Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ২৩:১৮
হৃদরোগ ইনস্টিটিউট
যেন রোগীর ডাম্পিং স্টেশন
শামীম আহমেদ
যেন রোগীর ডাম্পিং স্টেশন

শীতের রাতে আবছা আলোর মেঝেতে চাদর বিছিয়ে জবুথবু হয়ে শুয়ে রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বারান্দায় হাঁটতে গেলে পায়ে লাগছে মৃত্যুপথযাত্রী রোগী বা তার স্বজনের শরীর। এদিক-ওদিক থেকে ভেসে আসছে যন্ত্রণায় রোগীর কাতরানোর শব্দ। আবার সিঁড়ির এক কোণে দেখা মেলে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় শুয়ে রয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ। পাশে শীত উপেক্ষা করে জীর্ণ কাপড়ে বসে আছেন তার স্ত্রী। অসুস্থ স্বামী নড়ে উঠলেই তিনি জড়িয়ে ধরেন। গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ পর পরই দোতলার করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) সামনে থেকে ভেসে আসা স্বজন হারানো মানুষের আহাজারিতে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। কখনো সিসিইউ থেকে, কখনো বারান্দা থেকেই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না পেয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আসা অনেক মানুষ। গত সোমবার রাতে হৃদরোগ হাসপাতাল সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। রোগীর তুলনায় পর্যাপ্ত শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকার পরও বিশেষায়িত এই হাসপাতালটিই হৃদরোগে আক্রান্তদের শেষ ভরসার স্থান। প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন সহস্রাধিক রোগী। যাদের অনেকেরই অবস্থা শংকটাপন্ন। চিকিৎসকরা দেখে প্রয়োজন মনে করলে ভর্তি করান। তবে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় রোগীর জায়গা হয় মেঝেতে। সীমিত শয্যার কারণে এই শীতের মধ্যেও অনেক শংকটাপন্ন রোগীর স্থান হয়েছে সিসিইউর মেঝেয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৪১৪ শয্যার এই হাসপাতালে এখনো প্রায় হাজারখানেক রোগী ভর্তি রয়েছেন। বহির্বিভাগ ও জরুরি মিলে প্রতিদিন সহস্রাধিক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ জন ভর্তি হচ্ছেন। অথচ এই সংখ্যক রোগী প্রতিদিন ছাড়পত্রও পাচ্ছেন না। মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকায় চাইলেই যেমন হৃদরোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া যাচ্ছে না। তেমনি আবার জটিল নতুন রোগীকে ফিরিয়েও দেওয়া যায় না। ফলে রোগী দিন দিন বেড়েই চলেছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় যেখানেই ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই তাদের রাখা হচ্ছে। হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি ওয়ার্ড, সিসিইউ, পিসিসিইউ, ভিআইপি কেবিনের সামনের মেঝে ও বারান্দায় অনেক রোগী। যে যেখানে পেরেছেন চাদর বা মাদুর বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। সহস্রাধিক রোগীর সঙ্গে রয়েছেন দ্বিগুণেরও বেশি স্বজন। আর ৫০-৫৩ শয্যার একেকটি ওয়ার্ডে ভর্তি দুই শতাধিক রোগী। জরুরি রোগীকে বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্র সিসিইউর মেঝেও চাদর বিছিয়ে জায়গা হয়েছে অনেকের।

পোস্ট করোনারি কেয়ার ইউনিটের (পিসিসিইউ) মধ্যে গাদাগাদি করে আছেন তিনগুণেরও বেশি রোগী। পুরো হাসপাতাল যেন রোগীদের ‘ডাম্পিং স্টেশন’।  এদিকে ফ্লোরে-বারান্দায় ঘুরে ঘুরেই সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ফলে অনেক শংকটাপন্ন রোগীও শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। সোমবার রাত ৮টা থেকে তিন ঘণ্টায় তিনজনের মৃত্যু হয় এই হাসপাতালে। এছাড়া দৈনিক এখানে ১৫ থেকে ১৬ জন রোগীর মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এখানে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা ছাড়াও দক্ষ চিকিৎসক এবং যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে মফস্বল থেকেও প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী এখানে আসছেন। খুব শিগগিরই এ সমস্যা দূর হবে। গত বছরের ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই হাসপাতালের ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন (ঊর্ধ্বমুখী) কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার পর কাজ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। হাসপাতালের শয্যা, কেবিন, আইসিইউ, সিসিইউ, ক্যাথল্যাব এবং ওটি কমপেক্স সুবিধা দুই থেকে তিনগুণ বাড়ছে। লোকবলও বাড়ানো হচ্ছে। চলতি বছরেই বর্ধিত ভবনে চিকিৎসাসেবা শুরু হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow