Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৯
বুড়িমারী বন্দরে শুধুই ভোগান্তি
গড়ে ওঠেনি উন্নত হোটেল । নেই মানি এক্সচেঞ্জ, ডে কোচ সার্ভিস । রাজস্ব বেড়েছে সেবা বাড়েনি
শিমুল মাহমুদ ও রেজাউল করিম মানিক, বুড়িমারী থেকে ফিরে
বুড়িমারী বন্দরে শুধুই ভোগান্তি
bd-pratidin

দেশের তৃতীয় বৃহত্তম ও সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর বুড়িমারী। উত্তরের সীমান্ত জেলা লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ভোগান্তির শেষ নেই। প্রতি বছর রাজস্ব আয় বাড়লেও সেবা বাড়েনি বন্দরের। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সংযোগস্থল এই বন্দর দিয়ে প্রতি বছর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লেও অবকাঠামো সুবিধা বাড়ছে না। গড়ে ওঠেনি উন্নত আবাসিক হোটেল। নেই মানি এক্সচেঞ্জ ও ডে কোচ সার্ভিস। সংস্কারের অভাবে বন্দরে যাতায়াতকারী একমাত্র রাস্তাটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে।

এতকিছু সত্ত্ব্বেও দেশের এই বৃহত্তম স্থলবন্দরটিতে বেড়েছে রাজস্ব আয়। স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মোসফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, এই বন্দরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ কোটি টাকা। রাজস্ব অর্জিত হয়েছে ৬৮ কোটি ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ কোটি বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৪ কোটি ৪১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। গত দুই মাসে অর্জিত হয়েছে ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ওই কর্মকর্তা জানান, এ বন্দরে প্রতিদিন ভারত ও ভুটানের প্রায় ৪০০ ট্রাক বিভিন্ন প্রকার পণ্য নিয়ে প্রবেশ করে। এ বন্দর ব্যবহার করেন প্রতিদিন প্রায় ৪০০ পর্যটক। অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে এ বন্দরটি একটি মডেল হিসেবে দাঁড়াতে পারে বলে অভিমত এই রাজস্ব কর্মকর্তার। ১৯৮৮ সালের ২১ এপ্রিল ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী সীমান্তে প্রথম পর্যায়ে শুল্ক স্টেশন ট্রানজিট রুটটি চালু করে তৎকালীন এরশাদ সরকার। ভুটানের ফুয়েন্টশিলিং সীমান্ত হয়ে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা দিয়ে বাংলাদেশের বুড়িমারীর জিরো পয়েন্টে শুল্ক স্টেশনটির ট্রানজিট রুট রয়েছে। এ রুট দিয়ে পরবর্তীতে ভুটানের সঙ্গে ব্যবসায়িক গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের সঙ্গেও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ট্রনজিট চালু হয়। এ ছাড়া নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট রুট চালু হলেও এ বন্দর দিয়ে নেপাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো পণ্য আমদানি বা রপ্তানি হয়নি বলে বন্দর সূত্রে জানা গেছে। তবে নেপালের ৬০ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়াশোনার কারণে এই রুটের ইমিগ্রেশন নিয়ে চলাচল করে। বন্দর সূত্র জানায়, সরাসরি বুড়িমারী কিংবা পাটগ্রাম থেকে ডে কোচ সার্ভিস না থাকায় পর্যটকরাও এ বন্দর দিয়ে যাতায়াতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। লালমনিরহাট বাস মালিক সমিতির বাধার কারণে ডে কোচ সার্ভিস চালু হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন জেলা শ্রমিক লীগের একাধিক নেতা। কয়েকজন পর্যটক অভিযোগ করেন, লাগেজ বহনের নেই কোনো ট্রলি। অসুস্থ রোগীদের জন্য নেই হুইলচেয়ার। আসা-যাওয়ার পথে নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। বৃষ্টি হলে ভিজেই যাতায়াত করতে হয়। ভালো মানের নেই আবাসিক হোটেল। উন্নত খাবার রেস্টুরেন্টও নেই। এ ব্যাপারে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

এদিকে বুড়িমারী জিরো পয়েন্ট থেকে পাটগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে কয়েকশ পাথর ক্র্যাশিং মেশিনের বিকট শব্দ এবং পাথরের ধুলায় অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে এই বন্দর এলাকা। পর্যটকরা এই বন্দরে ঢুকেই একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মুখোমুখি হন। স্থানীয় প্রশাসন বার বার পাথর ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছে। এ ব্যাপারে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল করীম বলেন, ‘পাথর ক্র্যাশিং ব্যবসায়ীদের মহাসড়ক এবং ক্র্যাশিং মেশিন এলাকায় পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দু-একদিন দেয়, তারপর আর দেয় না। সবচেয়ে ভালো হয় এই এলাকায় একটি ক্র্যাশিং মেশিন জোন করতে পারলে। সেই চেষ্টাও চলছে।’

সূত্রমতে, বুড়িমারী স্থলবন্দরে এখন সিন্ডিকেট চাঁদাবাজিও চলছে। স্থানীয় কিছু চাঁদাবাজ ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি এ স্থলবন্দর। সরকারদলীয় ক্যাডাররাও জিম্মি করে রেখেছে এই বন্দরটি। এ কারণে অনেক আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অনেকেই অন্য বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন।

 

সূত্র জানায়, ঢিমেতালে চলছে বন্দরের উন্নয়ন কাজ। ২০১০ সালে এ শুল্ক স্টেশনটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হলেও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি এখনো। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নিশাত হোসেন বলেন, স্থলবন্দর ঘোষণার পর থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে খরচ আরও বেড়ে গেছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা বন্দরটি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তার মতে, স্থলবন্দরটি দেশের অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় দ্বিতীয় সারির হওয়া সত্ত্ব্বেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে ব্যবসায়ীদের জন্য সে রকম কোনো সুযোগ সুবিধা না থাকায় বন্দরটি ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ব্যাপারে বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী মুছা আলী জানান, এ স্থলবন্দর মূলত ভুটানের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। ভারত থেকেও কিছু কিছু পণ্য আমদানি হয়। এ ব্যাপারে বুড়িমারী স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (এসি) এস এম খায়রুল বাশার বলেন, বুড়িমারী স্থলবন্দরটি আমদানি ও রপ্তানিকারকের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনাময় একটি রুট। তবে ভুটান থেকে আগের তুলনায় পণ্য আমদানি বেশি হলেও তা শুল্কমুক্ত হওয়ায় রাজস্ব আয় কমেছে। রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্র জানায়, বুড়িমারী স্থলবন্দরের অধিকাংশ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের প্রায় ১২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ কারণে অধিকাংশের লাইসেন্সের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। চূড়ান্তভাবে এসব লাইসেন্স বাতিল করে নতুন লাইসেন্স দেওয়া হলে বন্দরটির ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। এ ছাড়া বন্দরটি দিয়ে ১৯টি পণ্য আমদানি-রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে এ বন্দর। লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, ‘বুড়িমারী স্থলবন্দর ভৌগোলিকভাবে অন্য স্থলবন্দর থেকে সবক্ষেত্রেই আলাদা। ভারত, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে সীমিত আকারে বাণিজ্য চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন। সেই চেষ্টাও চলছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow