Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট, ২০১৮ ১৬:৪৯ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ১৯ আগস্ট, ২০১৮ ১৬:৫৬
ভারতের ৪র্থ শীর্ষ রেমিটেন্স উৎস বাংলাদেশ : একটি অপপ্রচার!
হাসান ইবনে হামিদ
ভারতের ৪র্থ শীর্ষ রেমিটেন্স উৎস বাংলাদেশ : একটি অপপ্রচার!
প্রতীকী ছবি

বিশ্বে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী দেশগুলোর অন্যতম ভারত। 'দ্যা ইকোনমিক টাইমস'-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও গত অর্থ-বছরে দেশটি সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। 

বিগত কয়েক বছর ধরেই ভারত ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স অর্জনকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান অনেক উপরে নিয়ে গেছে। এই আয়ের পেছনে যে দেশগুলোর অবদান সর্বোচ্চ, তার মাঝে প্রথম হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। 

পরবর্তী রাষ্ট্রগুলো যথাক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইংল্যান্ড, ওমান, নেপাল, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া। এই শীর্ষ দশ রাষ্ট্র থেকে ভারত সর্বোচ্চ পরিমাণ রেমিটেন্স অর্জন করে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, গত ২ জুলাই বাংলাদেশ থেকে ভারতের রেমিট্যান্স আয় নিয়ে একটি ভুঁইফোড় সংবাদ প্রকাশ করে 'দ্যা ইন্ডাস্ট্রি নিউজ' নামের এক অপরিচিত অনলাইন পত্রিকা। 

প্রোপাগান্ডামূলক এই ওয়েবসাইটের লিংক ও ছবি দেখিয়ে দাবি করা হয়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স গেছে ভারত। বিষয়টি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরালও হয়েছে। কিন্তু এই সংবাদটি যাচাই-বাছাই না করেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি অনেক সচেতন নাগরিকও এই সংবাদটিকে শেয়ার করেছে। কিন্তু আমরা একটু খুঁজ নিলেই এই সংবাদের সত্য মিথ্যা বের হয়ে আসতো। যেহেতু অনেকেই ইতোমধ্যে এ নিয়ে লিখেছেন তাই সেই ভিত্তিহীন সংবাদের পোস্টমর্টেম করার উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। 

প্রথমেই আসি পত্রিকাটি নিয়ে। 'দ্যা ইন্ডাস্ট্রি নিউজ' নামে কোন পত্রিকা আমার জীবনদশায় শুনিনি। প্রথম শুনলাম এই সংবাদকে কেন্দ্র করেই। এমনকি এটাও শুনলাম এই পত্রিকা নাকি বাংলাদেশ থেকে ছাপা হয়! হয়তো আমার জানার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে তবে আপনারা কেউ এই পত্রিকার ঠিকানা জানা থাকলে আমাকে জানাবেন। 

এবার আসি পত্রিকার রিপোর্টের লেখাতে। ওই কথিত রিপোর্টের প্রত্যেকটা বাক্যে একাধিক ভুল! ভাষাটাও অদ্ভুত! যেই পত্রিকার নাম দেশের মানুষ শুনেনি তারা নাকি আবার ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গোপন সূত্রে'র বরাতের খবর পায়! শুধু তাই না কথিত প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন অর্গানাইজেশন ও ভারতের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংক সূত্রের বরাত দিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে একটা তালিকা দিয়ে বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশ হলো ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রেমিটেন্স- উৎস।'  

আরও বলা হয়, '২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স নিয়ে গেছে ভারত। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রেমিটেন্স যায় ৮৩২ কোটি ডলার। ২০১৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ৪৫০ কোটি ডলার।' অথচ ওই প্রতিষ্ঠানের কারও বক্তব্য বা তথ্যসূত্রের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। এমনকি ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক বা আইএমও কোথাও এই সংক্রান্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এই প্রতিবেদনে বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সিপিডি'র বরাতও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিপিডি থেকেও এই ধরনের কোন বক্তব্য আসেনি এমনকি তাদের ওয়েবসাইটেও খুঁজ নিয়ে দেখা গেছে এই তথ্য সেখানে নেই। তবে কোথায় পেলো তারা এই তথ্য! 

রেমিটেন্স ও মাইগ্রেট ইস্যুতে কাজ করা নির্ভরযোগ্য তথ্য দানকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে 'পিউ রিসার্চ সেন্টার'। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাংকেরই তথ্য ব্যবহার করে। তাই সহজেই রেমিটেন্স সম্পর্কিত যেকোন তথ্য যাচাইয়ের জন্য পিউ রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবসাইটে যাওয়া যেতে পারে। 

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবসাইটে ভারত থেকে অন্য দেশে যাওয়া (আউটগোয়িং) এবং অন্য দেশ থেকে ভারতে যাওয়া (ইনকামিং) রেমিটেন্সের তথ্য ও তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা আর কথিত সংবাদের আকাশ-পাতাল ফারাক দেখে যেকেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারবেন না! ওই তালিকায় ভারত থেকে যেসব দেশে প্রবাসী রেমিটেন্স গেছে সেটার তালিকা আসে প্রথমে। 

সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স বাংলাদেশে আসে প্রতিবেশী দেশটি থেকে। আবার অন্য দেশ থেকে ভারতে যাওয়া (ইনকামিং) রেমিটেন্সের তথ্য ও তালিকাতে দেখা যায় সবার উপরে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশের অবস্থান ২৫ নম্বরে। ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিটেন্স বাংলাদেশ থেকে অর্জন করে ভারত যেখানে কথিত ভুয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে ১ হাজার কোটি ডলার। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ভারত থেকে অর্জন করে ৪০৬ কোটি ডলার। 

উল্লেখ্য যে, ভারত থেকে যে রাষ্ট্রটি সর্বোচ্চ রেমিটেন্স নিয়ে আসে তার নাম বাংলাদেশ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবলিংক দিয়ে দেয়া হলো যেকেই নিজেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেন। (http://www.pewglobal.org/interactives/remittance-map/)


 
অন্যদিকে ২৫ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে ভারতীয় দৈনিক ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’তে বলা হয় ২০১৭ সালে ভারতের রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৩.৮ বিলিয়ন), যুক্তরাষ্ট্র (১১.৭ বিলিয়ন), সৌদি আরব (১১.২ বিলিয়ন), কুয়েত (৪.৬ বিলিয়ন) এবং কাতার (৪.১ বিলিয়ন)।

সূত্র দেখতে ক্লিক করুন...(https://timesofindia.indiatimes.com/india/india-retains-long-held-position-of-top-remittance-destination-of-migrants/articleshow/63903300.cms) 

‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানেও ভারতের অধিবাসী রয়েছে কিন্তু রেমিটেন্সে এর প্রভাব খুব একটা প্রতিফলিত হয় না। অনেক স্বল্প রেমিটেন্স আসে প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র থেকে। বাংলাদেশের অবস্থান নেপাল বা ভুটানের চেয়েও নিচে। এই বক্তব্যের মাধ্যমেও এটা স্পষ্ট যে ভারতের রেমিটেন্স নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রকাশ করেছে এই অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে। 

ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম পত্রিকার খবর অনুযায়ী ভারতে রেমিটেন্স এর সোর্স হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫ তম আর পরিমান ১১৪ মিলিয়ন ইউ এস ডলার যা পিউ রিসার্চ সেন্টার এর তথ্যের সাথে মিলে যায় এমনকি টাইমস অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্টে এটাও উল্লেখ করা হয় ভারত থেকে রেমিটেন্স আনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১ম, যার পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। যা রেমিটেন্স আনা নেওয়ার হিসেবে ৩৫ গুণ বেশি। 

ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে বাংলাদেশে যা তাদের মোট রেমিটেন্স যাওয়ার ৭১%, সাড়ে ৫ বিলিয়নের মধ্যে ৪ বিলিয়ন আসে বাংলাদেশে মানে আমরা ভারতকে যা দিয়ে থাকি তার থেকে ৩৫ গুণ বেশি ভারত থেকে আয় করে থাকি। এই আয়ের হিসেবটা খুব স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা করা যায়। 

ভারত বৃহৎ রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়ে থাকে। তাই এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর রেমিটেন্স এক করলে অংকটা বড় হবেই। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র রাষ্ট্র এবং ভারতের নাগরিকেরা প্রবাসী হিসেবে বাংলাদেশ নয় বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত মানে মধ্যপ্রাচ্য, বা ইউরোপমুখী। তাই ভারতের রেমিটেন্স আয় নিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছে একটি অনলাইন মাধ্যম তা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা স্পষ্ট। 

আবার অনেকেই উইকিপিডিয়া’র তথ্যসূত্র উল্লেখ করছেন, কিন্তু উইকিপিডিয়া কখনো কোন সঠিক তথ্যভান্ডার হতে পারেনা। কেননা উইকিডিয়াতে যেকেউ তার ইচ্ছেমতো সংবাদের তথ্য উপাত্ত সংযোজন, বিয়োজন করতে পারে। তাই রেমিটেন্স সম্পর্কিত উইকিপিডিয়ার তথ্যকে যদি কেউ সঠিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে চান তবে বলতেই হবে প্রযুক্তি এবং তথ্য জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া উইকিপিডিয়াতেও দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫ নম্বরে। তাই ভুল তথ্য দিয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না করে বরং সঠিক তথ্য পরিবেশন করাই শ্রেয়। 

ভারতের তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হয়েও বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় অর্থাৎ রেমিটেন্স অর্জনের ধারাবাহিকতা বিশ্বে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। বিগত দিনগুলোতে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দাসহ অন্যান্য কারণে আমাদের শ্রমিকের বিদেশ যাওয়ার হারে অধোগতি দেখা দেয়। তা সত্ত্বেও রেমিটেন্স আয়ের সূচকের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা দেখা যায়। প্রতি বছর দেশ থেকে গড়ে পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক বিদেশে গিয়ে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন। এটি আমাদের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের তালিকায় ইতোমধ্যে স্বীকৃতি লাভ করেছে। 

বছরের বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর সেরা দশ রেমিটেন্স সংগ্রহকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। আমি আগেই বলেছি এই আয়ের পেছনে যে দেশের অবদান সর্বোচ্চ তন্মধ্যে প্রথম হচ্ছে ভারত অর্থাৎ প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বেশি অর্থ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। কিন্তু এমন ভালো একটা সম্পর্ক বিরাজ করার পরেও অনেকটা আচমকাই এই রিপোর্ট আসলো এবং অনলাইনে ভাইরাল হলো। এটাকে স্বাভাবিক কোন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়ার অবকাশ নেই কেননা এই সংবাদের সবচেয়ে বড় পাবলিসিটি করেছে পাকিস্তানের আইএসআই এর মুখপাত্র ‘ডিফেন্স.পিকে’। 

সোশাল মিডিয়াতে পাকিস্তান পন্থী অনলাইন সংবাদমাধ্যমে, আইডি এবং ব্যক্তিবর্গ এই সংবাদের  সবচাইতে বড় প্রকাশক ছিলো। যেখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্য দু’দেশের সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করছে সেখানে এই সংবাদ জনমনে এক বিভ্রান্তির জন্ম দেবে। প্রত্যেক নাগরিকেরই উচিত এই ভিত্তিহীন সংবাদের বিরুদ্ধে নিজের কলম ধরা। মনে রাখা উচিত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সাথে শত্রুভাবপন্ন হয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করা যায়না। তেরঙ্গা-লাল সবুজ সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে কারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায় সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। 

অন্যদিকে এই মিথ্যা সংবাদ যে ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত হয়েছে সরকারের উচিত তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখীন করা। মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হোক। 

লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বিডি প্রতিদিন/১৯ আগস্ট ২০১৮/আরাফাত

আপনার মন্তব্য

up-arrow