Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১১ নভেম্বর, ২০১৮ ২৩:২৭
নিজের হাতেই সর্বনাশ
মির্জা মেহেদী তমাল
নিজের হাতেই সর্বনাশ

হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম স্যার! আমি সোমা। বিকাশ অ্যাপস আপডেট ইউনিট থেকে বলছি। সাতসকালে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোন ধরতেই এক নারী কণ্ঠ পেলেন মোস্তাফিজুর রহমান। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেলস এক্সিকিউটিভ মোস্তাফিজুর রহমান আগে কখনো বিকাশ অ্যাপস আপডেট করার কথা শোনেননি। এবারই প্রথম শুনতে পেয়ে তিনি একটু অবাক হলেন। চমৎকার কণ্ঠের সেই নারীর কাছে তিনি বিষয়টি জানতে চান। তখন বিকাশ অ্যাপস আপডেট কর্মী সোমা বলতে শুরু করলেন। বললেন, আপনার বিকাশ অ্যাপস আপডেট করতে হবে। তাহলে সেন্ট মানি ফি কম এবং ক্যাশ আউটে ১৮.৫০ পয়সার বদলে ১০ টাকা হবে। আগ্রহ বাড়ে মোস্তাফিজুর রহমানের। মেয়েটি বলেন, স্যার, আপনি কি আর কোনো নম্বর ব্যবহার করেন? জবাবে বলেন, হ্যাঁ। মেয়েটি সেই নম্বর চান। আরেকটা নম্বর আপনার কেন প্রয়োজন। জানতে চান মোস্তাফিজুর। সোমা বলেন, স্যার বিকাশ নম্বরে কিছু কাজ করতে হবে। সেটি আপনাকেই করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমি  ইন্সট্রাকশন দেব ফোনে। তাই আরেকটা নম্বরে আমি ফোনে বলব, আর আপনি ইন্সট্রাকশন মতে কাজ করে নেবেন। তাতেই হয়ে যাবে। এ কথা শুনে মোস্তাফিজুর ভাবেন, যাক ভালোই। নিজেই যখন করব, এত ভাবনার কিছু নেই। তিনি তার ব্যবহারের আরেকটা নম্বর দেন। সেই নম্বরে কল দেন সোমা। ইন্সট্রাকশন দিতে শুরু করলেন।

সোমা তাকে বলেন, স্যার আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনে বাটনে চাপ দেবেন। আগে শুনুন বলছি। ভুল করা যাবে না স্যার। মোস্তাফিজুর একটু বিরক্ত হয়েই বলেন, আরে বলেন তো আপনি। ওকে স্যার প্রবলেম নেই। সোমা বলেন, স্যার, আপনি হ্যাশ টু ফোর সেভেন স্টার বাটন টিপে কল দিন। স্ক্রিনে যদি এইট পর্যন্ত ডিজিট লেখা থাকে, তাহলে অ্যাক্টিভ করে নিতে হবে। আর যদি ৯ পর্যন্ত লেখা থাকে তাহলে অ্যাক্টিভ করা আছে। মোস্তাফিজুর বাটন টিপে দেখেন আট পর্যন্ত আছে। তিনি সোমাকে বলেন। সোমা বলেন, দেখেন আটের নিচে একটা দাঁড়ির মতো নড়াচড়া করছে। ওখানে টাচ করুন। করেছেন স্যার! টাচ করে মোস্তাফিজুর বলেন, করেছি। সোমা বলেন, এখন আট স্টার ১ বাটন চাপুন। কী লেখা এলো জানাবেন একটু? মোস্তাফিজুর দেখলেন, স্ক্রিনে তার বিকাশ নম্বর লিখতে অনুরোধ আসছে। এটা জানালে সোমা নম্বরটি তাড়াতাড়ি লিখতে বলেন। লেখার সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে লেখা ওঠে, ‘এন্টার রিসিভার বিকাশ অ্যাকাউন্ট নাম্বার’। সোমা জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর এ তথ্যটি দেন তাকে। এরপর সোমা ১১ ডিজিটের একটি নম্বর দিয়ে তাকে সেন্ড করতে বলে কী লেখা আসে তা জানাতে বলেন। মোস্তাফিজুর লিখলেন। রেফারেন্স চাচ্ছে সেই নম্বর। সোমাকে জানিয়ে দেন। রেফারেন্সের ওপর টাচ করতে বলেন সোমা। মোস্তাফিজুরও তার কথামতো তাই করলেন। এরপর সোমা তাকে ১*২* লিখে বিকাশের গোপন নম্বরটি লিখতে বলেন। এও বলেন যে, কোথাও ভুল করা যাবে না। বলেই বলেন, সেন্ড করেছেন স্যার? মোস্তাফিজ বলেন, হ্যাঁ করেছি। সোমা জানতে চান, কী লেখা উঠেছে। মোস্তাফিজুর বলেন, হুম, এখানে সেন্ড মানি ৪৫০০ টাকা উঠেছে। সোমা বলেন, ব্যালেন্স কি ৫ ডিজিটের নিচে লেখা দেখাচ্ছে স্যার? মোস্তাফিজুর বলেন, আরে এখন ব্যালেন্স ১২৫ টাকা দেখাচ্ছে। সোমা বলেন, কোথাও একটু ভুল হয়েছে স্যার। সম্ভবত ভাইরাস মেসেজ গেছে। ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। স্যার আমি যে মেসেজ দিয়েছি, এগুলো এখন ডিলিট করে ফেলেন তাড়াতাড়ি। নইলে ক্ষতি হয়ে যাবে অ্যাকাউন্ট আর ফোনে। মোস্তাফিজুর দ্বন্দ্বে পড়ে গেছেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, তার বিকাশের পুরো টাকাটাই নিয়ে গেছে। ক্ষুব্ধ হচ্ছেন তিনি মেয়েটির ওপর। দুজনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কথা চলতে থাকে। মোস্তাফিজুর বলেন, সেন্ড মানি হয়ে গেল। মেয়েটি বলে, জি না, ওটা ৯নং অপশনে যোগ হয়েছে। মেসেজটি দ্রুত ডিলিট করেন। মেসেজটি ডিলিট করব কেন? মেসেজ ডিলিট না করলে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে ৩২০ টাকা করে কেটে নেবে। আর ৯ নম্বর অপশনটা দেখাবে না। আপনি মেসেজটি দ্রুত ডিলিট করেন। ডিলিট করলেই ৯ নম্বর অপশনটা স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। কী আর দেখাব। দেখে লাভ কী? আমার টাকাটা সেন্ড হয়ে গেল। জি না স্যার, ওটা ৯ নম্বর অপশনে যোগ হয়ে গেছে। মেয়েটি বলছে ডিলিট করতে, আর মোস্তাফিজুর বলছে করবে না। সোমা বলেন, মেসেজটি ডিলিট না করলে আপনার অ্যাকাউন্ট দেখাবে না এবং ৩২০ টাকা কেটে নেওয়া হবে। মোস্তাফিজুর চেক করে দেখেন, ৬ নম্বর অপশনটিও নেই। দুজনে তর্ক করতে থাকেন। একপর্যায়ে সোমা পরিচয় দেওয়া মেয়েটি বলেন, ডিলিট না করলে নাই। আপনার ব্যাপার। টাকা তো আর হাওয়া হয়ে যায়নি। ধরে নিন, আমার কাছেই এসেছে। এ কথা বলেই ফোনের লাইন কেটে দেয় সোমা। সেই নম্বরে চেষ্টা করতে থাকেন মোস্তাফিজুর। ফোন বন্ধ। আর কখনো খোলেনি সেই নম্বরটি। মোস্তাফিজুর ভাবে, নিজের হাতেই নিজের সর্বনাশ করলেন বিশ্বাস করে। অপরিচিত কেউ ফোন করে বলল, আর অমনি নিজের হাতেই নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ট্রান্সফার করে দিলেন। নিজেকে খুব বোকা ভাবছেন মোস্তাফিজুর। লজ্জায় এ ঘটনা কাউকে শেয়ারও করতে চাননি। মোবাইলে ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন করে এভাবে ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহক ও এজেন্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছে, এসব ক্ষেত্রে গ্রাহক বা এজেন্টদের সতর্ক হওয়া বেশি জরুরি। কেননা সিমের রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে তথ্যে গরমিল পাওয়া যায়। যে কারণে এমন কোনো ফোন এলে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে কথা বলা উচিত।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow