Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল, ২০১৬ ১১:৪২ অনলাইন ভার্সন
সরকারের 'তানপুরায়' উল্টাপাল্টা সুর
কাজী সিরাজ
সরকারের 'তানপুরায়' উল্টাপাল্টা সুর

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপেই নির্বাচনী হাঙ্গামায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৩৮ জন। আহত হয়েছেন দুই হাজারের মতো। বাকি চার ধাপে কী ঘটবে আল্লাহ জানেন। দ্বিতীয় ধাপ শেষে বিএনপির এক নেতা তো উত্তেজনার বশে বলেই ফেলেছিলেন যে, পরের ধাপসমূহে তারা নির্বাচন বর্জনও করতে পারেন। ১ এপ্রিল সিইসির সঙ্গে দেখা করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করে বেরিয়ে আসার পথে সাংবাদিকদের কাছে দলের যুগ্ম-মহাসচিব মো. শাহজাহান যা বলেছিলেন তার অর্থ বর্জনই দাঁড়ায়।  তার সে বক্তব্য অবশ্য তার দল নাকচ করে দিয়েছে। বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের সভায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বলতেই হবে, ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। কিন্তু বিএনপি ইউপি নির্বাচন বর্জন করতে পারে এমন খবর মিডিয়ায় প্রকাশের পর শাসক লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ যে মন্তব্য করেছেন তা একেবারেই হাস্যকর। তিনি বলেছেন, পরাজয়ের লজ্জায় নাকি পালাতে চাচ্ছে দলটি। শাসক দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাও এমন ‘বাণী’ দিয়েছেন যে, এই নির্বাচন ‘ভালো’ হয়েছে। কেমন ভালো হয়েছে তা তো বোঝা যায় কয়েকশ প্রতিদ্বন্দ্বীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতেই বাধা দেওয়ার ঘটনায়। পরিসংখ্যানটি বরাবরই প্রাসঙ্গিক লেখায় আসবে যে, প্রথম ধাপের ৭১২ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে বিএনপিরই ১১৯ জন প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯ ইউপির ৬৩টিতেও একই অবস্থা। অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও অনেক অভিযোগ। দুই ধাপে শাসক লীগের প্রায় ১০০ চেয়ারম্যান প্রার্থীকে নৌকা আর জলে ভাসাতে হয়নি। ‘ছু মন্তর ছু’তেই গাঙ পার। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিনা ভোটে তারা চেয়ারম্যান হয়ে গেছেন। এরপরও নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলতে লজ্জা হওয়ার কথা ছিল। এই নির্বাচন সম্পর্কে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকেও যেসব বক্তব্য-বিশ্লেষণ পাওয়া গেছে, তা থেকেও বোঝা যায়, নির্বাচন সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রী-মিনিস্টার বা নেতা-নেত্রীরা যা বলছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ এবং রকিব কমিশনের অন্যরা যা বলছেন সত্য ও বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো সামঞ্জস্য নেই। সরকারের পার্টনাররা কি বলছেন তা শুনলেও পরিষ্কার হওয়া যায় যে, কেলেঙ্কারির সীমা নেই এই নির্বাচনে। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, এ নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি যা বলেছেন, তার গলিতার্থ হচ্ছে নির্বাচনের নামে এটা একটা প্রহসন। ইসি মেরুদণ্ডহীন, সিইসি বেশরম। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন নির্বাচনে ‘দখলের উৎসব’ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন। সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেছেন, ‘একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের জন্য আমরা দীর্ঘ লড়াই করেছি। আপনারা সেই সংগ্রামের অর্জন। আপনারা ব্যর্থ হন আমরা তা চাই না। কিন্তু এই নির্বাচনে যা ঘটেছে তা হলো ন্যক্কারজনক, ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরার মহোৎসব। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য অন্য প্রার্থী ও সমর্থকদের ভয়ভীতি, মারধর ও বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভোটে অংশ নিতে বাধাগ্রস্ত করা হয়। এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও পুলিশ ও নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তারা বিরোধী দলের প্রার্থীদের অবরুদ্ধ করে রেখে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করেছেন।’ নির্বাচনটি কেমন হয়েছে তা বোঝার বা বোঝানোর জন্য বিএনপি বা অন্য কোনো প্রকৃত সরকারবিরোধী দলের মুখ থেকে কিছু শোনার কোনো প্রয়োজন কি আর আছে? এই অবস্থার জন্য প্রথমেই অভিযোগ উত্থাপিত হবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে জনগণ বিএনপির মন্তব্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, এই নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ। তিন সিটি নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় ধাপ থেকে শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌর নির্বাচন এবং সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অবহেলা করেছে বলে সমালোচনা হতেই পারে। শুধু তাই নয়, আগামী দিনে ইসির ভূমিকা আন্দোলনের ইস্যুও হয়ে যেতে পারে। ইতিপূর্বে ‘আজিজ-কমিশনের বিরুদ্ধে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং নামধারী বামদের নেতৃত্বে তুমুল আন্দোলনের কথা কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন তার সমালোচনামূলক বক্তব্যে সে আন্দোলনের কথা উল্লেখও করেছেন। রাজনৈতিক দল শুধু নয়, সুশীল সমাজের পক্ষ থেকেও এখন সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগের দাবি উঠছে। ইসির ভূমিকায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত। গত ১ এপ্রিল এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন দিতে না পারার ব্যর্থতার দায় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগ করা উচিত। বিগত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সব নির্বাচন বিকৃত হয়েছে। জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। নির্বাচন কমিশনও সেই অর্থে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ইসির ব্যর্থতার বিচার কে করবে? নিশ্চয়ই সাংবিধানিক পদাধিকারীদের বিচারেরও দুটি অতিশয় শক্তিশালী আদালত আছে— এক. উপরওয়ালার আদালত ও বিচার এবং দুই. জনগণের আদালত ও বিচার।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের এ পর্যন্ত দেখা চিত্রটা পূর্বপরিকল্পিত। সরকারের বোধহয় দ্বিবিধ উদ্দেশ্য ছিল— এক. তৃণমূলে সরকারের একটা ভিত্তি গড়া, দুই. দেশে-বিদেশে সরকারের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করা। ব্রিটিশ আমল থেকেই লক্ষ্য করা গেছে, কৃতকর্মের ফলে কোনো সরকার যখন গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অথবা নানা ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে যখন ক্ষমতাসীন দল জনপ্রিয়তা হারিয়ে সরকারকে টিকিয়ে রাখার শক্তি জোগাতে পারে না, তখন তারা থানা-গ্রামে একটা ভিত্তি খোঁজে। অবলম্বন করে তৃণমূলের স্থানীয় সরকার পরিষদসমূহ দখল প্রক্রিয়া। সেখানে তারা বেছে নেয় কিছু আজ্ঞাবাহী। তৃণমূলে কিছু সুবিধা ‘বিতরণের’ মাধ্যমে কব্জা করতে চায় কিছু লোক, আহরণ করতে চায় কিছু শক্তি। বর্তমান সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে প্রতিপক্ষ এতদিন যে সমালোচনা করে আসছে সরকারই সে সমালোচনার যথার্থতা প্রমাণ করছে। ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ছাড়াই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘আসন’ কব্জা করা, পরবর্তী সব নির্বাচনে ‘দখলের’ সংস্কৃতি চালু করে সরকারই স্পষ্ট করেছে যে, এ ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর নেই। স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে সরকার টিকে থাকার ‘জরুরি অক্সিজেনই’ হারিয়ে ফেলবে। তাই তারা যা করছে সচেতনভাবেই করছে। দুর্নামের কোনো পরোয়াও করছে না। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে ইউনিয়নে ইউনিয়নে তারা দলের নয়, দলের নামে আসলে সরকারের একটা ভিত্তি গড়তে চাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয়নপত্রে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টিকে পর্যবেক্ষকরা ভালো চোখে দেখছেন না, তৃণমূল পর্যায়ে এসব নির্বাচনে জেলা-থানার নেতাদের প্রত্যয়নই যথেষ্ট। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্যই কৌশলটি প্রয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। অর্থাৎ যেনতেন প্রকারে যত বেশি সম্ভব ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদ নিজেদের কব্জাভুক্ত করা যায় তার জন্য কোনো অনৈতিক পথে হাঁটতে হলেও দ্বিধা নেই সরকারের। রাজনৈতিক ঝড় উঠলে এসব ভিত্তি কোনো কাজে লাগে না। বেশি দূর তো যাওয়ার দরকার নেই। আইয়ুবের ৮০ হাজার ‘ফেরেশতা’ (বিডি মেম্বার) কি তার গদি রক্ষা করতে পেরেছিল? এরশাদ যখন বিএনপির নির্বাচিত সাত্তার সরকারকে উত্খাত করে ক্ষমতা দখল করে, তখন দলীয় ইউপি চেয়ারম্যান, গ্রাম সরকার, যুব কমপ্লেক্স কোনো কাজে আসেনি। লীগ সরকার পুলিশ ও প্রশাসননির্ভর একটি অজনপ্রিয় সরকারে পরিণত হয়েছে বলে দেশে-বিদেশে যে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তা ঘুচাতে চাচ্ছে এই সরকার। ইউনিয়ন পরিষদে ‘জয় জয়কার’ দেখিয়ে তারা জনপ্রিয়তা প্রমাণের উদ্যোগ নিয়েছে বলেই মনে হয়। বিজ্ঞান প্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবীর কোথাও কোনো কিছু গোপন থাকছে না। সর্বশেষ ‘পানামা পেপারস’ ঝড় তুলেছে সারা বিশ্বে। বিশ্বচোরদের পেটে ‘গুড়গুড়ি’ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও কেউ পেরেশানিতে থাকা অমূলক নয়। তেমন খবর তো মিডিয়ায় আসছে। কাজেই বাংলাদেশের ইউপি নির্বাচনে প্রকাশ্যে যেসব অনাচার হয়েছে, পৃথিবী তা জানবে না এটা হয় কী করে? মাননীয় মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের ভাষায় ‘দখলের উৎসব’— নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা প্রমাণ করবে সরকার? কি জানি।

বিএনপি চেয়ারপারসন পরবর্তী ধাপসমূহের নির্বাচনে দলের সব দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাসহ জেলা ও থানার নেতাদের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এ নির্দেশ কী কার্যকর হবে? কেন্দ্রীয় নেতারা তো (!) বটেই, জেলা-থানার নেতারাও এখন ঢাকায় ‘হিজরত’ করছেন পরবর্তী কমিটিতে পছন্দের পদ বাগানোর জন্য। কাউন্সিল নামের একদিনের মিলন মেলাটি হয়ে গেছে ১৯ মার্চ। তিনজন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছেন। অন্যরা পীর-মুরশিদের দরবারে ছোটাছুটি করছেন, তাবিজ-কবচ নিচ্ছেন যাতে বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানের হৃদয় গলে প্রার্থনাকারীদের প্রতি। এরা কি করে ইউনিয়নে ইউনিয়নে ঘুরবে? অথচ সবাই নেমে পড়লে একদিকে দলের মধ্যে জাগরণ ‘সৃষ্টি’ হবে, অপরদিকে ভীতসন্ত্রস্ত ভোটারদের মধ্যে সাহসের সঞ্চার হবে। আগামী চার ধাপের নির্বাচনের চেহারাই পাল্টে যেতে পারে। দেখা যাক বিএনপির স্থায়ী কমিটি, সহ-সভাপতিমণ্ডলী, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং সম্পাদকমণ্ডলীর কজন পার্টি চেয়ারপারসনের আদেশ মান্য করেন। পদাধিকারীরা দায়িত্ব পালন না করলে কর্মচারীদের হাতে দায়িত্ব যাবে না তো কোথায় যাবে?

একজন মুক্তিযোদ্ধার আর্তনাদ!

মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, প্রায়শই কথাটা বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় রাজনীতির শ্রেষ্ঠ ঘটনা এবং আমাদের স্বাধীনতা জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। সেই বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান তো বটেই। কিন্তু যারা এখনো বেঁচে আছেন, কেমন আছেন তারা? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা রাজনীতি করেন তারা কি খবর রাখেন? মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে, কেউ কেউ তো বটেই, ভালো তো নেই-ই, স্বীকৃতিটি পর্যন্ত নেই। অথচ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মান্নান ভূঁইয়া পরিষদ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নরসিংদীর শিবপুর গিয়ে সাবেক থানা কমান্ডার বন্ধু ঝিনুক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফ মৃধার মুখে শুনলাম মুক্তিযুদ্ধকালে থানায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল সাড়ে ৪শ। ৪৫ বছরে অনেকে মারা গেছেন, তারপরও এখন নাকি এই সংখ্যা প্রায় ৯শ! অথচ আমার নিজের থানা চৌদ্দগ্রামে আমার পাশের গ্রাম চিমাতলির বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধার বর্তমান ‘তেলেসমাতির তালিকায়’ তার নামটিই ঢোকাতে পারেননি। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রপ্রদত্ত কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না তিনি।

২ নম্বর সেক্টরের ১৯নং এফএফ কোম্পানিতে তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি তিনি অস্ত্র সমর্পণ করেছেন এবং একই দিন রিলিজ অর্ডার পান। তার কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৩২। এই মর্মে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রত্যয়নপত্রও তার কাছে আছে। পত্রের সূত্র ম-২৬.৫.৭৭ ও ২৭.৫-ম-৭৭ইং। জেনারেল (অব.) ওসমানীর স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র আছে তার কাছে। থানা কমান্ডের সুপারিশ আছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের ১৩.৯.১৯৭৮ সালে দেওয়া স্বীকৃতিপত্রও আছে। ২০১৪ সালের ১৬ জুন কুমিল্লার জেলা কমান্ডার সফিউল আহমদ বাবুলও সার্টিফাই করেছেন। জাতীয় তালিকাভুক্ত তার সহযোদ্ধা আবদুল কালাম, গেজেট নং ৫.৭৫২, আবদুল মমিন গেজেট নং-৫,৭৫১ ও এ কে এম শাহজাহান, গেজেট নং ৫৭৪৮ দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন যে, সিরাজুল ইসলাম তাদের সহ-মুক্তিযোদ্ধা। এত কিছুর প্রমাণ থাকার পরও মুক্তিযোদ্ধার জাতীয় তালিকায় তার নাম উঠছে না। খারাপ কোনো পথে না গিয়ে জীবন ও সংসার চালানোর দায়ে একটি মাদ্রাসায় অ্যাকাউন্টেন্টের চাকরি করেছেন কিছু দিন। এটাই কি তার অপরাধ? মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা, অবদান ও কৃতিত্বের কোনোই মূল্য নেই? ষাটোর্ধ্ব এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আর কতদিন বাঁচবেন জানি না।  জীবদ্দশায় কি তিনি তার স্বীকৃতি দেখে-শুনে যেতে পারবেন না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী কি বিষয়টি দেখবেন?

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com

বিডি-প্রতিদিন/১০ এপ্রিল, ২০১৬/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow