Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৫৯
নদী ভাঙনে দিশাহারা মানুষ
আরও ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গেল বিলীন হয়ে
প্রতিদিন ডেস্ক
নদী ভাঙনে দিশাহারা মানুষ
শরীয়তপুরে আগ্রাসী নদী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা —বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রতি বছরের মতো এবারও নদী ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন পদ্মা ও যমুনা পাড়ের মানুষ। ভাঙন ক্রমেই প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। নিমিষেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, জমিজমাসহ সবকিছু। ফলে দিশাহারা মানুষ অসহায়ের মতো অপেক্ষা করছেন নিয়তিকে ভর করে।

আমাদের শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুর প্রতিনিধির পাঠানো খবর—

শেষ রক্ষা হলো না নড়িয়াবাসীর : ইমাম হোসেন দেওয়ানের বাড়িটা ১০ বছর আগে ৫ কিলোমিটার উত্তরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এ বছর নদী চলে আসে তার বসতঘরের কাছে। এবার ভয়াবহ ভাঙন প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। গত জুলাই মাসে তার বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি হারিয়ে তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এর রেশ কাটতে না কাটতেই নিয়ে গেল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাঁধ দেওয়ার জন্য একনেকে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু করতে না পারায় আজ আমাদের এই দশা।’

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানের বাড়িঘর সব জায়গা বিলীন হয়ে গেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সোম ও মঙ্গলবার তাদের পরিবারের ভাই-বোনদের শেষ সম্বল দেওয়ান মার্কেট, বিপণি বিতান ও দেওয়ান ক্লিনিক নদীর বুকে চলে যায়। এতে ২০ কোটি টাকার সম্পদ নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, বসতবাড়ি, ফসলি জমির পর আজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে গেলাম। মঙ্গলবার দেওয়ান ক্লিনিক দুপুরের দিকে পদ্মার ভাঙনে ধসে পড়ে। ওই ভবনের পাশের আরও তিনটি তিনতলা ভবনের আংশিক নদীতে ধসে পড়েছে।

আতঙ্কে যমুনা তীরের মানুষ : ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর-শাহজাদপুর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার যমুনা নদী তীরবর্তী মানুষের। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে এনায়েতপুর থানার ব্রা??হ্মণ ও আড়কান্দিসহ প্রায় ছয়টি গ্রামের সহস্রাধিক বসতভিটাসহ কয়েক শতাধিক হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ধন-সম্পদ হারিয়ে ধনবান ব্যক্তিরা মুহূর্তে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। চৌহালীর  স্থলচর-খাসপুকুরিয়া-বাঘুটিয়া ইউনিয়নে স্বল্প ভাঙন শুরু হলেও আতঙ্ক কাটছে না তিনটি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের। শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী, জামিরতা, ভাটপাড়া এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। কাজিপুরের কয়েকটি ইউনিয়ন ভাঙনের কবলে রয়েছে। বন্যা আসার আগে এসব অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভয়াবহ ক্ষতি হবে বলে ভাঙন মুখে থাকা পরিবারগুলো জানিয়েছে। তবে পাউবো বলছে, কাজিপুরে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে।

থামছে না পদ্মা আড়িয়াল খাঁ মধুমতির ভাঙন : পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে ফরিদপুরের সদরপুর ও চরভদ্রাসনের অবস্থা ক্রমেই ভয়াল আকার ধারণ করছে। গত এক মাসে পদ্মা নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে চরভদ্রাসন উপজেলার সদর ইউনিয়নের এমপি ডাঙ্গী, ফাজেল খাঁর ডাঙ্গীর বেশির ভাগ এলাকাই চলে গেছে নদীগর্ভে। এখনো ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদীপাড়ের হাজারো মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী, চরমানাইর, চরনাসিরপুর, আকটের চর ইউনিয়নে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। কয়েক দিনের ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। এ ছাড়া মধুমতি নদীর ভাঙনে বাজড়া, চরআজমপুর, রায়ের পানাইল, চরডাঙ্গার শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ফরিদপুর জেলার মধ্যে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরভদ্রাসন উপজেলা। কয়েক বছরের ভাঙনে পদ্মা নদীর গর্ভে চলে গেছে ৫৯টি গ্রাম। ফলে সাড়ে ১১ হাজার পরিবারের প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ বসতবাড়ি ও ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।

 চরভদ্রাসন সদর উপজেলার যেসব গ্রাম নদী ভাঙনের শিকার হয়ে একেবারেই বিলীন হয়েছে সেগুলো হচ্ছে— গাজীরটেক ইউনিয়নের বঙ্গ সরকারের ডাঙ্গী গ্রাম, সাতঘর ডাঙ্গী, দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ডাঙ্গী, হারান সরকারের ডাঙ্গী, উজির মামুদ ডাঙ্গী, বঙ্গ মণ্ডলের ডাঙ্গী, বৈদ্য ডাঙ্গী, মাঝি ডাঙ্গী, রমেশ বালার ডাঙ্গী, রাম জীবন বৈরাগীর ডাঙ্গী, কানাইরটেক, নিবারুন বালার ডাঙ্গী, জয়চাঁদ প্রামাণিকের ডাঙ্গী, নতুন ডাঙ্গী, নিবারুন মণ্ডলের ডাঙ্গী, বিন্দু ডাঙ্গী, যজ্ঞেস্বর ডাঙ্গী, মধু ফকিরের ডাঙ্গী, রহমান প্রামাণিকের ডাঙ্গী, গনি মাতুব্বর ডাঙ্গী, চরহাজীগঞ্জ, হাজীডাঙ্গী, খালাসী ডাঙ্গী, খালপাড় ডাঙ্গী, চর মোহন, চরভদ্রাসন ইউনিয়নের ওয়াজুদ্দিন ফকিরের ডাঙ্গী, ওয়াজদ্দিন মুন্সির ডাঙ্গী, ইউসুপ শিকদারের ডাঙ্গী, ইন্তাজ মোল্যার ডাঙ্গী, মোল্যা ডাঙ্গী, হাজী নজু মোল্যার ডাঙ্গী, বালিয়াডাঙ্গী, টিলারচর, জাকেরের সুরা, সবুল্লা মাতুব্বর ডাঙ্গী, পরান বৈরাগীর ডাঙ্গী, সেকের ডাঙ্গী, চরহরিরামপুর ইউনিয়নের জৈনুদ্দিন বিশ্বাসের ডাঙ্গী, তোতার ডাঙ্গী, আজাহার বেপারীর ডাঙ্গী, নমুর ছাম, চরশালেপুর, নিমাইখার ডাঙ্গী, দাই ডাঙ্গী, ছবুল্লা শিকদার ডাঙ্গী, খন্দকার ডাঙ্গী, ওছিমুদ্দিন মোল্যার ডাঙ্গী, কছিমদ্দিন প্রামাণিকের ডাঙ্গী, আমিন খার ডাঙ্গী, আছরুদ্দিন শিকদার ডাঙ্গী, চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের উত্তর কল্যাণপুর, দক্ষিণ কল্যাণপুর, গোপালপুর, মির্জাপুর, চরতাহেরপুর, বাদশা মোল্যার ডাঙ্গী ও ধোনাই মৃধার ডাঙ্গী, রেজু চৌকদার ডাঙ্গী, বাদশা মোল্যার ডাঙ্গী, শহর মোল্যার ডাঙ্গী, ধুনাই মৃধার ডাঙ্গী, উত্তর নবাবগঞ্জ ও দিয়ারা গোপালপুর মৌজা। এসব ভাঙনকবলিত গ্রামের কয়েকশ বিভিন্ন স্থাপনা, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট ও ফসলি জমিসহ প্রায় ১৮ হাজার ২১০ একর জমি পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে। সদরপুরের পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনের তীব্রতা বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ তাদের বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow