Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩৩
ছিনতাই পরিবহন
মির্জা মেহেদী তমাল
ছিনতাই পরিবহন

রাজধানীর কাপ্তানবাজারের দুই মাছ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম এবং আলম। যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে মাছ কিনতে টিকাটুলি মোড় থেকে একটি বাসে ওঠেন। ওই বাসে চালকসহ চারজন লোক ছিল। গাড়িটি কিছুক্ষণ চলার পর চালকের নির্দেশে তিনজন লোক ছুরি ও চাপাতিসহ তাদের দুজনের সামনে যায়। ভয় দেখিয়ে বলে, তোদের কাছে যা আছে সব দিয়ে দে। তারা দেরি করায় একজন ছুরি দিয়ে আলমের পিঠের বাম পাশে আঘাত করে এবং তার সঙ্গে থাকা ৩২ হাজার টাকা এবং একটি সিম্ফোনি মোবাইল সেট ছিনিয়ে নেয়। এ সময় সে চিৎকার করার চেষ্টা করলে গাড়ির হেলপার ও কন্ডাক্টররা তার মুখে অস্ত্র ঠেকায়। তারা মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয় এবং জখম করে। পরে ছুরি ও চাপাতি দিয়ে দুই হাতে আঘাত করে তার কাছে থাকা ২৬ হাজার টাকাও ছিনিয়ে নেয়। গাড়িটি সায়েদাবাদ সেতুর কাছে এলে তাদের সেখানে নামিয়ে দেওয়া হয়।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আমানুল্লাহ। রাত সাড়ে ১১টায় বনানী থেকে রাস্তা পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাকলীর দিকে যাচ্ছেন। কিন্তু যানবাহন খুব একটা চোখে পড়ছে না। শুধু মানুষ আর মানুষ সেখানে। তিনি হাঁটতে হাঁটতে কবরস্থানের দিকে যাচ্ছেন। এমন সময় একটি খালি বাস তার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভিতর থেকে একজন টঙ্গী বলে ডাকছিলেন। দুজন লোক তাড়াহুড়ো করে বাসে চড়ে বসল। তাদের দেখাদেখি আমানুল্লাহও। আমানুল্লাহ ভাবছেন, যাক তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে বাসায়। ভাগ্যটা তার ভালো। বাসটি একটু সামান্য যাওয়া মাত্রই পেছনের সিট থেকে একজন তার কাঁধে হাত রেখে বলে, কী ভাই ভালো আছেন। খামাখা চিৎকার চেঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই। যা কিছু আছে বের করে দিলেই আমরা খুশি। এ কথা শুনে পাশের লোকের দিকে তাকিয়ে আমানুল্লাহ বলেন, দেখেছেন ভাই আমাকে কী বলছে এই লোকটা। কিন্তু যাকে বলছে সেই লোকটিও যে একই দলের সদস্য সেটা বুঝতে পারল তার কথাতে। লোকটি উল্টো বলল, যা বলছে, ঠিক মতো দিয়ে দে। নইলে গলা কেটে ফেলব। এ কথা বলেই লোকটি একটা চাপাতি দেখায় আমানুল্লাহকে। তিনি বুঝতে পারেন, ছিনতাইকারী চক্রের বাসে চড়ে বসেছেন তিনি। মাইক্রোবাসের যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা তাকে মারধর করতে থাকে। পকেট থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। ছিনিয়ে নেয় মোবাইল ফোনটাও। আমানুল্লাহ কাঁদতে থাকে। সবার পায়ে ধরে। কিন্তু কারও মন গলেনি। ভারী কোনো কিছু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে আমানুল্লাহর মাথা দিয়ে। ছিনতাইকারীরা তাকে বাস থেকে ফেলে দেয়। আমানুল্লাহ দেখতে পান, তিনি খিলক্ষেতে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। লোকজন এগিয়ে আসে। বাস ততক্ষণে হাওয়া। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে বাসায় যখন ফিরে তখন মধ্যরাত। আমানুল্লাহ ভাবে, রাতে তার এভাবে খালি বাসে চড়ে বসাটা ঠিক হয়নি। রাজধানীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত চলাচল করে বিভিন্ন বাস সার্ভিস। তবে মধ্যরাতে তাদের রূপ পাল্টে যায়, হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর, পরিণত হয় ‘ছিনতাই পরিবহনে’। বাসের হেলপার, কন্ডাক্টর ও চালক সবাই হয়ে ওঠেন ছিনতাই চক্রের সদস্য। দামি মোবাইল, ঘড়ি আছে এমন যাত্রী দেখে ‘আদর করে’ বাসে তুলে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মুহূর্তেই সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে মাঝপথে ধাক্কা দিয়ে ফেলে সামনে এগিয়ে যায় বাস। যাত্রীদের জিম্মি করে এভাবেই চলতে থাকে ভোররাত পর্যন্ত তাদের হিংস্রতা। সংশ্লিষ্টরা বলছে, রাজধানীতে কর্মব্যস্ত মানুষের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর অন্যতম সমস্যা হলো যানবাহনের স্বল্পতা। আর এই সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে নগরীতে ছিনতাইয়ের ফাঁদ পাতছে বেশ কিছু সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। বাসে যাত্রী পরিবহনের নামে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে এই ছিনতাইকারী চক্র। অফিস বা গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় অনেকটা অসাবধানতার কারণে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছেন যাত্রীরা। তবে পুলিশ বলছে আগের তুলনায় এ ধরনের ছিনতাইয়ের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। নগরীর বিভিন্ন সড়কের মোড়ে অফিসের শুরুতে বা শেষে হাজারো মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। পাবলিক পরিবহনের আশায় অপেক্ষা করতে হয় তাদের। গন্তব্যে পৌঁছাতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগায় ছিনতাইকারীরা। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সামনে দ্রুত গতিতে এসে থামে। স্বল্প সংখ্যক যাত্রী নিয়েই চলতে শুরু করে। বাসে লোক তোলা হয় টার্গেট করে। ছেড়ে যায় গন্তব্যের পথে। মাঝ পথে গিয়ে টের পাওয়া যায়, টার্গেট ব্যক্তি ছাড়া বাকি সবার ভয়ঙ্কর রূপ বেরিয়ে আসে। প্রথমেই টার্গেট ব্যক্তিকে দুই পাশ থেকে দুজন শক্ত করে ধরে বসে। পেছন থেকে বা পাশ থেকে আরেকজন মুখ চেপে ধরে। কাউকে মারধর, কারও চোখে বিষাক্ত মলম ও মরিচের গুঁড়া জাতীয় পাউডার মেখে দেয়। এতে টার্গেট ব্যক্তির চোখে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, অনেকটা বেহুশ হওয়ার মতো অবস্থা। একই সঙ্গে চলে শারীরিক নির্যাতন। ছোট ছোট রড জাতীয় বস্তু বা হাতুড়ি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড়ে ও জয়েন্টে আঘাত করা হয়। এরপর কেড়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা মোবাইল, মানিব্যাগ, ল্যাপটপ সবকিছু। এ ছাড়া সঙ্গে থাকলে এটিএম কার্ড ও মোবাইল ব্যাংক থেকে টাকাও তুলে নেয় সংঘবদ্ধ চক্র। এরপর সুযোগ বোঝে বাস থেকে ভুক্তভোগীকে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। রাজধানীর বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, মতিঝিল, নিউমার্কেট এলাকায় বেশ কয়েকটি ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow