Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : ১৪ মার্চ, ২০১৭ ০৪:৫১ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ১৪ মার্চ, ২০১৭ ১৩:৩৯
ঘুমের যত সমস্যা ও সমাধান
অনলাইন ডেস্ক
ঘুমের যত সমস্যা ও সমাধান
প্রতীকী ছবি

ঘুমের সমস্যা অনেক বড় সমস্যা নয়। নিয়মিত ঘুম না হলে শরীর এবং মন দুটোই খারাপ থাকে।

সকালে উঠে যদি মনে হয় ঘুম হয়নি, সতেজ মনে হচ্ছেনা নিজেকে তখন ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো। কম ঘুম হওয়া বেশ বড় সমস্যা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দুটোরই ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। ঘুম কম হলে বিপদ। দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব অনেক খানি।  

গবেষকরা দেখেছেন, ঘুম কম হলে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে মোটর কার দুর্ঘটনা হয় বেশি, সম্পর্কে ফাটল ধরে, কর্মক্ষেত্রে পারফোরম্যান্স খারাপ হয়, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা হয়, স্মৃতিসমস্যা হয়, মনমেজাজ খারাপ থাকে। আরও বলা হয়ে থাকে আজকাল ঘুমের সমস্যার জন্য কিছুটা হলেও পরিণতিতে হতে পারে হৃদরোগ, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মত রোগ।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন সিস্নপ ডিসওর্ডারস। নিদ্রাবৈকল্য। অবশ্য এই বিকল হওয়ার ধরন অনুযায়ী উপসর্গের হয় তারতম্য। যেমন: দিনে ঘুমে ঢুলু ঢুলু ভাব, ঘুমিয়ে পড়তে সমস্যা নয়ত ঘুমিয়ে থাকতে সমস্যা, নাক ডাকা, শুয়ে থাকলে পায়ের বেজায় নড়াচড়া, ছোড়াছুড়ি, নয়ত রাতে পায়ে অস্বান্তি অনুভব।

ঘুম চক্র:
ঘুম আছে দু'রকমের। রেম-সিস্নপ ও নন-রেম সিস্নপ। রেম (জঊগ) মানে রেপিড আই মুভমেন্ট। ঘুমের এ পর্যায়ে স্বপ্ন দেখে মানুষ। এসময় অাঁখি তারা নড়ে চড়ে দ্রুত। স্বাভাবিক ঘুম চক্রের শতকরা ২৫ ভাগ জুড়ে থাকে রেম-সিস্নপ। সকালের দিকে ঘুমের এই পর্যায়টি বেশি করে আসে। ঘুমের বাকি সময় জড়ে নন-রেম সিস্নপ। এর চারটি পর্যায়: হালকাঘুম (প্রথম পর্যায়) থেকে ধীরে ধীরে গাঢ় ঘুমে শেষ। (চতুর্থপর্যায়) স্বাভাবিক নিদ্রা চক্রে ঘটে ব্যাঘাত আর তখন রাতে সুনিদ্রা হয় সমস্যা।

কতটুকু ঘুম যথেষ্ট:
ব্যক্তিভেদে ঘুমের চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে। তবে সাধারণভাবে- ছোট বাচ্চাদের জন্য ১৬ ঘণ্টা, টিনএজারদের জন্য ৯ ঘণ্টা, পূর্ণ বয়স্কদের জন্য ৭-৮ ঘণ্টা। আবার অনেক পূর্ণবয়স্ক লোক রাতে ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে বেশ সতেজ থাকেন আবার ঘুম প্রয়োজন হয় অনেকের ১০ ঘণ্টাও।

অনিদ্রা:
হয়ত কোনো এক রাতে ঘুম হলোনা, এটি তেমন কোনো সমস্যা না। কিন্তু এই বিনিদ্র রাত যদি চলতেই থাকে রাতের পর রাত তাহলে তো একে অনিদ্রা বলতেই হয়। যাদের অনিদ্রা হয় এরা ঘুমিয়ে পড়ার আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেগে থাকেন, এরপর একটু লাগে চোখের পাতা। হয়ত জেগেও উঠেন তাড়াতাড়ি আর ঘুম হয়না। অনেকের রাতে বার বার ঘুম ভাঙ্গে। ঘুমের বড় সমস্যা হলো অনিদ্রা। তিন জনে একজনের এ সমস্যা হয় জীবনের কোন না কোন সময়।

অনিদ্রা ও নিদ্রা বিধি:
নিদ্রা বিধি ভালো করে পালন না করলেও অনেক সময় অনিদ্রা হয়। বদভ্যাস অনেক রকম। যেমন বিকেলে বা সন্ধ্যায় কফি পান, ধূমপান। শুতে যাবার আগে ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার ভরপেট খাওয়া, প্রতি রাতে বিভিন্ন সময় শয্যায় যাওয়া। টেলিভিশন অন রেখে ঘুমিয়ে পড়া। এসব অভ্যাসে অনিদ্রা হতেই পারে।

অনিদ্রা ও মানসিক রোগ:
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে অনিদ্রা হতে পারে। থাকতে পারে বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, আঘাত উত্তর মানসিক চাপ-আর সেকারণে বিনিদ্র রজনী যাপন। অনেক সময় ওষুধও সমস্যা করে। তাই চাই ডাক্তারের পরামর্শ।

অনিদ্রা হতে পারে অন্যান্য রোগের কারণেও:
আথ্রাইটিস, বুক জ্বলা, ক্রনিক ব্যথা বেদনা, অন্য কারণে, হাঁপানি রোগ সিওপিডি, স্বাস্থ্য স্বাশযন্ত্রের ক্রনিকরোগ হৃদযন্ত্র বিকল ইত্যাদি।

অন্যান্য কারণে অনিদ্রা:
গর্ভকালে মেয়েদের অনিদ্রা হতে পারে বিশেষ করে প্রথম ও তৃতীয় ত্রৈমাসে এই সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে ঋতু বন্ধের আগে আগে যখন উষ্ণ মলক হয় তখন ঘুমের হয় জ্বালা। আর বয়স পয়ষট্টি পেরুলে স্ত্রী পুরুষ দুজনেরই হয় ঘুমের জ্বালা। যারা শিফটে কাজ করেন এদেরও হয় ঘুমের সমস্যা, ছন্দচ্যুতি ঘটে দৈনন্দিন। যে দেহঘড়ি ঘুম, হরমোন উৎসার, অন্যান্য দৈহিক কাজ নিয়ন্ত্রক করে সেই দেহঘড়ি হতে পারে বিপর্যস্ত।  
ঘুমে বোবায় ধরে। একে বলে স্লিপ এপ্নিয়া। এদের ঘুমের মধ্যে বারবারই শ্বাস যায় বন্ধ হয়ে। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। এতে গাঢ়ঘুম থেকে হালকা ঘুমের মধ্যে চলে যান এরা। এরকম ব্যাঘাত ঘটে বলেই এদের অনেকের হয় দিনে ঘুমে চোখ ঢুলু ঢুলু। স্লিপ এপনিয়া আছে বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসরোধ হয়, এমন কথা অনেকে জানেননা। এদের নাক ডাকা সতর্ক সংকেত বটে। শয্যাসঙ্গী বুঝতে পারেন। শ্বাসরোধ হলো, এইমাত্র, তক্ষণি বড় গর্জন নাসিকার।

স্লিপ এপনিয়ার ঝুঁকি:
এসমস্যা বেশি হয় পুরুষের। স্থূল লোকের ও ৬৫ উদ্ধ মানুষের। হিসপানিক, আফ্রিকান-আমেরিকান, প্যাসিফিক দ্বীপবাসীদের এসমস্যা হয় বেশি। পূর্ণবয়স্কদের এ সমস্যা বেশি হলেও বাচ্চা যাদের টনসিল বড়ো এদেরও সমস্যা হয় বেশি।

অশান্ত অস্থির পদযুগল:
একে বলে 'রেস্টলেস্ লেগ্ সিনড্রোম'। যাদের এ সমস্যা হয় এরা বিশ্রামের সময় বা স্থির থাকার সময়ও পায়ে অস্বস্থি অনুভব করেন এর পা'কে নড়াচড়া করার তাগিদ অনুভব করেন। সমস্যা বেশি হয় সন্ধ্যায় নয়ত রাতে। তাই ঘুমিয়ে পড়তে সমস্যা হয়। অনেকের আবার ঘুমের সময় পায়ে ছোট ছোট খিচুনি হয় তাই ঘুম ভাঙ্গে বারবার। ঘুমে এরকম পা ছোড়াছুড়ি করলে সঙ্গীরই কি ভালো লাগবে।

নিদ্রান্দুতা:
একে বলে নার্কোলেপসি। দিনে প্রচণ্ড ঘুম। কুম্ভর্কর্ণ যাকে বলে। রাতে পুরো ঘুমিয়েও এরা দিবানিদ্রা ছাড়া কাজই করতে পারেনা। আরও লক্ষণ আছে। প্রথম ঘুমে থেকে জেগে উঠলে নড়তে চড়তে অসুবিধা। তীব্র আবেগে পেশি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। দিবানিদ্রার মধ্যেও স্বপ্ন দেখা। ঘুমিয়ে পড়লে বা জেগে উঠলে স্বপ্ন দেখার মত আমুল প্রত্যয়। যাদের এমন প্রবল ঘুমের সমস্যা এরা ঘুমিয়ে পড়লেই অবিলম্বে প্রবেশ করেন রেম স্লিপের পর্যায়ে, প্রয়োজন হয়না নন-রেম স্লিপের।

ঘুমের মধ্যেও হাটে যারা; স্লিপওয়াকিং:
ঘুমের এমন সমস্যা যাদের, এরা সত্যি সত্যি ঘুমের মধ্যে উঠে হাটতে থাকেন। নন রেম স্লিপের গভীর পর্যায়ে ঘটে এমন ঘটনা আর না জেগে উঠেও এরা করতে পারেন নানান কাজকর্ম। নিদ্রাকালে হাটেন যারা এরা কোনও প্রশ্ন করলে সাড়া দেননা, আর জেগে উঠলে এদের মনে থাকেনা, কি কর্ম তারা করেছেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। বাচ্চাদের মধ্যে সিস্নপ-ওয়ার্কিং বেশি, আবার বড় হলেও অনেকের তা থেকে যায়।

কখন ডাকবেন ডাক্তার:
ঘুমের অনেক সমস্যা নিজে নিজেও মোকাবেলা করা যায়, তবে কিছু সমস্যা আছে যখন ডাক্তার ডাকতে হয়। ঘুমের সময় যদি বোবায় ধরে, প্রচন্ড নাসিকা গর্জন হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো। যদি কোনও অন্য অসুখ বা ওষুধের জন্য রাতে ঘুম হয়না, যদি সব সময় ক্লান্ত থাকে শরীর, যদি দিবাকালেও নিদ্রায় থাকে চোখ ঢুলু ঢুলু তাহলে ডাক্তার দর্শণ অবশ্য।

ঘুমের ডায়েরী:
ঘুমের দিন লিপি রাত্র লিপি করলে হয়। এক থেকে দুই সপ্তাহ। বোঝা যাবে নিদ্রার অভ্যাস এবং- শুতে যাবার সময়, উঠার সময়, কতক্ষণ ঘুম হল, কেমন ঘুম হলো। রাতে কতবার ঘুম থেকে উঠতে হল। রাতে কতসময় জাগরনে থাকা হল। কখন চা কফি পান করা হল, কি খাওয়া হলো, পান করা হল। আবেগ ও মানসিক চাপ।  

ঘুমের সমস্যা নির্ণয়:
সমস্যা নির্ণয় করতে হলে ডাক্তার জিজ্ঞাসা তো করবেনই ঘুমের অভ্যাস কি রকম। আছে কিনা অন্য কোন অসুখ। তখন পরামর্শ দেওয়া হবে কোনও স্লিপ ক্লিনিকে যেতে। ঘুম পরীক্ষার জন্য আছে যে যন্ত্র এর নাম 'বালিসমনোগ্রাম'- ঘুমের সময় এই যন্ত্র রেকর্ড করে মগজের কাজকর্ম, চোখের নড়াচড়া এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে। এমন ধরনে দেকে সিস্নপ এপনিয়া নির্ণয় করা যায়। আছে ৮৫ রকম ঘুমের সমস্যা-কতই বা জানি আমরা। বিশেষজ্ঞ এমন ক্লিনিক এদেশে এখনও গড়ে উঠেনি অবশ্য।

চিকিৎসাও তো চাই:
স্লিপ এপনিয়ার জন্য সিপিত্রপি কৌশল-এটি বাড়িয়ে দেয় বায়ুর চাপ। যাতে বায়ুপথ থাকে খোলা। এতে রোগী ঘুমের সময় শ্বাসক্রিয়ার অবরোধ ছাড়াই থাকতে পারেন ঘুমে নিশ্চিত। নার্কোলেপসিও রেসটলেস্ লেস্প সিনড্রোমের জন্য জীবনার্ব্ধণে পরিবর্তনও ওষুধ। অনিদ্রার জন্যও আছে ওষুধ, প্রয়োজনে। তবে অনেকইে নিদ্রা অভ্যাস পরিবর্তন করে, জীবনাচরণে আদলবদল ঘটিয়ে অনিদ্রাকে মোকাবেলা করেন বিনা ওষুধেই।

ভারি চিকিৎসা: কননিটিভ বিহেভিয়ার্যাল থেরাপি:
ঘুমের দুশ্চিন্তা থেকে অনিদ্রা-একে মোকাবেলার অন্য উপায়ও আছে। রিলাক্সেশন ট্রেনিং। বায়োফিডব্যাক। এদের সহায়তায়, প্রশান্ত হয় দেহ মন। সুস্থির হয় হৃদযন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া ও পেশির কর্ম। মেজাজ হয় ভালো। আলাপন টক্ থেরাপি করে শয্যাকালীন দুশিন্তার বদলে রোগীর মনে প্রবেশ করানো যায় ইতিবাচক চিন্ত্রাভাবনা। রাতে মন হয়ে যায় সুস্থির, প্রশান্ত। এগুলোকে বলে কগ্নিটিভ বিহেভিয়ারেল থেরাপি, সেসঙ্গে ওষুধ-ক্রনিক অনিদ্রা সমাধানে বেশ সফল।

নিদ্রাবিধি-স্লিপ হাইজিন:
ঘুম আনে এমন সব অভ্যাসকে রপ্ত করা হলো স্লিপ হাইজিন। এই পরিকল্পনার একটি অংশ হলো নিয়মিত ব্যায়াম, তবে কোন সময়ে করবেন তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

বিডি প্রতিদিন/১৪ মার্চ ২০১৭/হিমেল

আপনার মন্তব্য

up-arrow