Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৭
বন্ধু ভয়ঙ্কর
মির্জা মেহেদী তমাল
বন্ধু ভয়ঙ্কর

সন্ধ্যায় বাসা থেকে বেরিয়ে যায় কালাম। আর ফেরেনি। ফোনও বন্ধ। রাতে তার বড় ভাই বাশার ভীষণ চিন্তিত ছোট ভাইয়ের জন্য। এত রাত সাধারণত করে না কালাম। সময় বাড়ছে, বাড়ছে টেনশন। রাত পেরিয়ে যায়। ছোট ভাইকে না পেয়ে বাশার দিশাহারা। কী করবে, কোথায় যাবে, কাকে বলবে খুঁজে আনতে কালামকে! তিনি থানায় যান। ডায়েরি করেন। ব্যস, ওই পর্যন্তই। দিন যায়, মাস যায়। হদিস নেই কালামের। মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বাসিন্দা আবুল বাশারের ছোট ভাই কালাম নিখোঁজ হয়। থানা পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন কোনো বিভাগ নেই, ধরনা দেননি বাশার। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি।  আবুল বাশারের মনে পড়ল তার এক আত্মীয়ের কথা। তিনি পুলিশে আছেন। সিআইডিতে তার পোস্টিং। মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছুটলেন মালিবাগে সিআইডি কর্মকর্তা সেই আত্মীয়ের কাছে। খুলে বললেন ঘটনা। সেই কর্মকর্তা তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করলেন। জানতে পারলেন, কালামের ফোনটি ব্যবহার হচ্ছে। আর সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে পটুয়াখালী গলাচিপায়। এ খবর শুনেই বাশারের তখন শামীমের কথা মনে পড়ল। শামীম হচ্ছে কালামের বন্ধু। তার বাড়িও পটুয়াখালীতে। শামীমের সঙ্গে কিছু একটা নিয়ে কালামের ঝামেলা চলছিল। বাশারকে না বললেও তিনি টের পেতেন। পটুয়াখালীর কথা শুনেই রওনা হন বাশার পটুয়াখালীতে। শামীমের বাসায় গিয়ে হাজির হন তিনি। শামীমকে সেখানে পাওয়া যায়। বাশার ছোট ভাইয়ের সন্ধান চান শামীমের কাছে। কিন্তু শামীম বলে— ‘কালাম আমার বন্ধু ছিল। নিখোঁজ হওয়ার আগেই দুই হাজার টাকা দিয়ে কালামের কাছ থেকে সে ফোনটি কিনেছে।’ এতে সন্দেহ বাড়ে। স্থানীয় লোকজন শামীমকে বাশারের সঙ্গে ঢাকায় যেতে বলে। শামীম কাপড় আনার কথা বলে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে। অনেকক্ষণ সময় চলে গেলেও শামীম ঘর থেকে বের হয় না। এলাকার লোকজন নিয়ে শামীমের ঘরে ঢুকে বাশার তার খোঁজ করে। কিন্তু শামীম ভিতরের অপর একটি দরজা দিয়ে লাপাত্তা। ফিরে আসেন বাশার। তিন মাস পেরিয়ে যায়। বাশার ঢাকায় এসে এবার মামলা দায়ের করেন। যেখানে খবর পাচ্ছেন, সেখানেই বাশার যাচ্ছেন ভাইয়ের সন্ধানে। কালামের মোবাইল ফোন কেনার সময় যে সাক্ষীর কথা শামীম বলেছিল, সেই কামালের খোঁজ পান বাশার। তিনি কামালকে তার ভাই কালামের বিষয়ে জানতে চান। কামাল বলে, ‘আমার সামনে কোনো মোবাইল ফোনসেট কেনাবেচা হয়নি। শামীম এটা মিথ্যা বলছে। বাশার তখন নিশ্চিত যে, শামীমই তার ভাইয়ের খুনি।’ রূপনগর থানা পুলিশ গলাচিপায় যেয়ে শামীমকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়। সেবারও পুলিশ ব্যর্থ হয় তাকে গ্রেফতারে। পুলিশ শামীমের বাবা দেলোয়ার মৃধাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসে। কিন্তু তার কাছ থেকে শামীমের ঠিকানা পাওয়া যায় নাই। পুলিশ হতাশ। মামলার তদন্ত থমকে যায়। কিন্তু বাশার থমকে যায়নি। তিনি ছোটাছুটি করতে থাকেন। মামলার তদন্ত থানা থেকে গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করে। নিখোঁজ কালামের খোঁজে বিভিন্ন স্থানে হানা দেয়। পাওয়া যায় না কালামকে। শামীমও পলাতক। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে মামলার তদন্ত ভার হস্তান্তরের পরও কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। পেরিয়ে যায় আরও তিন মাস। অবশেষে গোয়েন্দা পুলিশ মামলার তদন্তে আশার আলো দেখতে পান। গোয়েন্দা পুলিশের জালে ধরা পড়ে সন্দেহভাজন কালামের বন্ধু শামীম। তাকে গোয়েন্দা দফতরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত শক্ত নার্ভের অধিকারী শামীম কোনো ভাবেই মুখ খুলছিল না। শামীম জেরার মুখে বলে, ‘কালাম আমার বন্ধু। আমি কেন তাকে হত্যা করতে যাব?’ নানা কৌশল অবলম্বন করায় শামীম স্বীকার করে। পুলিশ প্রশ্ন রাখে, ‘বল কালামকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?’ শামীম একপর্যায়ে বলে, ‘ওকে মেরে ফেলেছি। বোটানিকাল গার্ডেনের পুকুরে লাশ ফেলে দিয়েছি।’ এ কথা শুনেই পুলিশের দল বোটানিকাল গার্ডেনে যায় লাশের খোঁজে। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের তল্লাশি চলে। কিন্তু নেই লাশের কোনো চিহ্ন। আবারও জেরার মুখে পড়তে হয় শামীমকে। এবার স্বীকার করে সে। বলে, লাশ দুয়ারীপাড়ার তার ঘরের মেঝের নিচে মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়েছে। ওপরে আছে খাট। মিরপুরের দুয়ারীপাড়ার সেই বাসা থেকে সাড়ে ছয় মাস ধরে নিখোঁজ থাকা কালামের লাশের হাড়গোড় উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ নিচে রেখে ওপরের খাটে সাড়ে ছয় মাস ধরে সে ঘুমিয়েছে। শামীমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় তার বন্ধু স্বাধীনকে। শামীম জানায়, যেদিন নিখোঁজ হয় কালাম, সেদিনই তাকে হত্যা করা হয়।  কেন খুন : পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে খুনের নেপথ্য কাহিনী। পুলিশ জানায়, দুই বন্ধু কালাম ও শামীম একই নারীকে ভালোবাসেন। দুজনই তাকে কাছে পেতে চান। প্রেম করতে গিয়ে কালামের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নেন শামীম। ধারের টাকা প্রেমিকার পেছনে খরচ করেন। একপর্যায়ে ধার দেওয়া টাকা ফেরত চান কালাম। বিপত্তি বাধে ঠিক তখন। একদিকে টাকা খরচ করে প্রেমিকাকে বাগে আনতে পারছেন না, তার ওপর টাকা শোধের চাপ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কালামকে হত্যার পরিকল্পনা করেন শামীম। তার এই পরিকল্পনায় ছিল তার বন্ধু স্বাধীন। আরও দুই ভাড়াটে কিলারকে তারা ভাড়া করে পাঁচ হাজার টাকায়। তারা মিলে খুন করে।

up-arrow