Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ নভেম্বর, ২০১৮ ২৩:৫২
নিজের সনদ নিজেই সত্যায়ন
মির্জা মেহেদী তমাল
নিজের সনদ নিজেই সত্যায়ন

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে হল ছাড়ার পর মগবাজারে উঠেছেন কাঁকন। চাকরি খুঁজছেন। সরকারি- বেসরকারি যে কোনো ভালো চাকরি বিজ্ঞাপন দেখলেই আবেদন করেন তিনি। পিএসসির কয়েকটি আবেদন ব্যতীত প্রতিটি আবেদনপত্রে ছবি এবং সনদপত্রের ‘সত্যায়িত’ অনুলিপি চাওয়া হয়। প্রয়োজনীয় এ ‘সত্যায়িত’ করতে গিয়ে পাহাড়সম হয়রানি-দুর্ভোগে ভীষণ অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, এ শহরে প্রথম শ্রেণির কোনো সরকারি কর্মকর্তা আমায় ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। ফলে প্রতিটি আবেদনের জন্য আমার ছবি বা কাগজপত্র সত্যায়িত করতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। অনেক অনুরোধ করার পর কেউ কেউ সত্যায়িত করে দেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বিরক্তি প্রকাশ করে অপমানজনক কথা শুনিয়ে দেন। তাদের এ আচরণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। অবশেষে নিজেরটা নিজেই সত্যায়িত করি। চাকরি বা যে কোনো আবেদনপত্রে সত্যায়িত চাওয়া হয়। কারণ আবেদনপত্রে দাখিল করা ডকুমেন্ট সত্যি কিনা অথবা আসল ডকুমেন্টের অনুলিপি কিনা, সেটা একজন সাইন করে সাক্ষ্য দেবেন। সাক্ষী এমন ব্যক্তি হবেন যার সাক্ষ্য বিশ্বাস করার যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা এক্ষেত্রে অষ্টম গ্রেড থেকে তদূর্ধ্ব, বিশেষ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য, মেয়র বা স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যান, সরকারি অধ্যক্ষ, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সত্যায়নের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। দেশে লাখ লাখ চাকরি প্রার্থী রয়েছে যারা প্রতিদিন চাকরির আবেদন করার জন্য ছবি ও কাগজপত্র সত্যায়িত করতে ছোটেন সরকার নির্ধারিত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের পেছনে। শিকার হন সীমাহীন দুর্ভোগের। শুধু চাকরিই নয়, দেশে শিশু থেকে বয়স্ক পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় সব নাগরিককে লেখাপড়া, পাসপোর্ট আবেদন, বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নেওয়ার জন্য ছবি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ বিভিন্ন কাগজপত্র বাধ্যতামূলক সত্যায়িত করতে হয়। সরকার নির্ধারিত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার কাছে সত্যায়িত করতে গেলে ওই কর্মকর্তা ম্যানেজ করতে পারা রীতিমতো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হয়। এ সময় সরকারি ওই কর্মকর্তার কটু কথা বা বাজে আচরণও হজম করতে হয়। এ ছাড়া অনেকেই আবার সত্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকেন। এসব ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে অনেকেই ভুয়া ‘সত্যায়িত’ সিল মোহর বানিয়ে জাল সই দিয়ে নিজের সত্যায়িত ‘নিজেই’ করেন। ভুয়া সত্যায়ন ও সই জাল করার বিষয়ে কাঁকন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে আবেদনের জন্য ছবি ও কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গিয়ে একটি কলেজের শিক্ষকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। আমাকে কেউ ‘চেনেন না’ বলে সত্যায়িত করাতে পারিনি। পরে বাধ্য হয়ে একটি ভুয়া সিল বানিয়েছি। তিনি জানান, নীলক্ষেতসহ ঢাকা শহরের যে কোনো সিলপ্যাড  তৈরির দোকানে এসব ভুয়া সিল ৩০-৫০ টাকার বিনিময়ে  তৈরি করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক চাকরিপ্রার্থী ভুয়া সত্যায়ন বিষয়ে বলেন, বেশিরভাগ সরকারি চাকরিসহ যে কোনো চাকরির ক্ষেত্রেই আবেদনের সঙ্গে ‘সত্যায়িত’ কাগজপত্র জমা দিতে হয়। কিন্তু বিসিএস কর্মকর্তাদের ধরে সত্যায়িত করার যে দুর্ভোগ তা থেকে বাঁচতে কখনো জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হয়, যদিও সব কাগজপত্রই আসল। সত্যায়িত করতে দুর্ভোগ ও দায়িতপ্রাপ্তদের অনীহার কারণেই প্রার্থীরা বাধ্য হয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে এমন অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সত্যায়ন করার এখতিয়ার ও সত্যায়ন করতে সরকারি নির্দেশের পরেও কেন সত্যায়িত করতে চান না? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২৮ বিসিএস এর একজন শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, অপরিচিত কারও ছবি বা কাগজপত্র ‘সত্যায়িত’ করার নিয়ম নেই।

এ ক্ষেত্রে মূল কাগজপত্র উপস্থাপন করলেও ওই ব্যক্তি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত না হয়ে ‘সত্যায়িত’ করাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ  ওই ব্যক্তি যদি ‘সত্যায়িত’ করা কাগজপত্র নিয়ে কোনো রকম জালিয়াতির আশ্রয় নেন এবং তা নিয়ে যদি বড় ধরনের কোনো বিপত্তির সৃষ্টি হয় তাহলে এর দায়ভার সম্পূর্ণই এসে পড়বে আমাদের (সংশ্লিষ্ট ক্যাডার) ওপর। তাই ঝামেলা এড়াতে ‘সত্যায়িত’-এর ব্যাপারে আমরা একটু সচেতন থাকি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow