Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৫৬
চলে গেলেন রমা চৌধুরী
মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
চলে গেলেন রমা চৌধুরী

জীবনের চলার পথে প্রতিটা বাঁকে যুদ্ধ করে জেতা নারীর নাম রমা চৌধুরী (৭৭)। আমৃত্যু নারী জাগরণ ও সাহিত্যের উন্নয়ন কাজ করা এ বীরাঙ্গনার স্বপ্ন ছিল শোষণমুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ার। সোমবার ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রমা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিকস, গলব্লাডার পাথর, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার, হৃদরোগ, অ্যাজমাসহ নানান রোগে ভুগছিলেন। রবিবার সন্ধ্যার দিকে রমা চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। রাতেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। কিন্তু কোনো চেষ্টাই কাজে আসেনি। ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। এ বীরাঙ্গনার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। মৃত্যুর খবর পেয়ে সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে হাসপাতালে। এ সময় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বেলা ১১টায় তাঁর মরদেহ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়েছে। শহীদ মিনারে আনার পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা জানানো শেষে রমা চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে শেষ ঠিকানা হবে বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে, ছেলে দীপংকর টুনুর সমাধির পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন ‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘একাত্তরের জননী’খ্যাত রমা চৌধুরীর ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী প্রয়াতের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরীকে হারিয়ে আজ পুরো দেশ শোকাহত। চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি গর্বিত। সাম্প্রতি হাসপাতালের বেডে নানান রোগে কাতর রমা চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ প্রতিদিনের। তিনি অসমাপ্ত কাজ শেষ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘এ জীবনে অনেক কিছুই লেখার বাকি রয়েছে। আমি আবার কলম ধরতে চাই। নারী জাগরণের জন্য ভূমিকা রাখতে চাই। অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়তে ভূমিকা রাখতে চাই।’ সব ধর্মের অনাথ শিশুদের জন্য একটি আশ্রম খুলেছিলেন এ বীরাঙ্গনা। বই বিক্রির টাকা দিয়ে নিজ অর্থায়নে ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে একটি অনাথ আশ্রমের কার্যক্রমও শুরু করেন। কিন্তু অর্থাভাবে থমকে যায় তাঁর সেই স্বপ্ন। রমার প্রয়াণের ফলে কার্যত চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে এ অনাথ আশ্রমের কার্যক্রম। অথচ এ আশ্রম নিয়ে ছিল রমার যত স্বপ্ন। অসুস্থ থাকাকালীন এ আশ্রম নিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটা জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে সব ধর্মের অনাথরা থাকবে।’

এক নজরে রমা চৌধুরী : চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে ১৯৪১ সালে জন্ম হয় রমা চৌধুরীর। এইচএসসি পাস করার পর পরই শিক্ষকতার পেশা বেছে নেন রমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন। তিনি ঢাবি থেকে স্নাতকোত্তর করা চট্টগ্রামের প্রথম নারীদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে নতুন যুদ্ধে নেমে পড়েন রমা। এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী রমা চৌধুরীর বাড়িতে হানা দেয়। ধর্ষণের পর তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা। শিক্ষকতা জীবনে ১২টির বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রমা। শিক্ষকতার পাশাপাশি নারী জাগরণ ও সাহিত্যের উন্নয়নের জন্য লিখেছেন সমান তালে।  ১৯৯৫ সালে রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য নামে একটি বই প্রকাশিত হয় রমার। এরপর প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে রমা চৌধুরীর লেখা ১৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, স্বর্গে আমি যাব না, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন, শহীদের জিজ্ঞাসা, নীল বেদনার খাম, ’৭১-এর জননী, এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য, সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ এবং নির্বাচিত প্রবন্ধ ইত্যাদি।

বিভিন্ন সংগঠনের শেষ শ্রদ্ধা : সোমবার সকালে রমা চৌধুরীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছুটে আসেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পক্ষে ফুল দিয়ে দলীয় নেতারা শ্রদ্ধা জানান। এরপর রমা চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএফইজের সহ-সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, জেলা প্রশাসনের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান এবং নগর পুলিশের পক্ষে অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম, নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, নগর ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান, চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত আবৃত্তি জোট, বোধন, প্রমা, খেলাঘর, গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রাম।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow