Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪৬
ওরা ভয়ঙ্কর দম্পতি
মির্জা মেহেদী তমাল
ওরা ভয়ঙ্কর দম্পতি

সবুজ মিয়া ও আসমা বেগম। বয়স ৪০ পেরিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ। আজ ঢাকায়, তো কাল চট্টগ্রামে। কাল চট্টগ্রামে তো দুদিন পর নতুন কোনো জেলায়। এভাবে মাস বছর কাটে তাদের জেলায় জেলায় ঘুরে। ঘুরে ঘুরে তারা মামলা করেন। কখনো চুরি, আবার কখনো ধর্ষণ মামলা। স্ত্রী আসমা ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন, আর স্বামী বাদী হয়ে মামলা করেন। তাদের টার্গেট নির্দিষ্ট নয়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। হোটেলবয় থেকে শুরু করে হোটেল মালিক, বাড়ির দরোয়ান, বাড়ির মালিক। এদের প্রত্যেকেই আসমাকে ধর্ষণ করেন আর বাদী হয়ে মামলা করেন স্বামী সবুজ মিয়া। পাহাড় থেকে সমতলে, সমানতালে মামলা করে যান এই দম্পতি। আসমা কেন শুধু ধর্ষণের শিকার হন! এমন প্রশ্নের জবাবে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এরা মামলা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। এই দম্পতি মামলা করাটাইকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় এমন হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করতে গিয়ে প্রথমবার ধরা পড়েন। ফাঁস হয়ে যায় তাদের মামলার নেপথ্য কাহিনী। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে, সবুজ মিয়া এবং আসমা বেগম রীতিমতো ভয়ঙ্কর দম্পতি। জেলায় জেলায় নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করাই তাদের পেশা। কদিন আগের ঘটনা। এক দিন বিকালে আসমা এবং তার স্বামী যান কোতোয়ালি থানায়। থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন নগরীর লালদীঘি এলাকার একটি হোটেলের বয় আসমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের অভিযোগের সঙ্গে মুখের কথায় গরমিল খুঁজে পান পুলিশ কর্মকর্তারা। সন্দেহ হয়। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তারা শিকার করেন তাদের ভয়ঙ্কর প্রতারণার কথা।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এই দম্পতি জানিয়েছেন- তারা এমন ভয়ঙ্কর প্রতারণা করে আসছে সেই ২০০৫ সাল থেকে। তারা প্রথমে মধ্যম মানের হোটেলে যান। সেখানে বাইরে বেরুনের কথা বলে চাবি ম্যানেজারের কাছে দিয়ে যান। এরপর এসেই অভিযোগ করে বসেন, তাদের রুমে নগদ টাকা রাখা ছিল, তা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে হোটেল কর্তৃপক্ষ মালিকের মধ্যস্থতায় টাকার বিনিময়ে আপস করে ফেলেন। কিন্তু আপসে না এলে সেই হোটেলের মালিক কিংবা বয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তোলেন। মামলা করেন থানায় গিয়ে। এরপর আদায় করেন মোটা অংকের টাকা। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, এই দম্পতির প্রতারণামূলক মামলার সন্ধান পাওয়া গেছে ঢাকা, বাগেরহাট, নেত্রকোনা এবং রাঙামাটিসহ বিভিন্ন জেলায়। প্রত্যেক জেলা থেকে মামলা করে প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গত ৬ মাস আগে চট্টগ্রামের স্টেশন রোডের একটি হোটেল থেকে একই কায়দায় ১২ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এক জেলায় বেশি মামলা করলে সন্দেহ হতে পারে, তাই তারা এক জেলায় বেশি দিন থাকেন না। চট্টগ্রামেও বেশি দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল না। দুই-একটি মামলা করেই অন্য জেলায় সটকে পড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। প্রতারণার অভিযোগে এই দম্পতিকে গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ। অপরাধে অন্যভাবে জড়িয়েছে চট্টগ্রামের আরেক দম্পতি কামাল-তানিয়া। স্বামী কামাল বিত্তশালী মানুষদের টেলিফোন নম্বর সংগ্রহ করে। আর স্ত্রী তানিয়া সেই নম্বরে ফোন করে ফাঁদ পাতে প্রেমের। নতুন প্রেমিকের সঙ্গে এক সময় দেখা করার আবদার করে প্রেমিকারূপে থাকা তানিয়া। ভালোবাসার মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসার পরই স্বরূপে ফিরে তানিয়া। অশ্লীল ছবি তুলে প্রেমিকের কাছ থেকে দাবি করে মোটা অংকের টাকা। কামাল-তানিয়া দম্পতির এ ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন অনেক বিত্তবান। সঞ্জয়-মায়া দম্পতি জড়িত ভিন্নরকম অপরাধে। স্বামী-স্ত্রীর বাইরে তাদের অন্য পরিচয় হচ্ছে চোর দম্পতি। আবাসিক এলাকার বিলাসবহুল বাড়িতে স্ত্রী মায়া রানী সেনকে ‘কাজের বুয়া’ হিসেবে পাঠায় স্বামী সঞ্জয় কুমার সেন। এরপর স্ত্রীকে দিয়ে পাতে চুরির ফাঁদ। এক সময় বাড়ির সবাইকে অচেতন করে মায়া। আর স্বামী সঞ্জয় তার দলবল নিয়ে লুট করে টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। ৪৬ বছরের ইসমাইল ও ৪০ বছরের সালমা বেগম সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী হলেও মিলেমিশে করছে ইয়াবা ব্যবসা। বিভিন্ন হোটেলে ইয়াবা সরবরাহ করে সালমা। তার আগে হোটেলে গিয়ে ক্রেতা ঠিক করে আসে ইসমাইল। এভাবে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চালায় সর্বনাশা মাদক ইয়াবার ব্যবসা। আবার ভুয়া ডাক্তার উজ্জল কান্তি ধর ও তার স্ত্রী চিত্রা সরকার অপরাধ করছে ডাক্তার সেজে। চট্টগ্রামের গোলপাহাড় মোড়ে ফিজিওথেরাপির ক্লিনিক খুলে বসে এ দম্পতি। সেই ক্লিনিকে স্বামী উজ্জল কান্তি হয় ডাক্তার। আর স্ত্রী চিত্রা সরকার হয় তার সহযোগী। এ দম্পতির ভুল চিকিৎসায় মরণদশা হয়েছে অনেক রোগীর। তাই র‌্যাব অভিযান চালিয়ে পাকড়াও করে এ দম্পতিকে। সমাজবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, মূল্যবোধ ক্রমেই কমতে থাকায় মানুষ পবিত্র সম্পর্ককে নষ্ট করে জড়িয়ে পড়ছে সামাজিক অপরাধে। যেসব স্বামী-স্ত্রী অপরাধে জড়াচ্ছে তাদের সন্তানরাও স্বাভাবিকভাবে অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ধারণ করবে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তার মারাত্মক রূপ দেখবে সমাজ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow