঢাকায় ময়লা ঘাঁটাঘাঁটির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আবর্জনা অপসারণ নিয়ে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা জড়িয়ে পুরো বিষয়টাকেই দুর্গন্ধময় করে তোলে। ভুটানে আবর্জনা ব্যবসার লোভের লাগাম টেনেছে তারা। কারণ, এর পেছনে রাজনীতি নেই। তাদের রাজনীতিটাও দূষণমুক্ত। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কিছু উদ্যমী তরুণের উদ্যোগে বিভিন্ন বয়সী ৪৩ সদস্যের এই ব্যক্তিগত সুখের ভ্রমণ। টিমের সদস্য ডা. আতাউর রহমান বললেন, আমরা সম্মিলিতভাবে যে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের মনছবি দেখি ভুটান আসলে সেটাই। ভুটান থেকে আমাদের জাতিগতভাবেই অনেক কিছু শেখার আছে। পুরো এক সপ্তাহের ভুটান ভ্রমণ শেষে ফুয়েটশোলিয়ংয়ের গেট পেরিয়ে মনে হলো, আমরা আর আগের মতো নেই। আমরা অনেক বদলে গেছি। সুখী মানুষের দেশে ঘুরে আমাদের মনেও উড়ছে সুখের প্রজাপতি।

up-arrow