Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪৪
চারপাশে কল স্পুফিং চক্র
মির্জা মেহেদী তমাল
চারপাশে কল স্পুফিং চক্র

শেরপুর জেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে একই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার মোবাইল ফোন নম্বর থেকে কল দিয়ে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দের কথা বলে ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন। সেই চেয়ারম্যান বিকাশের মাধ্যমে তা পাঠিয়ে দেন। পরে তাদের দেখা হলে নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি শুনে অবাক হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন উপজেলা চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনে ওই জেলার ডিসির মোবাইল ফোন নম্বর থেকে একটি কল যায়। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে ৫০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে চাওয়া হয়। টাকা পাঠানোর পর আবারও টাকা চাওয়া হলে মোবাইল ফোন নম্বরটি যাচাই করে উপজেলা চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন।

প্রতারক চক্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন কল স্পুফিংয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। শুধু ডিসি বা ইউএনও পর্যায়ের নম্বরই নয়, মন্ত্রী, এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণার বেশ কিছু ঘটনা ইতিপূর্বে ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে যে কারও মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণার কৌশল কয়েক বছর আগেই রপ্ত করেছে অপরাধীরা। বিশেষ সফটওয়্যার ও অ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইল ফোন নম্বর নকল করার এ পদ্ধতিকে বলা হয় ক্লোনিং। তবে এরই মধ্যে অপরাধীরা পাল্টে ফেলেছে প্রতারণার কৌশল। এবার তারা নিয়ে এসেছে স্পুফিং নামের আরেক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রতারকচক্রের কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন আইডি (পরিচয়) হাইড (গোপন) রাখা যায়। তবে স্পুফিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও নজরে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা গেছে বেশ কয়েকটি চক্রকে। কিন্তু এরপরেও চক্রের তৎপরতা থেমে নেই।  গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, স্পুফ অর্থ প্রতারণা করা বা ধোঁকা দেওয়া। আইটিজগতেও স্পুফিং অর্থ কোনো সিস্টেম বা ইউজারকে ধোঁকা দেওয়া। সাধারণত কোনো ইউজারের আইডি গোপন করে অথবা নকল করে স্পুফিং করা হয়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্পুফিং করা যায়।  সূত্র জানায়, সারা দেশে প্রতারকচক্রের সদস্য রয়েছে। তারা নতুন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই এদের কাজ। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, টিএনও এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ নম্বরের ‘ইয়েস কার্ড’ অ্যাপের মাধ্যমে কল স্পুফিং করে। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বর হুবহু নকল করে যে কাউকে ফোন করা যায়। দেশের আরও অনেকের মতো টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিও এ ধরনের প্রতারণার শিকার বলে জানা গেছে। ইতিপূর্বে বিটিআরসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, তাদের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয় প্রতারকচক্র। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের নম্বর এবং অবৈধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটিআরসির নিজস্ব ল্যান্ডলাইন অথবা মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে ব্যবহার করা হয়। প্রতারকচক্র জেনে নিচ্ছে সিম নিবন্ধনের তথ্য, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের পিন নম্বর এবং ব্যক্তিগত তথ্য। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিটিআরসি আরও জানিয়েছিল, বিটিআরসি থেকে কখনো এভাবে ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অথবা গোপন পিন নম্বর বা পাসওয়ার্ড চাওয়া হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মোবাইল ফোন নম্বর নকল করার এসব তৎপরতা রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে মোবাইল ফোনের মালিক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সচেতন হলে এ প্রতারকচক্রকে ধরা সম্ভব। র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গত দুই বছরে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আইজিপি, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের সিম ক্লোন করে অর্থাৎ হুবহু একই নম্বর থেকে কল করে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, বদলি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বরের নকল নম্বর থেকে কল করে তদবিরের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে এমন তথ্য পেয়ে মাঠে নামে পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা। এর আগেও বেশ কয়েকটি প্রতারকচক্র ধরা পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার স্পুফিং চক্র ধরা পড়েছে। গোয়েন্দা জালের ফাঁক গলে বেরিয়ে অপরাধ চালানোর লক্ষ্যেই স্পুফিং কৌশল বের করে প্রতারকরা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অস্বাভাবিক ফোনকল এলে বিচলিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকতে হবে। কথা শেষ হওয়ার পর ওই নম্বরে কল করলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। কারণ স্পুফিংয়ের মাধ্যমে কল করা যাবে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই নম্বরে কলব্যাক করলে সেটি আসল ইউজারের কাছেই যাবে। তখন আসল ইউজারের কাছে ব্যাপারটি জানতে চাইলে সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও অবহিত করা প্রয়োজন। সিম ক্লোনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow