বুধবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ টা

খুনেই খুনির পরিণতি

মির্জা মেহেদী তমাল

খুনেই খুনির পরিণতি

রেস্তোরাঁয় প্রচণ্ড ভিড়। বিকাল থেকে রাত অবধি রেস্তোরাঁর টেবিল ফাঁকা থাকে না। জায়গা না পেয়ে রেস্তোরাঁর বাইরেও গ্রুপ গ্রুপ করে আড্ডায় মেতে ওঠেন অনেকে। পরিবেশটা সেখানকার তুলনামূলক ভালো হওয়ায় মানুষের চাপ সেখানে একটু বেশি। হঠাৎ গুলির শব্দ! থামে কোলাহল। পিনপতন নীরবতা। লোকজন বুঝতে পারছে না। কোনার টেবিলের দিকে চোখ যায় সবার। এক তরুণ সেখানে দাঁড়িয়ে। উঁচু করে তোলা হাতে পিস্তল। মানুষ এবার আতঙ্কিত। শুরু হয় ছোটাছুটি। যে যেভাবে পারছে রেস্তোরাঁ থেকে পড়ি মরি করে ছুটছে। সবার লক্ষ্য রাস্তার দিকে। মুহূর্তে রেস্তোরাঁঁ ফাঁকা। মেঝের ওপর পড়ে কাতরাচ্ছে শুধু এক যুবক। রক্তে ভাসছে। অস্ত্র হাতে পাশে দাঁড়ানো তার ঘাতক। যুবকটি তার হাতের অস্ত্রটি আবারও রক্তাক্ত যুবকটিকে নিশানায় নিল। ট্রিগার টিপল। পর পর তিন রাউন্ড। মৃত্যু নিশ্চিত করে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল রেস্তোরাঁ থেকে। এরপর হোটেলের লোকজন আবারও ভিতরে ঢুকল। পুলিশ এলো। রক্তাক্ত সেই যুবকটির দেহে প্রাণ নেই। লাশ পাঠানো হলো মর্গে। এলিফ্যান্ট রোডের একটি রেস্তোরাঁয় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল মিরপুরের গুদারাঘাটের টিপুকে। পুলিশের খাতায় টিপুও ছিলেন সন্ত্রাসী। টিপু তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে এসে খুন হন। তার প্রতিপক্ষরা তাকে অনুসরণ করে। তাদের সুযোগ-সুবিধামতো তাকে খুন করে চলে যায়। পুলিশ তদন্ত করে। নানাভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে গোয়েন্দারা জানতে পারে অস্ত্রধারী সেই হিটম্যানের নাম তারেক। তারেক সম্পর্কে পুলিশের কাছে অতীত কোনো রেকর্ড নেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ঘটনা শুনে গোয়েন্দারা হতবাক। দুর্ধর্ষ কোনো হিটম্যান ছাড়া এমন প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পর হেঁটে হেঁটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করা সম্ভব নয়। কিন্তু হিটম্যান হিসেবে যার নাম আসছে, তার নাম গোয়েন্দারা সেবারই প্রথম জানল। ঘটনাটি ২০০১ সালের। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০০২ সালের পর আন্ডারওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত হতে থাকে। বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। খুন হন পুরান ঢাকার প্রভাবশালী শাহাদাত। পুলিশের তদন্তে আবারও সেই নাম তারেক। এবার গোয়েন্দারা তারেককে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। তাতে কি! তারেক তার কাজ বন্ধ রাখে না। সে সময় ঘটে একের পর এক খুন। মতিঝিলের দর্পণ, শাহজাহানপুরের রাজীব, আইনজীবী হাবিব মণ্ডল, আগারগাঁওয়ে এসআই হুমায়ুন কবির, ছাত্রলীগ নেতা তপন, আঁখি, কমিশনার খালেদ ইমাম খুনেও ঘুরেফিরে সেই তারেকের নাম! খুনের ধরন দেখে পুলিশ ও গোয়েন্দারা নিজেরাই হতবাক। এমন দুর্ধর্ষ খুনির নাম কেন আগে এলো না পুলিশের খাতায়। এ নিয়েও পুলিশের চিন্তার যেন শেষ নেই। গোয়েন্দারা জানতে পারে. তারেকের বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি অন্য কাউকে দিয়ে খুন করাতেন না। নিজেই খুনের কাজটি নিপুণ হাতে করতেন। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর গুলশান শপার্স ওয়ার্ল্ডের উল্টোদিকের রাস্তায় ফিল্মি কায়দায় যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যান। সিসি ক্যামেরার বদৌলতে যা দেশবাসী দেখেছে। এরপর থেকেই দেশবাসী চিনে তারেকের নাম। ঘাতক ওই যুবকের নাম তারেক। মিল্কি খুনের পর তারেক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধরা পড়েন উত্তরার একটি ক্লিনিক থেকে। এরপরই খিলক্ষেত এলাকায় র‌্যাবের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তার সহযোগীরা। গুলিবিনিময়ের এক পর্যায়ে নিহত হন পেশাদার এই কিলার তারেক। সংশ্লিষ্টরা বলছে, তারেক নিজে ভয়ঙ্কর খুনি হলেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। তাকেও মরতে হয়েছে অপঘাতে। একজন কিলারের শেষ পরিণতিও হয়ে থাকে একই পথেই।

এই রকম আরও টপিক

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর