Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০৮:৪৭ অনলাইন ভার্সন
মামলার জালে তারেক
মামলা শতাধিক, দুটিতে দণ্ডিত, গ্রেফতারি পরোয়ানা ১০টিতে, ২১ আগস্ট মামলার সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ
আরাফাত মুন্না
মামলার জালে তারেক
পাসপোর্ট নিয়ে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানো চিঠি ও তারেক রহমানের পাসপোর্টের ফটোকপি

দুর্নীতি, নাশকতা, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহসহ শতাধিক মামলার জালে জড়িয়ে আছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্যে দুই মামলায় তাকে সাজা দিয়েছে আদালত। তার বক্তব্য প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে হাই কোর্টের। অন্তত ১০ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই ছেলের বিরুদ্ধে। আর পাঁচ মামলায় তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে আদালতের আদেশে। তার বিরুদ্ধে থাকা চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারও শেষ পর্যায়ে। এ মামলায় তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ। বিএনপির আইনজীবীরা বলছেন, ন্যায়বিচার হলে খালাস পাবেন তিনি। অন্য মামলাগুলো রয়েছে বিচার ও তদন্ত পর্যায়ে। তারেক রহমানের আইনজীবীরা বলছেন, সরকার তার (তারেক রহমান) জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়েই তাকে মামলার জালে জড়িয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, অনেক মামলাই করা হয়েছে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। অপরাধ করলে তাকে সাজা পেতে হবেই। জানা গেছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে যৌথ বাহিনী। এর পর তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, আয়কর ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা করা হয়। পরে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়েই উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তিনি। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। এই সময়ের মধ্যে তারেক রহমানকে পলাতক দেখিয়ে দুটি মামলায় সাজা দিয়েছে আদালত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারেক রহমানের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘তারেক রহমানের জনপ্রিয়তাকে সরকার বেশি ভয় পায়। তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে এ সরকার একের পর এক মামলা করেছে। এ পর্যন্ত শতাধিক মামলা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক বক্তব্যকে ইস্যু করে বিচারকদের ব্যবহারের মাধ্যমে এসব মামলা করা হয়েছে। সব মামলাই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। আমরা আইনগতভাবে এসব মামলা মোকাবিলা করব।’ অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, প্রতিটি মামলায় আসামিপক্ষ পর্যাপ্ত সময় নিয়েছে। এতে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। তিনি বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে এর অনেকগুলো বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে করা হয়েছে। আর কেউই তো আইনের ঊর্ধ্বে নয়, অপরাধ করলে মামলা তো হবেই। রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, তারেক রহমান বিদেশে পালিয়ে আছেন। তার বিরুদ্ধে সাজা হয়েছে। এখন দেশে না এসে এসব মামলা মোকাবিলা করার কোনো সুযোগ তার নেই।

দুই মামলায় দণ্ডিত : ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা পাচারের অভিযোগে তারেক রহমান ও তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর দুদক ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা করে। ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ মো. মোতাহার হোসেন এ মামলার রায়ে তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দেন। আর গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে দেওয়া হয় সাত বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা ৪০ কোটি টাকা। তারেকের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক ওই বছর ৫ ডিসেম্বর হাই কোর্টে আপিলের আবেদন করে। হাই কোর্ট আপিল নিষ্পত্তি করে ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তারেক রহমানের খালাসের রায় বাতিল করে তাকে সাত বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। একই সঙ্গে ২০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেয়। পরবর্তী সময়ে রায়ের অনুলিপি নিম্ন আদালতে আসার পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাতের অভিযোগে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করে দুদক। এ মামলায় তারেক রহমানসহ পাঁচজনকে ১০ বছর এবং তার মা খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ মামলায় তারেক রহমান পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। আসামিদের অর্থদণ্ডও করা কারা হয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং এতে ২২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরণ দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা করে পুলিশ। বর্তমান সরকারের আমলে এ দুটি মামলার সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমানকেও আসামি করা হয়। সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমান ছাড়াও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়। দুই চার্জশিটে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫২। ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডির প্রথম চার্জশিটে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান, বিএনপি সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটির বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে। এ মামলায় তারেক রহমানসহ সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

রাষ্ট্রদ্রোহের ১০ মামলা : ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ওই বছর ৮ জানুয়ারি তারেক রহমানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে মামলাটি করে পুলিশ। এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইস্ট লন্ডনের অস্ট্রিয়ামে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তারেক রহমান বলেন, ‘তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলছি, শেখ মুজিব রাজাকার, খুনি ও পাকবন্ধু ছিলেন।’ এতে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতে ৪৪টি মামলা হয়। এর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহের নয়টি মামলার অনুমোদন দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সারা দেশে মানহানি মামলা : ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি করে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় যে ৪৪টি মামলা হয়েছিল, এর মধ্যে ৩৫টি মানহানির। তারেক রহমানের ওই বক্তব্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবার ও তার আদর্শ মেনে চলা মানুষদের সম্মানহানি ঘটেছে উল্লেখ করে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ ও ৫০৪ ধারায় মামলা করা হয়। এর পরও বিভিন্ন স্থানে আরও মানহানি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির আইনজীবীরা।

অবৈধ সম্পদ অর্জন : অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কাফরুল থানায় মামলা করে দুদক। এ মামলায় তারেকের স্ত্রী জোবায়দা রহমানকেও আসামি করা হয়েছে।

ঘুষ গ্রহণ : একটি হত্যা মামলা ভিন্ন খাতে নিতে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ২০০৭ সালে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে দুদক।

কর ফাঁকি : কর ফাঁকির অভিযোগে ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট ঢাকার বিশেষ আদালতে মামলা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

ঋণখেলাপি : তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা হয় ২০১২ সালের ২ অক্টোবর। ঋণ খেলাপের অভিযোগে মামলাটি করে সোনালী ব্যাংক।

চাঁদাবাজির ১১ মামলা : বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতারের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে গুলশান, কাফরুল, শাহবাগ ও ধানমন্ডি থানায় চাঁদাবাজি, হুমকিসহ ফৌজদারি আইনে ১১টি মামলা হয়।

 

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow