Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২ জুলাই, ২০১৬ ১৫:০৯
আপডেট : ২ জুলাই, ২০১৬ ১৫:২৯
এক রাতে ২৮ লাশ!
নিজস্ব প্রতিবেদক
এক রাতে ২৮ লাশ!

গুলশানে স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় এক রাতেই ঝরে গেল ২৮ টি তাজা প্রাণ। সন্ত্রাসীরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে ২০ জনকে। নিহত হয়েছে হামলাকারিদের ছয়জনও। এছাড়া সন্দেহের বশে আটক করা হয়েছে একজনকে। ঘটনার শুরুর দিকেই সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন ও ডিবির সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন আরও ২০ থেকে ২৫ জন।

শুক্রবার রাত পৌনে ৯টায় গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের 'হলি আর্টিসান' নামের রেস্টুরেন্টে কয়েকজন যুবক অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তারা গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। তারা বেশ কয়েকজন বিদেশিসহ প্রায় ৪০ জনকে জিম্মি করে। এরমধ্যে কেউ কেউ সুযোগ বুঝে ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন কায়দায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও অধিকাংশই বের হতে পারেননি। উদ্ধার হওয়া রেস্টুরেন্টের এক কর্মীর ভাষ্যমতে, সন্ত্রাসীরা প্রত্যেকেই প্যান্ট-শার্ট পরা। বয়স ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে। তারা বেশ স্বাভাবিকভাবেই ফুরফুরে মেজাজে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি করে সবাইকে জিম্মি করে। এ সময় রেস্টুরেন্টের ওই কর্মী ছাদে গিয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন কায়দায় নেমে আসেন।

এদিকে মাঝরাতেই ওই রেস্টুরেন্টের বিভিন্ন ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। এ সময় র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদের অনুরোধে টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কী কারণে জিম্মি করা হয়েছে তা জানতে জিম্মিকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের কোন দাবি আছে কিনা তা জানার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ১১ ঘন্টায়ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। শ্বাসরুদ্ধকর ১১ ঘণ্টা পর শনিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোদের নেতৃত্বে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা অভিযানে নামে। এ সময় ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও মৃতদেহ মেলে ২০ জিম্মিসহ ২৬ জনের। আইএসপিআর জানিয়েছে, সাতজন জঙ্গি হামলা চালিয়েছিল। তাদের ছয়জন নিহত হয়েছেন। একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। নিহত জিম্মিদের অধিকাংশকেই নৃশংসভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে রাতেই হত্যা করা হয় বলে আইএসপিআরের এক সংবাদ সম্মেলনে জানান সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্সের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী।   নিহতদের বিস্তারিত পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তাদের দেহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে রাখা হয়েছে। মৃতদেহ সনাক্ত সম্পর্কিত যে কোন তথ্যের জন্য ০১৭৬৯-০১২৫২৪ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

এদিকে গত রাতে জিম্মি ঘটনার পরপর অনেকেই মুঠোফোনে স্বজনের সঙ্গে কথা বলে বিপদের কথা জানান। কেউ কেউ কথা বলার সুযোগ না পেয়ে এসএমএস দেন। তারা বারবার বাঁচার আকুতি জানান। পরে তাদের ফোনে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ওই ব্যক্তিদের সবাই জীবিত ফিরতে পেরেছেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।

ফোনে জিম্মিদের সঙ্গে পরিবারের কথপোকথন:
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মালিহা বিকেলের দিকে ৪/৫ জন বান্ধবীকে নিয়ে ওই রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। জিম্মি হওয়ার পরপরই তিনি তার বাবার কাছে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানান। ফোনে বলেন, ''বাবা আমরা বিপদে, আমাদের বাঁচাও। ভেতরে অস্ত্রধারীরা সবাইকে জিম্মি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। '' এরপরই বাসা থেকে রাস্তায় নেমে আসেন মালিহার বাবা বোরহান। তাদের বাসা ওই রেস্টুরেন্টের অপর পাশেই।

জিম্মি হওয়ার পর চাচা আনোয়ার করিমের কাছে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার হাসনাত করিম। ফোন করে বলেন, ''আমরা খুব বিপদে আছি। আমাদের বাঁচাও। ওরা বলছে পুলিশ গুলি চালালে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। '' স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়েছিলেন হাসনাত করিম।

এছাড়া রেস্টুরেন্টের টয়লেটে আটকা পড়েন আটজন। পরে সেখান থেকে চারজন পালিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। বাকি চারজনের মধ্যে রেস্টুরেন্টের এক কর্মী ছমিরণ বারণ শনিবার ভোর ৫টার দিকে মোবাইলে তার বোন মিতালীকে এসএমএস করে তাদের আটক থাকার খবর জানান। তিনি দেয়াল ভেঙে উদ্ধারের আকুতি জানান। তবে এসএমএস'র পর আর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি মিতালী।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে স্বজনদের কাছে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানান জিম্মিরা। তবে তাদের সবার বেঁচে ফেরা হয়েছে কিনা তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তাদের নাম জীবিত ১৩ জনের খাতায়, নাকি নিথর ২০ জনের খাতায় তা পরবর্তীতে লাশ সনাক্তের পর হয়ত জানা যাবে।

অভিযান:
রাতভর নানা ঘটনাপ্রবাহের পর শনিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোর নেতৃত্বে শুরু হয় অভিযান। অভিযানে সেনা কমান্ডোর নেতৃত্বে অংশ নেয় নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, সোয়াত, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ৭টা ৪০ মিনিটে অভিযান শুরু করে ১২ থেকে ১৩ মিনিটে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাকি আনুসঙ্গিক কাজ শেষ করে সাড়ে ৮টায় অভিযান সমাপ্ত করা হয়। অভিযানে পিস্তল, রাইফেল, অবিস্ফোরিত বোমা ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

বিডি-প্রতিদিন/এস আহমেদ

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow