Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১২ মার্চ, ২০১৬ ০৮:৪৫ অনলাইন ভার্সন
ধারাবাহিক উপন্যাস
অটোমান সূর্য সুলতান সুলেমান (পর্ব-৩)
রণক ইকরাম

অটোমান সূর্য সুলতান সুলেমান (পর্ব-৩)
bd-pratidin

ইউরোপীয়দের কাছে ‘সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ খ্যাত সুলতান সুলেমান প্রকৃত অর্থেই পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সেরা একজন শাসক ছিলেন। বাবা প্রথম সেলিমের উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণের আগে মানিসাসহ তিনি রাজ্যের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপরই অটোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত ক্ষমতা তোপকাপি প্রাসাদের হাতছানি। ক্ষমতার টানাপড়েনে ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা, ভাই-সন্তান হত্যা, দাসপ্রথা আর হারেমের নানা পরিক্রমা ছাপিয়ে এগিয়ে গেছে সুলেমানের শাসনকাল। বিশ্বজুড়ে এ এক বিরল কাহিনী। সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় আসা সুলতান সুলেমান বিষয়ে জানতে চেয়েছেন অনেকেই। সেজন্যই ইতিহাসআশ্রয়ী এ উপন্যাস ছাপানো শুরু হয়েছে। টিভি সিরিজের সঙ্গে আমাদের যেমন কোনো বিরোধ নেই তেমনি, এর অনুকরণেরও প্রশ্নই ওঠে না। আমরা কেবল মূল গল্পটি তুলে ধরছি। প্রতি শনিবারের এ বিশেষ আয়োজনে আজ ছাপা হলো তৃতীয় পর্ব।

[পূর্ব প্রকাশের পর]

অন্ধভাবে ভাগ্যে বিশ্বাসীদের দলে নন যুবরাজ সুলেমান। তার বিশ্বাস কর্মে। তিনি মনে করেন একজন মানুষের কর্মই নিশ্চিত করে তার গন্তব্য। তবে এটাও বিশ্বাস করেন যে সৃষ্টিকর্তার পূর্বনির্ধারিত কিছু বিষয় থাকে, যা কেউ খণ্ডাতে পারে না। যেমন সুলতান সেলিমের সন্তান না হলে সুলেমান হয়তো কোনোমতেই অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বিবেচিত হতেন না। এটাকে ভাগ্যের খেল বলা চলে। আর বাকি সবটুকুই কর্মফল।

গণকের কাছ থেকে ‘দশ’ সংখ্যার মাহাত্ম্য আর এ শতকের দেবদূত হওয়ার কথাগুলো সুলেমানের মনে ভালোই দাগ কেটেছে। অথচ তা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে সুলেমানের মনের ভিতর একটা স্বাপ্নিক মানুষ বসবাস করে। সেই ভিতরের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে গণকের কথার দারুণ মিল! পারগালি ইব্রাহীম ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘মাশাআল্লাহ’ বলে বাহবা দিলেও গণকের কথায় কোনো মন্তব্য করেননি যুবরাজ। তবে মনে মনে একটা শব্দ জমেছেন তিনি— ‘আমিন! আমিন!’

গণক জরিয়ম জাবেরকে স্বর্ণমুদ্রাসহ নানা উপহারে ভূষিত করার নির্দেশ দিলেন যুবরাজ। বিনীতভাবে সুলেমানের উপহার গ্রহণ করলেন জরিয়ম জাবের। এরপর সভা শেষ করে ইব্রাহীমকে নিয়ে ব্যক্তিগত কামরার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

মানিসার এই প্রাসাদটির একাধিক সংস্কার কাজ হয়েছে। এরপরও দারুণ ঝকঝকে তকতকে। সুলেমান মানিসাসহ কাফফা ও এড্রিয়ানোপলের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তার প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু মানিসার এই বিশাল প্রাসাদটিই। মায়ের সঙ্গে সতের বছর বয়সে প্রথম প্রশাসক হিসেবে এখানে আসেন তরুণ যুবরাজ। সেই থেকে এটিই তার ঠিকানা। অবশ্য সুলেমানই প্রথম নন। অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়মানুসারে ভবিষ্যৎ সুলতানদের নানা নিয়ম-নীতি ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে তরুণ থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রদেশের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা। এখান থেকেই শাহজাদারা রাজ্য পরিচালনা, আইন-কানুনসহ নানা বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। মানিসায় এর আগেও আরও কয়েকজন অটোমান বংশের শাহজাদারা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। অটোমান সাম্রাজ্যে তাই মানিসার এই প্রাসাদের গুরুত্ব অন্যান্য এলাকার চেয়ে একটু আলাদা।

মানিসার রাজপ্রাসাদটিকে মোটামুটি দৃষ্টিনন্দন বলা চলে। মূল ভবনটি দোতলা। খানিক আগে সুলেমান যেখানে সভার কাজ চালাচ্ছিলেন, সেটি ভবনের নিচতলা। এখানেই রাজদূত, অতিথি সম্ভাষণ আর সাধারণ রাজকার্য পরিচালনা করেন সুলেমান। এর পাশেই ভবনের রক্ষী, দাস-দাসীদের থাকার জায়গা। পশ্চিম দিকে হেঁশেল আর দক্ষিণে বিশাল হাম্মামখানা। আর মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় ফুলের বাগান। এই ভবন থেকে মাত্র পঞ্চাশ-ষাট ফুট দূরেই আরেকটি ভবন। এই ভবনটিকে একটা ছোটখাটো দুর্গও বলা চলে। মানিসার হাজার পাঁচেক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য একটি ছোট্ট সেনাবাহিনী ভবন আছে। এই ভবনটি তাদেরই আবাসস্থল। সুলেমানের তিনটি রাজ্যেই আলাদা আলাদা সেনাবাহিনী আছে। রয়েছে এদের সমন্বয়ের ব্যবস্থাও। প্রশাসকের হয়ে এই কাজটি করেন পারগালি ইব্রাহীম ও তার সঙ্গীরা। মানিসার প্রাসাদের কাছাকাছি এ ভবনের পাশে একটা খোলা জায়গা আছে। এখানেই সব সেনাসদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সুলেমানের থাকার জায়গা হচ্ছে মূল ভবনের দোতলায়। দোতলার ঠিক মাঝামাঝি সিঁড়ির গোড়ায় আরেকটি বৈঠকখানা আছে। এর ঠিক ডানেই হারেম বা সোরাগ্লিও এলাকা। যেখানে সাধারণ পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ। এরই একপাশে সুলেমানের প্রিয় স্ত্রী মাহিদেভরান ও মুস্তফা থাকেন। আরেক পাশে কঙ্কুবাইন ও দাসীদের বসবাস। আর বাম দিকে সুলেমানের খাস কামরা। এখানে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কাজ সারা হয়, তেমনি বিশ্রামও নিয়ে থাকেন সুলেমান। ইব্রাহীমকে সঙ্গে নিয়ে খাস কামরার দিকেই এগোচ্ছিলেন সুলেমান। তার কাঁধে হাত রেখে বললেন—

‘আব্বার এই বিজয়ে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেলাম। এবার পালা হাঙ্গেরির। তাই না?’

‘জি, যুবরাজ। আলবত।’

যুবরাজের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে মাথা ঝাঁকালেন পারগালি ইব্রাহীম।

‘এই বিজয় আমাদের উদযাপন করা উচিত। সবার মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা উচিত।’

‘জি হুজুর। আপনি ঠিক বলেছেন। মহান সুলতান সেলিমের মিসর জয় আমাদের জন্য অনেক গৌরবের।’

‘তাহলে সব ব্যবস্থা করে ফেল। প্রজাদের জানিয়ে দাও। আর আমি অতি দ্রুত কনস্টান্টিনোপলের দিকে যেতে চাই। আব্বার সঙ্গে কথা বলা দরকার। তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা কর।’

‘জি হুজুর।’

বলেই মাথা ঝুঁকিয়ে খাস কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন ইব্রাহীম। সুলেমান তখন খাস কামরায় নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। মাথা থেকে পাগড়িটা খুলে রেখে দিলেন টেবিলের ওপর। এরপর কিছুক্ষণ মাথায় হাত রেখে আপনমনে কী যেন ভাবলেন। ভাবতে ভাবতেই কলমের নিবে কালি মাখিয়ে নিয়ে লিখতে লাগলেন—

     ‘আঁধারের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে

     সাগরের ঢেউ বয়ে বয়ে

     বাতাসের বাঁক ধরে ধরে

     সুগন্ধির ঘ্রাণ জুড়ে জুড়ে

     মুহিব বের মন যে কোথায় হারায়

     কোন অদূরের কোন সীমানায়!’

অনেকেই জানে না সুলেমান কবিতা লিখতে ভীষণ ভালোবাসেন। তবে নিজের নামে নয়, ছদ্মনামে। মুহিব বে। এটাই সুলেমানের ছদ্মনাম। ইব্রাহীমসহ হাতে গোনা কয়েকজন লোকের জানা। উড়ু উড়ু মনে প্রশান্তির আবেশ নিয়ে আসতে সুলেমানের এই লেখালেখির টনিকটা বেশ কাজে দেয়।

আয়শা হাফসা সুলতানের কক্ষে দারুণ ভিড় পড়ে গেছে। সবার ভিড়ে স্বয়ং সুলতান প্রথম সেলিমও আছেন। তাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। গতকাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আয়শা হাফসা সুলতান। দুই দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন হেকিম হালিমের নেসা। পাশেই দাঁড়িয়ে আয়শা হাফসা সুলতানের ব্যক্তিগত সহকারী মনজিলা। হেকিমের দিকে প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে

তাকিয়ে সুলতান। পরীক্ষা শেষ হতেই সুলতানের দিকে তাকিয়ে তাকে অভিবাদন জানালেন হেকিম।

‘জাঁহাপনা, সুলতানা এখন ঠিক আছেন। নির্ঘুম রাত কাটানো আর দুশ্চিন্তা থেকেই এমন হয়েছে। তবে দুয়েকদিন বিশ্রাম নিতে হবে।’

একটা ওষুধের কৌটা মনজিলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হেকিম বললেন—

‘এ ওষুধটা খাইয়ে দিন। সুলতানার জ্বর নেমে যাবে।’

বিছানায় তন্দ্রাচ্ছন্ন আয়শা হাফসা সুলতান। তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ঘুমের ঘোরেই ‘সুলেমান’ ‘সুলেমান’ বলে কাতরাচ্ছেন তিনি।

তখনই স্ত্রীর দিকে এগিয়ে গেলেন প্রথম সেলিম। বসলেন শিয়রের পাশে। করুণ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আয়শার দিকে। আয়শা তখনো সুলেমানের নাম নিতে নিতে কাতরাচ্ছেন। এবার মনজিলার দিকে প্রশ্নাতুর দৃষ্টি সুলতান সেলিমের।

‘জাঁহাপনা, এর মাধ্যমেই হাকিম সুবিরকে মানিসায় পাঠানো হয়েছে। তিনি যুবরাজের কাছে খবর নিয়ে গেছেন। যুবরাজকে সঙ্গে নিয়েই তার ফেরার কথা।’

মনজিলার জবাবে স্বস্তি ফিরল সেলিমের মনে। আরও কিছুক্ষণ স্ত্রীর শিয়রের পাশে বসেই কাটিয়ে দিলেন তিনি।

এরপর সোজা দরবারের পাশের কক্ষে। সেখানে তার জন্য আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের প্রধান উজির পীরে মেহমুদ পাশা। সুলতান কক্ষে প্রবেশ করতেই তাকে অভিবাদন জানালেন তিনি।

‘জাঁহাপনা, রিদানিয়ার যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর চারদিক থেকে অনেক শুভেচ্ছা বার্তা এসেছে। সুলতানা নাকি বলেছেন এ বিজয় যেন ধুমধামের সঙ্গে উদযাপন করা হয়। আপনার আসার অপেক্ষায় ছিল সবাই। আপনি অনুমতি দিলেই আমরা উৎসবের ব্যবস্থা করতে পারি।’

জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ নীরব কাটালেন প্রথম সেলিম। হাতের তিনটি ধাতুর আংটি নাড়াচাড়া করতে করতে একবার তাকালেন মেহমুদ পাশার দিকে।

পীরে মেহমুদ পাশা ভয় পেয়ে গেলেন। ভয় না পেয়ে উপায় আছে? সেলিমের মেজাজ-মর্জি বুঝতে পারে এমন মানুষ গোটা পৃথিবীতেই হয়তো নেই। সুলতান সেলিমের উজির হওয়ার চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আর কিছুই হতে পারে না। সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত ছোট্ট ছোট্ট কারণে ছয়জন উজিরের প্রাণ গেছে সুলতানের নির্দেশে। সারোরাজ পাশার কথাতো কেউ ভুলবে না। সেলিমের খুব কাছের মানুষ ছিলেন উজির সারোরাজ পাশা। একবার কী এক কাজে সুলতানের কাছে আরও কিছু সময় চেয়েছিলেন সারোরাজ। বলেছিলেন এতে করে তার ওপর অর্পিত কাজগুলো তিনি সুন্দরভাবে শেষ করতে পারবেন। কিন্তু সুলতান রেগে গেলেন। খানিক চুপ থেকে এরপর বললেন তিনি আসলে আরও আগে থেকেই সারোরাজকে ফাঁসিতে ঝোলানোর চিন্তা করে রেখেছেন। কিন্তু তার জায়গায় বসানোর মতো উপযুক্ত কাউকে পাননি বলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারেননি। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো এই ঘটনার মাত্র তিন দিন পরে কী এক ঠুনকো কারণে সুলতানের নির্দেশে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় সারোরাজ পাশাকে। এ কারণেই অটোমানরা একজন আরেকজনকে অভিশাপ দেন এই বলে যে ‘তুমি যেন সেলিমের উজির হও।’ মানে হলো এই পদে আসা মানে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই এই পদে আসার আগে সবাই মৃত্যুবরণের প্রস্তুতি নিয়েই আসেন। তাই বলে মৃত্যুভয় থাকবে না তা কি হয়? মেহমুদ পাশাও তাই খানিকটা বিচলিত।

‘মেহমুদ পাশা, আমার মনে হয় আপনার চোখ-কান-বিচার-বুদ্ধির জানালা বন্ধ হয়ে গেছে।’

বলেই একটু থামলেন সুলতান। তর্জনীর আংটিটা হাত থেকে খুলে আবার হাতে পুরে নিলেন। বিচলিত এবং বিভ্রান্ত দেখাল মেহমুদ পাশাকে। ভয়ে চোখ ছলছল করছে তার। যেন আরেকটু হলেই কেঁদে ফেলবেন।

সুলতান সেলিম টুক করে এদিকে একবার তাকালেন। মেহমুদ পাশার ভয় পাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারলেন তিনি।

‘আপনার জানা উচিত সুলতানা এখন অসুস্থ। তাছাড়া আমিতো আগেই বলে রেখেছি হাঙ্গেরি বিজয়ের আগে আমি কোনো উৎসব চাই না। হাঙ্গেরির বুকে অটোমানদের পতাকা উড়িয়ে উচিত শিক্ষা দিতে চাই ওই শয়তানদের। বুঝতে পেরেছেন?’

সুলতানের শীতল দৃষ্টি পীরে মেহমুদ পাশার দিকে।

‘জি জাঁহাপনা। আমাকে ক্ষমা করবেন। বিষয়টি আগেই বুঝে ফেলা উচিত ছিল আমার।’

‘হুমম। ভেনেসীয় দূত রেডক্লিফকে খবর পাঠান। আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। হাঙ্গেরি অভিযান নিয়ে আগামীকালই বসব সবার সঙ্গে। ত্বরিত ব্যবস্থা নিন।’

‘জি জাঁহাপনা।’

‘হুমম।’

বলেই হাতে ইশারা করলেন সুলতান সেলিম। ইশারা বুঝতে পেরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন পীরে মেহমুদ পাশা। সুলতানের সামনে থেকে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে যেতে পেরে তাকে খুব খুশি মনে হলো। সত্যি, আরেকটু হলে প্রাণটাই বেরিয়ে যেত!

রাত নেমে গেছে। চাঁদে ভরা রাত। পাশেই বিস্তীর্ণ সমুদ্র। রুপালি চাঁদের সাদাটে আলোয় চিকচিক করছে সাগরের অন্তহীন জলরাশি। সুনসান নীরবতায় দূরে কোথাও কিছু একটার শব্দ কানে আসে। সেই শব্দ ছাপিয়ে গগনবিদারী ঘোড়ার খুরের শব্দ প্রকট হয়ে ওঠে। ঘোড়ার সওয়ারি যুবরাজ সুলেমান ও তার সঙ্গীরা। এই মুহূর্তে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে হালকা জঙ্গল পেরিয়ে যাচ্ছেন তারা। মাইলখানেক দূরে একটা পাহাড়ি অন্তরীপ। বেশ কতগুলো পাহাড় সারিবদ্ধভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। এই পাহাড়ের সারি পেরিয়ে যেতে পারলেই দেখা মিলবে জনবসতির। মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে বসে থাকেননি যুবরাজ সুলেমান। রওনা করেছেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। মাহিদেভরানও আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সুলেমান রাজি হননি। তাকে নিয়ে এরকম করে ঘোড়ায় চেপে আসা যেত না। তাছাড়া মোস্তফা আছে। ঘোড়ার রথে এলে সময় পেরিয়ে যাবে অনেক। তাই ইব্রাহীমসহ আরও কয়েকজনকে নিয়েই রওনা হয়ে গেছেন সুলেমান।

ঘাস বিছানো বন-বাদাড়ি পথ পেরিয়ে শুকনো জমির ওপর সুলেমানের দল। সামনেই পাহাড়ের সারি যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মত্ত। রুপালি চাঁদের আলোর সঙ্গে অন্ধকারের কালো মিশে এক অদ্ভুত আবহ। পাহাড়ের সারির কাছাকাছি এসে থামার অনুমতি চাইলেন পারগালি ইব্রাহীম। পূর্ব-দক্ষিণ দিকে সবচেয়ে বড় পাহাড়টা দেখিয়ে বললেন—

‘যুবরাজ, এদিকে একটা সরু রাস্তা আছে। এই রাস্তা ধরে গেলে আমাদের অনেক সময় বেঁচে যাবে।’

‘তুমি ঠিক চেনো তো ইব্রাহীম?’

‘অবশ্যই যুবরাজ।’

পারগালি ইব্রাহীমের কথায় পাল্টে গেল যাত্রা পথ। চেনা রাস্তার বাঁক পাল্টে পূর্ব-দক্ষিণের বড় পাহাড়ের দিকে এগোতে শুরু করলেন তারা। সবচেয়ে বড় পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা সরু রাস্তা। ঘোড়ার গতি খানিকটা মন্থর করতে হলো। এই পথটার পুরোটাই পাথুরে। খুব সম্ভবত আগ্নেয়গিরির লাভায় তৈরি হয়েছে। পথটা যেমন সরু তেমনি অন্ধকার। বাইরে ঝলমলে চাঁদের আলো পড়লেও এখানে এর ছাপ সামান্যই। সংকীর্ণ গিরিখাতের মধ্য দিয়ে মিনিট চারেক চলার পরই আবার চাঁদের ঝকমকানি চোখে পড়ল। একটু দূরেই মানুষের বসতি দেখা যাচ্ছে। এমন পাঁচ-ছয়টি গ্রাম পেরিয়ে গেলেই কনস্টান্টিনোপলের সীমানা। সেখান থেকে তোপকাপি প্রাসাদ আরও কয়েক মিনিটের রাস্তা।

দেখতে দেখতেই তোপকাপি প্রাসাদের প্রধান ফটকে ঢুকে পড়লেন তারা। পাশেই  হারেমে প্রবেশের প্রধান পথ ‘গেট অব ফেসিলিটি’ বা ‘মহাসুখের তোরণ’। এই ফটক দিয়েই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে হারেমের যোগাযোগ হয়। সাধারণ যোগাযোগের জন্য অবশ্য আরেকটি পথ রয়েছে। সেটির নাম ‘আরাবা কাপাসি’। ঘোড়ার গাড়ি প্রবেশের এই দরজা দিয়েই হারেমের নারীরা তাদের প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে পারেন। সুলতানার কক্ষ আরাবা কাপাসির কাছাকাছি। তাই পারগালি ইব্রাহীমসহ অন্যসব সঙ্গীদের মহাসুখের তোরণের বাইরে রেখে আরাবা কাপাসির দিকে এগিয়ে গেলেন যুবরাজ। রক্ষীদের একজনের হাতে ঘোড়াটা বুঝিয়ে দিয়ে সোজা সুলতানের যাতায়াতের পথ ‘হাসোদা কগুসু’ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। মায়ের কক্ষের সামনে এসে থামলেন। ভিতরে ঢোকার আগে বাবা সুলতান সেলিমের খোঁজ জেনে নিলেন সুলেমান। তিনি নাকি খানিক আগেই সুলতানার পাশে ছিলেন। এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। জাঁহাপনাকে ডেকে দিতে হবে কিনা জানতে চাইলে দাসীকে নিষেধ করলেন সুলেমান। কারণ সুলতান সেলিম সবে মিসর অভিযান থেকে ফিরেছেন। এতদিনকার ধকল কাটিয়ে ওঠার জন্য তারও অনেক বিশ্রাম দরকার। এই ভেবে কথা না বাড়িয়ে মায়ের ঘরের ভিতর পা ফেললেন সুলেমান।

আয়শা হাফসা সুলতান তখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন।

মাকে ঘুমে দেখে ঘরের বাঁ দিকে মায়ের ছোট্ট হাম্মামখানায় প্রবেশ করলেন সুলেমান। এখানে পুরুষ প্রবেশের নিয়ম নেই। কিন্তু যুবরাজ এখানেই বেড়ে উঠেছেন। এটা তার মায়ের ব্যক্তিগত হাম্মাম। তাছাড়া এই মুহূর্তে এটাই ব্যবহার করতে হবে। ঝটপট হাতমুখ ধুয়ে নিলেন যুবরাজ। ততক্ষণে মায়ের কাছের সঙ্গী ও দাসী মনজিলা এসে উপস্থিত হয়েছেন। সুলেমান তাকে বিশেষ পছন্দ করেন। কারণ তার শৈশবের প্রায় পুরোটাই কেটেছে তার সঙ্গে খেলা করে। মনজিলার প্রচুর আদর পেয়েছে সুলেমান। হাত-মুখ ধুয়ে বের হতেই দেখলেন মনজিলা রেশমি কাপড় নিয়ে যুবরাজের অপেক্ষায়। সেটি হাতে নিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে মনজিলার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন সুলেমান। মায়ের অসুস্থতার খোঁজও নিলেন। মনজিলা সব খুলে বলল। জানাল তিনি এখন অনেকটাই সুস্থ আছেন, কিন্তু ঘুমের ঘোরেও কেবল ‘সুলেমান...সুলেমান’ বলে ডাকছেন। তাই তাকে খবর দেওয়া হয়েছে।

সব শুনে মায়ের শিয়রের পাশে গিয়ে বসলেন যুবরাজ সেলিম। মাত্র কয়দিন আগেও সুলেমানের সঙ্গে মানিসাতেই ছিলেন আয়শা। কয়েক মাস আগে সুলেমানই তাকে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আর প্রাসাদে সময় কাটানোর জন্য কনস্টান্টিনোপল পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ১৫১৩ সালে সুলেমানের বয়স যখন মাত্র ১৭ তখনই সুলেমানকে  প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে মানিসার প্রশাসক করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন প্রিয় মা আয়শা হাফসা সুলতানও সুলেমানের সঙ্গী হয়েছিলেন। মূলত মায়ের কাছ থেকেই মানবিক ও প্রশাসনিক অনেক বিষয় শিখেছেন সুলেমান। সুলেমান প্রশাসক হলেও মূলত তার মায়ের নির্দেশেই মানিসায় অনেক রাস্তা, মসজিদ-মাদ্রাসা ও স্কুল তৈরি করা হয়। এসব কিছুই মানিসাকে আধুনিক করে তুলেছে। তোপকাপি হারেমের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছাকাছি না থাকলে তার শিক্ষা কখনোই পূর্ণতা পেত না।

মায়ের মাথার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন সুলেমান। এভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল। আয়শার ঘুম তখন আরও গভীর হলো। মনজিলার কাছে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে  গেলেন যুবরাজ। মা সজাগ হলেই যেন ডাকা হয় সুলেমানকে। তার নিজেরও একটু বিশ্রাম দরকার।

চলবে... পরবর্তী পর্ব আগামী শনিবার


বিডি-প্রতিদিন/১২ মার্চ, ২০১৬/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

up-arrow