Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : ১৬ জুলাই, ২০১৬ ১৯:২৮
আপডেট : ১৬ জুলাই, ২০১৬ ১৯:২৯
শ্মশানভস্ম মাখেন, নগ্ন থাকেন, মৃতদেহ খান, তবুও অঘোরীরা পূজিত হন কেন?
অনলাইন ডেস্ক
শ্মশানভস্ম মাখেন, নগ্ন থাকেন, মৃতদেহ খান, তবুও অঘোরীরা পূজিত হন কেন?

‘অঘোরী’ শব্দটি শুনলেই অনেকে আঁতকে ওঠেন। কালো পোশাকে আচ্ছাদিত, জটাজুটধারী এই সন্ন্যাসীরা এমন কিছু আচারে বিশ্বাসী, যা শুনলে তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজের সদস্যরা শিউরে উঠতে বাধ্য। প্রথমত তারা শ্মশানচারী, এছাড়া তারা সর্বাঙ্গে চিতাভস্ম মেখে থাকেন। প্রায়শই নগ্ন অঘোরী সাধুদের দর্শন পাওয়া যায়। সর্বোপরি তাদের খাদ্যভেদ একেবারেই নেই।  

এমনকী অঘোরীরা মৃতদেহ খেতেও অভ্যস্ত। এই ভয়াবহ বর্ণনা স্বাভাবিকভাবেই গৃহীজীবনে শঙ্কায় ফেলে দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গে অঘোরী সম্প্রদায় মোটেও পরিত্যাজ্য নয়। বরং বিরল সম্মান পেয়ে থাকেন অঘোরীরা। এখানেই প্রশ্ন জাগে— ঠিক কী কাজ করছে এই সম্ভ্রমের পিছনে?

উত্তর খুঁজতে গেলে প্রবেশ করতে হবে এমন কিছু প্রসঙ্গে, যা সাধারণত আলোচনায় আসে না।

• প্রথমেই ভাবতে হয় ‘অঘোরী’ শব্দটিকে নিয়ে। এই শব্দের উৎসে রয়েছে ‘অঘোর’ শব্দটি। এর অর্থ অন্ধকারের বিলয়। আবার এই শব্দটি ভয়হীনতাকেও বোঝায়।

• কিন্তু মজার ব্যাপার হল— অঘোরীদের বেশিরভাগ আচারই সাধারণ মানুষের ভীতি উদ্রেককারী। অঘোরীরা বিশ্বাস করেন শিবের বৈনাশিক রূপে। এক তীব্র শৈব ভাবনা থেকে তারা শিবানুসারী জীবনযাপনে উদ্যোগী হন। শ্মশানবাস তার মধ্যে প্রধান।

• নরকপাল সঙ্গে রাখা, চিতাভস্ম গায়ে মাখা, পচা, নোংরা খাবারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা বস্তুতপক্ষে ইন্দ্রিয়জয়েরই একটি দিক।

• অঘোরী সাধুরা মৃতদেহ ভক্ষণ, মূত্রপান ইত্যাদি অভ্যাস করেন। ১৭ শতকের সন্ন্যাসী বাবা কিনারামের সূত্রেই এই আচারগুলি অঘোরীদের কাছে প্রবেশ করেছে বলে জানা যায়।

• এর বাইরে অঘোরীরা নিয়মিত শবসাধনা করে থাকেন। মৃতদেহ থেকে হাড় ছাড়িয়ে তা নিজেদের শরীরে ধারণ করেন, সঙ্গে রাখেন।

• নরকপাল তাদের কাছে একান্ত প্রয়োজনীয় এক সামগ্রী। এটিকে অনেক সময়েই তারা পানপাত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

• অঘোরীদের এই আচারগুলির পিছনে সবথেকে বড় যুক্তিটি হল, কত কম উপকরণে জীবনধারণ করা যায়, তার অভ্যাস রাখা। এই যুক্তিতে তারা প্রায়শই নগ্ন থাকেন। নগ্নতার সপক্ষে আর একটি যুক্তি হল— প্রকৃতি থেকে দূরে সরতে রাজি নন তারা।

• মদ্যপান, গাঁজা সেবন ইত্যাদিকে অঘোরীরা সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করেন।

• অঘোরীদের এই অদ্ভুত আচরণ তাদের সম্পর্কে কিংবন্তির জন্ম দিয়েছে। অনেকেরই বিশ্বাস, অঘোরীরা কালো জাদুতে পারদর্শী। অথবা তাদের অলৌকিক ক্ষমতা বর্তমান।

• আসলে কোন অতিলৌকিকতা প্রদর্শন অঘোরীদের লক্ষ্য নয়। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মোক্ষলাভ, অর্থাৎ জীবন ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ। বলাই বাহুল্য, এই লক্ষ্য ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গের সকলেরই। এই খানেই অঘোরীরা ভারতীয় সন্ন্যাস পরম্পরার সঙ্গে একাত্ম। কোন তর্ক কখনই ওঠে না অঘোরীদের সাধন-উদ্দেশ্য নিয়ে।

• মধ্যযুগীয় কাশ্মীরী কাপালিকতন্ত্র থেকেই অঘোরীদের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। এদের প্রাচীন নাম ‘কালমুখ’।  তাছাড়া কিনারামের ঐতিহ্যের কথা সব অঘোরীই স্বীকার করেন।

• এক হিসাবে দেখলে অঘোরীরা শক্তি আরাধক। কালী বা তারার উপাসনাই তারা করে থাকেন। কিন্তু তাদের আদর্শ শিবত্ব। এই জায়গায় মূলধারার শাক্ত তান্ত্রিকদের সঙ্গে তারা সহমত। তাদের আরাধ্য পুরুষ দেবতাদের মধ্যে শিব ছাড়াও কালভৈরব, মহাকাল, বীরভদ্র প্রমুখ রয়েছেন।

• এমনিতে অঘোরীরা মুক্ত পুরুষ। কোন বন্ধনেই তারা আবদ্ধ নন। কোন ভেদ-দর্শনে তারা বিশ্বাস করেন না।  এমনকী পবিত্রতা-অপবিত্রতার ভেদরেখাও তারা মানেন না।

• যে কোন বস্তুতেই ঈশ্বর রয়েছেন— এটা অঘোরীদের নিশ্চিত বিশ্বাস। এই সর্বেশ্বরবাদ তাদের মধ্যে অনুপম মাধুর্যের জন্ম দেয়।

• সাধারণ মানুষের সঙ্গে অঘোরীরা কখনওই খারাপ ব্যবহার করেন না। তাদের দূরে সরিয়েও রাখেন না। কাশীতে তাঁদের মূল সাধনক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সদাশয়। বহুপ্রকার ভেজ ও জৈব ওষুধের জ্ঞান তাদের করায়ত্ত। বিপন্ন মানুষকে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে তারা দ্বিধাবোধ করেন না। সর্বোপরি, অঘোরীরা একান্তভাবেই নির্বিরোধী এক সম্প্রদায়। তাই আপাত-বীভৎসতাগুলিকে মাথায় রাখেন না সাধারণ মানুষ। অঘোরীরা পূজিত হন সর্বত্রই।  

সূত্র: এবেলা


বিডি প্রতিদিন/১৬ জুলাই ২০১৬/হিমেল-২০

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow