Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০০
কঠিন রোগের শেষ চিকিৎসা
মির্জা মেহেদী তমাল
কঠিন রোগের শেষ চিকিৎসা

ফুটপাথ বা রাস্তার ধারে বৃত্তাকার লোকের জটলা, মাঝ থেকে মাইকে কারও গলা ভেসে আসছে। নানা অঙ্গভঙ্গিতে আকর্ষণীয়ভাবে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ এবং সর্বরোগ নিরাময়কারী ওষুধের কথা বলে যাচ্ছেন। তার সামনে হরেক রকমের গাছের বাকল, শিকড়, ফল বা কোনো প্রাণীর অঙ্গবিশেষ। লোকজনও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনছে। এ ধরনের দৃশ্য ফুটপাথ থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার, লঞ্চ-বাস-রেলস্টেশনসহ সর্বত্রই একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেকে এভাবে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে আপনার রোগ ভালো করতে না পারলে পুরো ওষুধের টাকা ফেরত দিয়ে দেব, এ গ্যারান্টি দিচ্ছি।’ এ ধরনের চটকদার কথাবার্তায় বা বিজ্ঞাপন দিয়ে সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করে ওষুধ কিনতে বাধ্য করায় এসব অপচিকিৎসাকারীর কোনো জুড়ি নেই। নিত্যনতুন পন্থায় তারা তাদের পণ্যের প্রচার চালিয়ে যান। ফুটপাথে মাইক দিয়ে নানা কথার তুবড়ি ছুটিয়ে এসব ব্যবসা চলে। পণ্য বিক্রি করা হয় বাসে, রেলস্টেশনে, মার্কেটে, মেলায়। প্রচারণা চালানো হয় লিফলেট দিয়ে। এসব লিফলেট আবার চলতি গাড়ির ভিতর ছুড়ে ফেলা হয়। এ ছাড়া পোস্টার, সাইনবোর্ড তো আছেই। এসব প্রচারণায় তারা যে শুধু সুচিকিৎসার দাবি করেন তা-ই নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ১০০ ভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এভাবে সমাজের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের তারা প্রলোভন দেখান। কেবল টিভি, ডিভিডি বা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে বড় বড় বিজ্ঞাপন ছাড়াও আকর্ষণীয় ছবির মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে সুশিক্ষিত মধ্যবিত্তদের, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তদেরও ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহককে বিভিন্ন পন্থায় আকর্ষণ করা হচ্ছে। কাল্পনিক রোগ আবিষ্কার করে, মানবদেহের স্বাভাবিকতাকে অসুখ হিসেবে প্রচার করে সেসবের ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। মূলত স্বল্পশিক্ষিত যুবক-যুবতী, যারা নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তাদের এভাবে আকর্ষণ করা হচ্ছে। ক্যান্সারে বা অন্য কোনো জটিল অসুখে আক্রান্ত মৃতপ্রায় রোগীর স্বজনের অসহায়ত্বকে ব্যবহার করতে ‘জীবনের শেষ চিকিৎসা’-জাতীয় স্লোগান ব্যবহার করে থাকেন। নিঃসন্তান দম্পতিদের মানসিক যাতনাকে পুঁজি করে তাদের সহজেই প্রতারিত করতে সক্ষম হন। এমনকি অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিও এভাবে প্রতারিত হন। তবে এসব অপচিকিৎসা কেন্দ্রের প্রতারণার মূল লক্ষ্য থাকে দরিদ্র শ্রেণির শিক্ষার আলোবিহীন মানুষজন, যাদের খুব সহজেই যে কোনো অলীক বস্তু বিশ্বাস করানো যায়। এদের স্বল্পমূল্যে সুচিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে নিয়ে আসা হয়, এরপর নানা বাহানায় টাকা নিয়ে কাল্পনিক ওষুধ দিয়ে সর্বস্বান্ত করে ছেড়ে দেওয়া হয়। জানা গেছে, ভেষজ বা হারবালের নামে মূলত স্বাস্থ্য ভালো করা তথা ওজন বাড়ানো, যৌন সমস্যা, হাঁপানি, বাত-ব্যথা, দাঁতের চিকিৎসা, অর্শ, গেজ, ভগন্দর, হেপাটাইটিস, এইডস, ক্যান্সার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। মূলত দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক অসুখ, যা ভালো হতে অনেক সময় লাগে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আরোগ্য হয় না, সেসব রোগই এঁদের লক্ষ্য। কেউ কেউ আবার এমন ওষুধও বিক্রি করেন, যা কি না সব রোগ ভালো করে থাকে।

‘আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে’র কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক রাকিবুল ইসলাম লিটু বলেন, এসব কাল্পনিক ওষুধে কোনো রোগ ভালো হয় না, তা বলাই বাহুল্য। এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এতে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ওষুধ নানা রকমের শিকড়-বাকড় ও লতাপাতা দিয়ে তৈরি করা হয়, হয়তো প্রস্তুতকারী নিজেও সেসবের নাম জানেন না। এসব খেয়ে অনেকেই পেটের পীড়া থেকে শুরু করে যকৃত ও কিডনির গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হন। মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অনেক সময় এসব ওষুধের উপাদান মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া ঘটায়, কখনো বা মারাত্মক অ্যালার্জি হয়, অনেক সময় পুরো শরীরের চামড়াই উঠে যেতে থাকে। এ ছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব অপচিকিৎসা করতে করতে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। বাছবিচারহীনভাবে ওষুধ সেবনের ফলে সৃষ্ট গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতার সৃষ্টি হয়। যে অসুখ একসময় নিরাময়যোগ্য ছিল, তা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, প্রচলিত চিকিৎসায়ও তা আর ভালো করা যায় না, চিকিৎসকদেরও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। বিশেষ করে, ক্যান্সারের চিকিৎসায় এটা প্রায়ই দেখা যায়। আমাদের অনেকের ধারণা, ক্যান্সার মানেই এর কোনো চিকিৎসা নেই। তাই কেউ কেউ ক্যান্সার হলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে এসব অপচিকিৎসাকারীর শরণাপন্ন হন। এতে মূল্যবান সময় অপচয় হয়। অথচ আধুনিক চিকিৎসায় অনেক ক্যান্সার এখন পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। শুধু সময়মতো না আসায় এদের অনেককেই আর ভালো করা যায় না। এ ছাড়া এসব চিকিৎসায় সর্বস্বান্ত হয়ে যখন রোগী হাসপাতালে আসেন, তখন দেখা যায় ন্যূনতম ওষুধ কেনারও সামর্থ্য নেই। এভাবে এসব হাতুড়ে চিকিৎসায় লাভ তো হয়ই না, বরং আরোগ্য লাভের পথও বন্ধ হয়ে যায়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow