Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩৪
ভিলেজ পলিটিক্স
মির্জা মেহেদী তমাল
ভিলেজ পলিটিক্স
bd-pratidin

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের ছায়েদ আলীর  মেয়ে বিউটি আক্তার (১৬) নিখোঁজ হয়। এক দিন পর গুণীপুর গ্রাম থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে শায়েস্তাগঞ্জের হাওরে তার লাশ পাওয়া যায়। অপহরণ করে বিউটিকে ধর্ষণের অভিযোগে একই গ্রামের ইউপি মেম্বার কলম চান বিবির ছেলে বাবুল মিয়ার বিরুদ্ধে নিখোঁজ হওয়ার আগেই একটি মামলা হয়েছিল। এবার নিখোঁজ হওয়ার পর অভিযোগের তীর সেই বাবুলের দিকে। বাবা ছায়েদ আলী মামলা করেন বাবুল মিয়া ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে আসামি  করে। পুলিশ কলম চান বিবি ও বাবুলের বন্ধু ইসমাইল মিয়াকে গ্রেফতার করে। ধর্ষণের পর মামলার ঘটনা এবং হাওরে বিউটির রক্তাক্ত লাশের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। পরে সিলেট থেকে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। বাবুল ও তার মা কলম চান বিবিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এদিকে মেয়েকে হারিয়ে বাবা ছায়েদ আলী পাগলপ্রায়। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। কিন্তু বাবুলকে গ্রেফতার করা হলেও ঘটনার বিষয়ে পুলিশ তাদের কাছ থেকে কিছুই বের করতে পারে না। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের গভীরে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে ভয়ঙ্কর নতুন কাহিনী। পুলিশ জানায়, নিখোঁজ হওয়ার আগে বাবুলের বিরুদ্ধেই ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই বাবুলই হত্যার সঙ্গে পরে জড়িত বলে সবার ধারণা ছিল। অভিযোগ করা হয়, বিউটিকে ফুসলিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ধর্ষণ করেছিলেন ইউপি সদস্য (মেম্বার) কলম চান বিবির ছেলে বাবুল। ঘটনার পর বাবুলের বিরুদ্ধে মামলা করতে বিউটির বাবা ছায়েদ আলীকে সহায়তা করেন বাবুলের মায়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ময়না মিয়া। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বাবুলের মা কলম চান বিবির সঙ্গে ইউপি নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করে হেরে যান ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার। ওই নির্বাচনে কমল চান বিবির প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার কথা ছিল। পরে তা না করলে বিরোধ হয়। এই বিরোধের জেরেই বাবুলের অপকর্মের সুযোগ নিয়ে বিউটির বাবাকে দিয়ে আদালতে মামলা করান ময়না। শেষে হত্যার পরিকল্পনা করেন। বাবুলকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে রহস্য তৈরি হলে ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তারকে আটকের পর তার বক্তব্যও রেকর্ড করে আদালত। প্রথম দফায় দায়ের করা ধর্ষণ মামলার সাক্ষী ময়না মিয়াকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসব জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে নতুন তথ্য। পুলিশ মামলার বাদী ও বিউটির বাবা ছায়েদ আলীকে গ্রেফতার করে। পুলিশ জানায়, বিউটিকে ধর্ষণে অভিযুক্ত বাবুল মিয়া অলিপুরে প্রাণ কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করে। মেম্বার মায়ের প্রভাব খাটিয়ে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে সে বিয়ে করে। ছায়েদ মিয়ার মেয়ে বিউটি আক্তার স্থানীয় মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। বাবুলের চোখ পড়ে তার ওপর। বিউটির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক করে তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখায় বাবুল। অলিপুর এলাকায় এক হাজার টাকায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে কয়েক দিন বিউটিকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে থাকে বাবুল। বিউটিকে প্রাণ  কোম্পানিতে চাকরি দেওয়া কথা বলেই মূলত সে নিয়ে যায়। বিউটির মা হুসনা বেগমও আরএফএলের ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন। ঘটনা জানতে পেরে বিউটির বাবা ছায়েদ আলী প্রাণ  কোম্পানিতে গিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় শালিস বসে। কিন্তু বাবুল বিউটিকে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় শালিসে কোনো সমাধান হয়নি। পরে বিউটিকে হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে তিন দিন রাখা হয়। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অপহরণসহ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি ৪ মার্চ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় এফআইআর করা হয়। এরই মাঝে ১২ মার্চ আবারও ইউপি চেয়ারম্যান জজ মিয়ার নেতৃত্বে শালিসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মামলা হওয়ায় কোনো শালিস হয়নি। ১২ মার্চ বিউটিকে থানায় আনা হয়। পরে মেডিকেল করার পর আদালতে সে ২২ ধারায় জবানবন্দী দেয়।

পুলিশ জানায়, বিউটিকে বাড়িতে নেওয়ার পর সামাজিক কারণে দিশাহারা হয়ে পড়েন বাবা ছায়েদ আলী। তিনি বিউটিকে পাঠিয়ে দেন লাখাই উপজেলার গুণীপুর গ্রামে তার নানী ফাতেমা বেগমের বাড়িতে। ছায়েদ আলীর মানসিক যন্ত্রণার সুযোগ নিয়ে নতুন করে ফন্দি আঁটেন ময়না মিয়া। ইউপি নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের মেম্বার পদে নির্বাচনে তার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে বাবুলের মা কলম চান বিবির প্রত্যাহার করার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত কথা না রেখে কলম চান বিবি নির্বাচনে অংশ নেন এবং তার কাছে পরাজিত হন ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার। এরই জের ধরে বিউটিকে অপহরণের পর ধর্ষণের ঘটনায় মামলায় সাক্ষী হন ময়না মিয়া। তিনি ছায়েদ আলীকে বোঝাতে থাকেন, বাবুল যদি বিউটিকে বিয়ে না করে তাহলে এই নষ্ট মেয়েকে কেউ বিয়ে করবে না। অন্য সন্তানদেরও আর বিয়ে হবে না। ‘যদি  বিউটিকে মেরে বাবুল মিয়া ও তার মা কলম চান বিবিকে ফাঁসানো হয় তাহলে একদিকে প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং তার অন্য সন্তানরা রক্ষা পাবে।’ এক পর্যায়ে ময়না মিয়ার প্রলোভনের ফাঁদে পা দেন ছায়েদ আলী। ময়না মিয়ার এই প্ররোচনায় পড়ে বাবা ছায়েদ আলীই বিউটিকে তার নানীর বাড়ি থেকে এনে খুনিদের হাতে তুলে দেন। এরপর ময়না ও এক ভাড়াটে খুনি বিউটিকে হত্যা করে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow