Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৫০
সুটেড বুটেড
মির্জা মেহেদী তমাল
সুটেড বুটেড

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে আছেন শাহনেওয়াজ। উচ্চ শিক্ষিত ও বেশ স্মার্ট। রাজনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা বাণিজ্য-সবকিছুতেই তার অগাধ জ্ঞান। কথা যখন বলেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই শোনেন। যে কারণে অফিসের বস থেকে পিয়ন-সবাই তাকে পছন্দ করেন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড় শাহনেওয়াজ এক বছর হলো বিয়ে করেছেন। পরিবারের সবাই এক সঙ্গেই থাকেন। শাহনেওয়াজের কলিগ শফিক রহমান। একদিন লাঞ্চ টাইমে শফিকের কেবিনে গিয়ে ঢোকেন শাহনেওয়াজ। ভিতরে শফিকের সামনে বসে আছেন এক ভদ্রলোক। অতি আধুনিক ও ম্যানার এটিকিট মেইনটেইন করা সুটেড বুটেড ও কেতাদুরস্ত সেই ভদ্রলোককে দেখে ভালো লাগে শাহনেওয়াজের। শফিক পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, আমার বন্ধু মামুন। ব্যবসায়ী। ভদ্রলোকটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমি মামুন। শাহনেওয়াজ হ্যান্ডশেক করেন। তিনজনে মিলে নানা ধরনের কথাবার্তায় পাক্কা এক ঘণ্টা আড্ডায় মশগুল থাকেন। তবে বেশি সময় কথা বলছিলেন মামুন। বেশিরভাগ কথাই ছিল নানা ধরনের ব্যবসা নিয়ে। কথায় কথায় মামুন বলছিলেন, একটি নতুন ব্যবসা এসেছে যেখানে ঘরে বসে কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে লাখ লাখ টাকা আয় করা যাচ্ছে। এখানে অল্প কিছু টাকা ইনভেস্ট করলেই হলো। ব্যাস, টাকা শুধু আসতেই থাকবে। কয়েকটা উদাহরণও দিয়ে দিলেন। তার এই বন্ধু এখন কোটি টাকার মালিক। সেই বন্ধু বাড়ি গাড়ি আলিশান অবস্থা। যাদের একসময় কিছুই ছিল না। চাকরি বাকরি ছেড়ে অনেকেই এখন এই ব্যবসায়। শাহনেওয়াজ কথাগুলো শুনছিলেন, কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করছিলেন না। শাহনেওয়াজ নিজে কোনো কিছু তথ্য প্রমাণ না দেখা পর্যন্ত কিছুতে তিনি এগোন না। শাহনেওয়াজ সেই বন্ধুর কাছ থেকে সেই ব্যবসার ওয়েবসাইট ঠিকানা নিলেন। ভাবলেন, নিজেই চেক করে বিষয়টা নিয়ে ভাববেন। তবে মামুনকে খুব একটা নিজের ইন্টারেস্ট দেখাল না।

শাহনেওয়াজ সেই ঠিকানা চেক করল। হ্যাঁ, ঠিকইতো! মামুনতো ঠিকই বলেছে। যা বলেছে, তার সবই দেখতে পাচ্ছে ওই ঠিকানায়। শাহনেওয়াজ তার কয়েক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। যারা এই ব্যবসা করছেন। তারাও বললেন, হ্যাঁ এমন ব্যবসাতো আছেই। তারাও করছে।

মনে মনে ব্যবসাটা করবে বলে ভাবছেন শাহনেওয়াজ। তার মনের ভিতর এখন নানা ধরনের চিন্তা চলে এসেছে। ভাবছেন, ৩০ দিন চাকরি করে পাওয়া যায় একদিন বেতন। তার চেয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা আয় করলে ক্ষতি কী? তাও আবার ঘরে বসে থেকে। এই চিন্তা থেকেই বাসার সবার সঙ্গেই শেয়ার করলেন। বাসার সবাই শাহনেওয়াজকে বেশ বুদ্ধিমান জানেন। যে কারণে সবাই রাজি হয়ে যান। শাহনেওয়াজ ফোন করে মামুনকে। কুশলাদি বিনিময়ের পর শাহনেওয়াজ তাকে একটি রেস্টুরেন্টে আসতে বলেন। সে ফ আড্ডা। মামুন চলে আসে সময় মতো। তারা দুজনে কথা বলতে বলতে মামুন তাকে প্রস্তাব রাখে সেই ব্যবসা করার। শাহনেওয়াজ মনে মনে যা যাচ্ছিলেন তা মামুনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। শাহনেওয়াজ রাজি হয়ে যান।

এবার মামুন তাকে আন্তর্জাতিক শেয়ার সাইটের ঠিকানা দিয়ে সব নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিলেন। মামুন তাকে বললেন, ‘আপনাকে কিছুই করতে হবে না, শুধু প্রথমে ওই সাইটে একটা ইউজার আইডি খুলতে হবে। আইডি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার আইডিতে কিছু বোনাস ভার্চুয়াল কারেন্সি জমা হবে। যা বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট নয়।’ একথা শুনে শাহনেওয়াজ বেশ কিছু নগদ নগদ টাকা মামুনকে দেন। মামুন তখন সমপরিমাণ ভার্চুয়াল কারেন্সি কিনে শাহনেওয়াজের আইডিতে ট্রান্সফার করে দেন। এর মধ্যেই একটা সূক্ষ্ম বিচ্যুতি ধরা পড়ে শাহনেওয়াজের চোখে। যে সাইটটি প্রথমে মামুন দেখিয়েছিল তাতে শেষে ছিল ডট কম। কিন্তু বিনিয়োগ যেটাতে করা হয়েছে, তাতে রয়েছে ডট ওআরজি। বিষয়টি মামুনকে জিজ্ঞাসা করতেই সে জানায়, এটা একই সাইটের একটা ব্রোকার হাউসের ভার্সন। যেখানে বিশেষ বিশেষ অনেক সুবিধা আছে। আর এই ব্রোকার হাউসটা শুধু বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের ডিল করে। এ কথা শুনে শাহনেওয়াজ আস্বস্ত হন।

শাহনেওয়ার ঘাঁটালেন না। বিনিয়োগ এবার করেই ফেললেন। এরপর তার কাছে একটার পর একটা বিভিন্ন লোভনীয় ও লাভজনক ব্যবসায়িক প্রস্তাব আসতে লাগল। রবিবারের লটারি ডিলে অংশ নিলে বিজয়ী হলে ২০০ ভাগ বোনাস, বিজয়ী না হলে ১২০ ভাগ বোনাস যা অ্যাকাউন্টে ভার্চুয়াল কারেন্সিতেই যোগ হবে।

অফিসের কাজেও শাহনেওয়াজের ঢিলেমি এসে গেছে। এই বিজনেসে একটু সময় দিলে বা বিভিন্ন পর্বে অংশ নিলে একদিনেই ২৫০-৩০০ ডলার আয় করা যায়। শাহনেওয়াজের এমন ভাবনায় এবার এই ব্যবসায় আরও মনোযোগ দিলেন। নতুন নতুন আইডি খুলতে লাগলেন। নগদ যেখানে যা ছিল সব এখানে কাজে লাগালেন। একসময় ভাবলেন বাসায় যে গয়নাটি অযথা পড়ে আছে তা বিক্রি করে এখানে কাজে লাগাবেন। পরে আবার নতুন মডেলের গয়না কিনে নিবেন। শাহনেওয়াজ দেখলেন, তার অ্যাকাউন্টে আসল আর মুনাফা মিলে প্রায় ৮০-৯০ হাজার ডলার জমা হয়ে গেছে। একসময় ডলার জমানো তার নেশায় পরিণত হতে থাকে। হঠাৎ তার বড় অঙ্কের টাকা দরকার হয়। ভার্চুয়াল ডলার নগদায়ন করার চিন্তা করে। করতে গিয়ে শাহনেওয়াজ জানতে পারেন, নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। একটা নির্দিষ্ট সময় হওয়ার আগে কোনো অ্যাকাউন্টের নগদায়ন করা যাবে না। আবার যখন তোলা যাবে তখন একদিনে সর্বোচ্চ ৫০ ডলারের বেশি ভাঙানো যাবে না। এর কিছুদিন পর এক সকালে শাহনেওয়াজ অ্যাকাউন্টে ঢুকতে গিয়ে ঢুকতে পারছেন না। বারবার  ৪০৪ বা ৫০৬ এরর মেসেজ আসছে। মামুনকে  মোবাইলে ফোন দেন। কিন্তু মোবাইলে শুনতে পায়-দুঃখিত, আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শাহনেওয়াজ আর কোনোদিন সেই নম্বরটি খোলা যায়নি।

মামুনের মতো প্রতারক চক্র এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে। সহজ সাধারণ মানুষদের ব্যবসার লোভ দেখিয়ে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এমন এক প্রতারক চক্রের তিন সদস্য গ্রেফতার হয়েছে সিআইডির হাতে। সিআইডি জানায়, ইতিমধ্যে এই প্রতারক চক্রটি বাংলাদেশের নোয়াখালী, কুমিল্লা, সাভার, গাইবান্ধা ও দিনাজপুরের প্রায় ৫ হাজার ৪০০ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এই প্রতারক চক্রের দ্বারা প্রতারিত হয়ে একজন কদমতলী থানায় মামলা দায়ের করেন। এই সংঘবদ্ধ গ্রুপের ৩ সদস্যকে গত ৪  সেপ্টেম্বর সিআইডি অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রেফতার করে।

সিআইডি অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হয়ে প্রতারিত হবেন না কেউ। এসব প্রতারকরা আপনার-আমার সামনে মুখোশ পরে ভদ্রলোক সেজে ঘুরাফেরা করে। সুতরাং নিজে সাবধান হোন এবং অন্যকে সাবধান করুন। আর আপনি যদি ইতিমধ্যে এদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে থাকেন, তাহলে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow