Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : ৫ মার্চ, ২০১৭ ১০:৪৬ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ৫ মার্চ, ২০১৭ ১৪:৩৭
'তখন ১২ বছর, আমার শরীরটা নিলাম হয়ে গেল'
অনলাইন ডেস্ক
'তখন ১২ বছর, আমার শরীরটা নিলাম হয়ে গেল'
প্রতীকী ছবি

শিরোনামের কথাগুলো এক তরুণীর। যে তরুণী তার জীবনের ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা শেয়ার করেছেন।

অজ্ঞাত পরিচয় এই তরুণীর জীবনকাহিনি পড়ুন। হয়তো আপনার সব ইন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তুলবে এই ঘটনা। চলতি মাসের ১১ তারিখ ভারতের Quora-য় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তরুণী তার জীবনের যে মর্মান্তিক গাথা বর্ণনা করেছেন, তা নিচে তুলে ধরা হল-

'আমি ১২ বছর বয়সে অপহৃত হই। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত করতে হয় বেশ্যাবৃত্তি। যখন আমার ১২ বছরের জন্মদিনটা কাটালাম, সেটাই ছিল আমার জীবনের শেষ বার্থ ডে পার্টি। এরপর বাড়ির কাছের এক পার্ক থেকে আমাকে অপহরণ করা হয়।

যখন জ্ঞান ফিরল, তখন মনে হল একটা ট্রাকের মধ্যে রয়েছি। আমার চোখ, মুখ, হাত-পা বাঁধা। চলন্ত গাড়ির শক্ত দেওয়ালে আছাড় খাচ্ছিল আমার শরীরটা।

আবার যখন জ্ঞান ফিরল, চোখ খুলে দেখি আমি একটা নোংরা ঘরের মধ্যে আছি। কয়েকজন মহিলা আমাকে খাইয়ে দিচ্ছেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দিচ্ছেন। সাহায্য চেয়ে চিৎকার করতেই ওঁরা আমার মুখে বালিশ চাপা দিল। গায়ের জোরে স্তব্ধ করল আমার গলার স্বর। পরে বুঝতে পারি। প্রভূর হাতে যাতে আমায় মারধর খেতে না হয়, সেজন্যই তাঁরা আমার মুখে বালিশ চেপে ধরত। আমার ভালোর জন্যই।

আমি ছিলাম একেবারে ছোট। তাই আমাকে একটা ডিলাক্স রুমে রাখা হয়েছিল। এক বিশাল বাংলোর শেখের কাছে বিক্রি করা হল আমার ভার্জিনিটি। বেশ কিছুদিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে তার লালসার শিকার হলাম। আমার থেকে সবকিছু নিংড়ে নেওয়া যখন শেষ, তখন শুরু হল শেখের সহযোগী, বন্ধুবান্ধবদের অত্যাচার। তাও চলল বেশ কিছুদিন।

ওই ডিলাক্স রুমটার বিছানায় আমি অনন্তকাল পড়ে থাকতাম। লোকেরা আসত। যা প্রাণে চায় আমার সঙ্গে করত। আমার ঘুম আসত না। কখনও মানসিক যন্ত্রণায়। কখনও শারীরিক কষ্টে। একেক সময় তো আচমকা ঘুম ভেঙে যেত। দেখতাম, কোনো একজন ততক্ষণে আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

কখনো কখনো ডাক্তার আসত। আমার হাইমেন মেরামত করতে। আমার পরিষ্কার মনে আছে। ডাক্তার আসার অর্থই হল, আমাকে ফের ভার্জিন হিসেবে বিক্রি করা হবে অন্য কোনো শেখের বাংলোয়।

এত কিছুর পরও আমার মধ্যে মানবতা বেঁচেছিল শুধুমাত্র কয়েকজন মহিলাদের জন্য। যাঁরা প্রতিদিন আমার কাছে আসত। আমায় গোসল করিয়ে দিত। খাইয়ে দিত। আমাকে দেখে ওরাও খুব কষ্ট পেত। কখনো কখনো ওরা কেঁদেও ফেলত। এতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার সঙ্গে যেটা হচ্ছে সেটা অন্যায়। বুঝতে পেরেছিলাম, আমি কোনো জন্তু নই। আমার যন্ত্রণটা যথার্থই। আর ওরা সেটা বুঝতে পারত।

একদিন অন্য একটি ঘরে আমার ঘুম ভাঙল। দেখেই খুব কাঁদলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেঁদেছি...আগের ঘরটার সঙ্গেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলাম। এখানে ওই মহিলারাও নেই, যাদের কোমল স্পর্শে বুঝতে পারতাম যে আমি বেঁচে আছি। নতুন ঘর, নতুন প্রভূ। কীভাবে জামাকাপড় পড়তে হবে, মেক-আপ করতে হবে - এসব আমাকে শেখানো শুরু হল। আমি কেমন পরিষেবা দেব, তা হাতে-কলমে শিখিয়ে দিলেন প্রভূরা। তাঁদের উপরই চলতে থাকল আমার যৌন ক্ষমতার প্রশিক্ষণ-পরীক্ষা। সেখানে আর শেখরা আসত না। তাদের জায়গায় আসত ফর্মাল শার্ট আর প্যান্ট পরা পুরুষরা।

আমার নিজেকে রোবট বলে মনে হত। কোনো অনুভূতিই হত না। এমনকী আমি কখনো প্রতিবাদ করা বা এসব থামানোরও কোনো চেষ্টা চালাতাম না। শুধু নির্দেশ পালন করে যেতাম।

একদন এক খাকি শাড়ি পরা মহিলা আমার জ্ঞান ফেরালেন। তিনি আমাকে বারবার ঝাঁকাচ্ছিলেন। আমার নাম জিজ্ঞেস করছিলেন। ঠিক কী হয়েছে, আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমাকে কী নামে ডাকা হত, সেটাও মনে করতে পারলাম না। কাঁদতে শুরু করলাম। আর সেই অপহরণের পর থেকে এই প্রথমবার কোনো মহিলা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনিই জানালেন, আমাকে তাঁরা বাঁচাবেন।

আরো কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে আমাকে ভ্যানে করে থানায় নিয়ে যাওয়া হল। বুঝতে পারলাম, মুম্বাইতে আছি। পরে জানতে পারলাম, ৫ বছর আগে আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল। প্রথমের দিকে কয়েক বছর আমাকে রাখা হয়েছিল হায়দরাবাদে।

আমাকে একটি হোমে রাখা হল। মনোবিদের সঙ্গে কথা বললাম। পড়াশোনা করলাম, পরীক্ষা দিলাম। একটু একটু করে শিখলাম, কীভাবে আমার সেই ডিলাক্স রুমের বাইরে অন্য কোথাও ঘুমোতে হয়। বেশকিছুদিন কোনো অযাচক ব্যক্তির শরীরী সঙ্গ না পেয়ে বেশ অস্বস্তিও হচ্ছিল। নতুন, অস্বস্তিকর অথচ স্বাভাবিক সম্মানের জীবনের পাঠ নিলাম। জানতে পারলাম বহুবার অসুরক্ষিতভাবে আমার গর্ভপাত ঘটানো হয়েছে। তাই আমি আর কোনোদিন মা হতে পারব না। এক ক্লায়েন্ট আমার হাতের কব্জি মুচড়ে ভেঙে দিয়েছিল। তারপর বছরের পর বছর তার কোনো চিকিৎসা হয়নি। তাই এখনও তা পুরোপুরি সারেনি।

ডাক্তারদের সহযোগিতায় বাড়ির ঠিকানা মনে পড়ল। পুলিশ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্য নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে যখন যোগাযোগের চেষ্টা করল, তখন জানা গেল, আমি হারিয়ে যাওয়ার পর মা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার পরপরই আত্মহত্যা করেন আমার বাবা।

এনজিও-টি আমার জন্য একটি স্পনসর জোগার করে দিল। তাদেরই জন্য আমি এখন দিল্লিতে। কম্পিউটার ও বিদেশি ভাষার একটি কোর্স করলাম। এখন আমি একটি কম্পিউটার সেন্টারে শিক্ষকতা করি। আরও দুটি মেয়ের সঙ্গে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছি।

আমার বয়ফ্রেন্ড হয়েছে। আমার অতীত জানার পরও ও আমায় খুব শ্রদ্ধা করে। আমি এখনো ভালো করে ঘুমোতে পারি না। ঘুমের মধ্যে মনে হয়, ওখানেই ফিরে গিয়েছি, আর আচমকা জেগে উঠি। একেক সময় ভয় পেয়ে মাঝরাতেই ওকে ফোন করি। ও সবসময় সযত্নে আমায় শান্ত করে। আমি নিরাপদেই আছি, এটা বোঝানোর চেষ্টা করে। ও পঞ্জাবি। ও রোম্যান্টিক গান গেয়ে, নেচে আমায় হাসানোর চেষ্টা করে। সুস্বাদু খাবার রান্না করে খাওয়ায়। আমায় লং ড্রাইভে নিয়ে যায়। আমার শরীর খুব দুর্বল। তাই আমায় ওর সঙ্গে জিমে যেতে বলে। ও একেবারেই একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তাই আমার অতীত সম্পর্কে পরিবার বা বন্ধুবান্ধবকে কিছু জানাতে পারেনি। ওর সমস্যাটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু সবার সামনে মিথ্যে বলতে খুব খারাপ লাগে।

এই প্রমিস ডে-তে ও আমাকে প্রোপোজ করেছে। আমি হ্যাঁ বলিনি। আমি ওর যোগ্য নই। ও আমার তুলনায় অনেক বেশি ভালো দেখতে, অনেক বেশি শিক্ষিত ও ভদ্র। আমি এতটাই ভেঙে পড়া, নোংরা ও অযোগ্য একটা মেয়ে যে কারো স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।

ও অপেক্ষা করবে বলেছে। আমাকে এই সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত হতে সময় দিয়েছে। বলেছে, কোনো তাড়া নেই। ও বলেছে, আমরা সন্তান দত্তক নেব। আমার অতীত নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যাথা নেই। তবে, আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করছি। আমার থেকে অনেক ভালো মেয়ে ও পাবে। আমার এই অতীতের বোঝা ওর কাঁধে চাপিয়ে ওর জীবন আর স্বপ্নগুলোকে নষ্ট করতে চাই না।

আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে গোপন সত্যিগুলো আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। সময় নিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। '

সূত্র: এই সময়

 

বিডি প্রতিদিন/৫ মার্চ ২০১৭/হিমেল

আপনার মন্তব্য

up-arrow