Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫৪
মাছশূন্য হয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর
মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
মাছশূন্য হয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর

হুমকির মুখে পড়েছে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য ভাণ্ডার। বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্রাতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, মাছ শিকারে ‘পেডিকোট’ জাল ব্যবহারসহ নানান কারণে দিনকে দিন কমছে সাগরের মৎস্য প্রজাতি ও পরিমাণ। তাই গাণিতিক হারে কমছে এবং শেষ হয়ে আসছে সাগরের মৎস্য ভান্ডার। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় থাইল্যান্ডের ‘গালফ অব থাইল্যান্ড’-এর পরিনীতি বরণ করে বঙ্গোপসাগরও মৎস্য শূন্য হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)-এর সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, নানান কারণে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য

ভান্ডার হুমকির মুখে পড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ‘গালফ অব থাইল্যান্ড’-এর পরিস্থিতি বরণ করে মাছ শূন্য হয়ে পড়বে বঙ্গোপসাগর।’ এ পরিস্থিতি উত্তরণে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে একটি পরিকল্পিত ফিশারিশ ম্যানেজমেন্ট তৈরি করতে হবে। যাতে মৎস্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধি থাকবে। এ ছাড়া সাগর থেকে মাছ আহরণ ও ফিশিং ট্রলারের সংখ্যা কমাতে হবে।’ বঙ্গোপসাগরের মৎস্য ভান্ডারে ওপর গবেষণা চালাতে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদফতর ‘বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’ নামে প্রকল্প গ্রহণ করে। ওই প্রকল্পের আওতায় গত দুই বছর ধরে বঙ্গোপসাগরে গবেষণা চালাচ্ছে ‘আরভি মীন সন্ধানী’। ওই গবেষক দলের ক্রুজ লিডার অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী বঙ্গোপসাগরের বর্তমানের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য মতে- আরভি মীন সন্ধানী গবেষণার অংশ হিসেবে গত দুই বছরে ৩২০ বার সাগরে জাল ফেলা হয়। এ সময় ৪০২টি প্রজাতির মাত্র ৬ টন মাছ ধরা পড়ে। যার মধ্যে ৩১১টি প্রজাতির মাছ মাত্র ৫ বার পাওয়া গেছে। ৩১১টি প্রজাতিই ওজন ছিল আধা কেজির কম। এ সময় দেখা যায় সাগরে আহরণ যোগ্য মাছের প্রজাতি রয়েছে সর্বোচ্চ ৫০টি। ৩২০ বার জাল ফেলে মাত্র একটি লাক্ষ্যা মাছ পাওয়া যায়। প্রত্যেকবারে লইট্টা, ছুরি, রঙ্গিল, রূপচান্দা, সুরমা, কাউয়াসহ ছোট প্রজাতির মাছগুলো বেশি আসে। অপরদিকে কোরাল, লাক্ষ্যা, কাইল্লা, বড় সুরমাসহ দামি ও বড় মাছগুলো পাওয়া যাচ্ছে কম। অথচ ১৯৮০ সালে সাগরে একই পরিমাণ জাল ফেলা হলে আহরণ করা যেত কমপক্ষে ৬০০ টন মাছ। এ সময় পাওয়া যেত কোরাল, লাক্ষ্যা, সুরমাসহ বড় প্রজাতির মাছ। ওই সময় সাগরে মাছের প্রজাতিও ছিল ৪৭৫টি।

গবেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ করে সাডিন মাছের পরিমাণ বেড়েছে। সাডিন মাছ বেড়ে যাওয়া যে কোনো খুশির খবর নেই। বরং এটা দুসংবাদ। কারণ সাডিন মাছকে অন্য যে মাছগুলো খেত, সেগুলো হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথবা পরিমাণে কমে গেছে। তাই সাডিনের সংখ্যা বেড়ছে সাগরে।

জানা যায়, মাত্রা অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের কারণে থাইল্যান্ডের ‘গালফ অব থাইল্যান্ড’ মাছ শূন্য হয়েছে। থাইল্যান্ডে ১৯৬০ সাল থেকে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ শুরু হয়। তখন একটি ট্রলারে করে এক ঘণ্টা মৎস্য আহরণ করলে মাছ পাওয়া যেত ২৭০ কেজি। ১৯৯০ সালে যা কমে হয় মাত্র ১৮ কেজি। ২০১৮ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক কেজি। ‘গালফ অব থাইল্যান্ড’-এর একই পরিণীতি ঘটতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। ১৯৮৭-৮৮ সালে যে মাছ পাওয়া যেত বর্তমানে তার ১০ ভাগের এক ভাগ মাছ পাওয়া যায়। চবি’র সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, মাছ হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের একমাত্র সম্পদ, যে সম্পদ বাচ্চা দেয়। আর কোনো সম্পদ বাচ্চা দেয় না। তাই এ সম্পদের দিকে নজর দিতে হবে। এটি একমাত্র সামুদ্রিক সম্পদ যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ করতে পারবে। তিনি বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক বঙ্গোপসাগরের জন্য বড় একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যা জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছর এ সেক্টরের ম্যানেজমেন্টগুলো উন্নয়ত করবে।’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow