Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৫
৩১ বছর পর জানা গেল বাদীই খুনি
সাখাওয়াত কাওসার

৩১ বছর পর জানা গেল হত্যা মামলার বাদীই প্রকৃত খুনি। কেবল প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তারই পরিকল্পনায় এবং নির্দেশে খুন করা হয়েছিল অসহায় দিনমজুর নূর মোহাম্মদকে। বছরের পর বছর ঘুরে অবশেষে ৩১ বছর পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) উদ্ঘাটন করল হত্যার মূল রহস্য। তবে এতদিনে স্বাভাবিক মৃত্যুতে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন খুনি মাজেদ আলী জোয়ার্দার নামের এক গ্রাম্য মাতুব্বর। স্পর্শকাতর এ ঘটনায় জড়িত ১০ জনকে শনাক্ত করে এরই মধ্যে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পিবিআই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিবিআই-প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্তে নূর মোহাম্মদের হত্যাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। আর তদন্ত শেষে এ ঘটনায় এরই মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে মাজেদ আলীসহ দুজন বার্ধক্যের কারণে মারা গেছেন। বাকিদের মধ্যে অনেকেই এখন বার্ধক্যের কারণে অসুস্থ।

পিবিআইর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গ্রাম্য বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মামলার বাদী মাজেদ আলী নিজেই তার সহযোগীদের নিয়ে নূর মোহাম্মদকে নৃশংসভাবে খুন করেন। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বংশীতলা গ্রামে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন রাতে এ ঘটনা ঘটে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বংশীতলা গ্রামে মাজেদ আলী জোয়ার্দার ও আলতাফ মোল্যা নামে দুই মাতুব্বরের দ্বন্দ্ব চলছিল। স্থানীয় ২০ বিঘার একটি জলাশয়কে ঘিরে এ দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। একসময় মাজেদ আলীর লোকজন আলতাফ মোল্যার ঘনিষ্ঠ রফিকে খুন করে। খুনের মামলার আসামি মাজেদ আলী, ইয়াসিনসহ ১৩ জন। পরে ওই মামলা থেকে বাঁচতে মাজেদের পরিকল্পনায় ও নির্দেশে দিনমজুর নূর মোহাম্মদকে খুন করা হয়। হতভাগ্য নূর মোহাম্মদ মাজেদ আলীর বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৯৮৭ সালের ২৫ জুন কুষ্টিয়া সদর থানায় মাজেদ আলী বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ছিল ২৬। আসামি করা হয় গ্রামের আরেক মাতুব্বর আলতাফসহ ১৩ জনকে। এরপর রহস্যভেদের দিন গণনা শুরু। কেটে যায় একে একে ৩১ বছর। থানা পুলিশের পর সিআইডি এবং সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর পড়ে তদন্তের ভার।

যেভাবে মামলা পিবিআইতে : থানা পুলিশের দীর্ঘ তদন্তের একপর্যায়ে মামলাটি পুলিশের তদন্ত সংস্থায় (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক মাস পর নূর মোহাম্মদের স্ত্রী তহরুন্নেসা ‘তদন্ত সঠিক হচ্ছে না’ মর্মে অভিযোগ এনে আদালতে ফৌজদারি মিস মামলা দায়ের করেন। ছয় মাস শুনানি শেষে আদালত সেই অভিযোগ খারিজ করে দেয়। এর পরও তদন্ত থেমে থাকেনি। তদন্তের সময় চলে যাচ্ছিল বলে সিআইডি আদালতের কাছে দুই মাস সময় বাড়ানোর অনুমতি চায়। আদালত এক মাস মঞ্জুর করে আদেশ দেয়। পরে নূর মোহাম্মদের স্ত্রী ‘তদন্ত সঠিক হচ্ছে না’ ও তদন্তের সময় এক মাস বাড়ানোর আদেশ দুটির বিরুদ্ধে হাই কোর্ট বিভাগে রিভিশন করতে আদালতে আবেদন করেন এবং রিভিশন চলাকালে মামলার ডকেট আদালতে রাখতে চান।

আবেদন অনুযায়ী আদালতের নির্দেশে কেস ডকেট সিআইডি থেকে আদালতের হেফাজতে চলে আসে। রিভিশন মামলা দুটির প্রায় ছয় বছর শুনানি শেষে হাই কোর্ট জেলা আদালতের পক্ষেই রায় দেয়। এরপর সিআইডি আবার মামলার তদন্ত শুরু করে। পরে সিআইডি নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুলকে দিয়ে কুষ্টিয়া সদর থানায় আরেকটি নতুন হত্যা মামলা দায়ের করায়। ওই মামলায় আগের মামলার বাদী মাজেদসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। একই দিন সিআইডি আগের মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠায়। রিপোর্টে আলতাফসহ অন্য আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে প্রথম মামলার বাদী মাজেদ সিআইডির ‘ফাইনাল রিপোর্টের’ বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ‘না-রাজি’ দেন, অর্থাৎ এ মামলাও চলবে। নিয়ম অনুযায়ী একই ঘটনায় দুটি মামলা চলতে পারে না। ফলে দ্বিতীয় মামলাটির তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। তখন নূর মোহাম্মদ খুনের ন্যায়বিচারের জন্য মাজেদ ‘না-রাজি’, ‘আপিল’, ‘রিভিশন’ ও ‘আদালত পরিবর্তন’সহ বিভন্ন পন্থায় চেষ্টা করতে থাকেন।

২০১৭ সালে আদালত প্রথম মামলার ফাইনাল রিপোর্টটি গ্রহণ করে এবং নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুলের দায়ের করা দ্বিতীয় মামলাটির তদন্ত পিবিআইতে দেয়। এরপর মামলার তদন্ত শুরু করে পিবিআই। বেরিয়ে আসে ঘটনার আদ্যোপান্ত। নিহত নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে মাজেদ আলী জোয়ার্দার আমার সামনেই আমার বাবাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরদিন মাজেদ জোয়ার্দারের বাড়ির ২০০ গজ সামনে আমার বাবার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাজেদ জোয়ার্দার বলেছিলেন আমার বাবাকে আলতাফ মোল্যার লোকেরা খুন করেছে। যদিও আমার মনে সব সময়ই সন্দেহ ছিল তার দিকে। তবে আমার সত্মা তহুরুন্নেসাকে প্রলোভন দিয়ে মাজেদ তার নিজের মতো করে মামলা চালান। এতে আমার সত্মায়ের ভাই ইয়াসিনও জড়িত ছিলেন। আমার সত্মাকে বোঝানো হয়েছিল যে, এ মামলা হলে তার ভাই রফি হত্যা মামলা থেকে রেহাই পাবে। আলতাফ মোল্যা সমঝোতা করতে বাধ্য হবেন।

up-arrow